ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প। অথচ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সেই আশ্রয়ণের ঘর নিয়েই উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। উপজেলার তিন ইউনিয়নে থাকা ৮৮টি ঘরের অনেকগুলোতে নেই নিয়মিত কোনো বাসিন্দা। কোথাও ঝুলছে তালা, কোথাও বরাদ্দভোগী নিজে না থেকে অন্যত্র বসবাস করছেন, আবার কোনো কোনো ঘর ভাড়া ও বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি একটি ঘর ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং আরেকটি ঘর ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ভূমিহীনদের মাথা গোঁজার জন্য দেওয়া আশ্রয়ের ঘরই কি পরিণত হয়েছে বেচাকেনা ও ভাড়ার সম্পত্তিতে?
সাতকানিয়ার এওচিয়া, মাদার্শা ও ছদাহা ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এওচিয়া ইউনিয়নে রয়েছে ৪৮টি, মাদার্শা ইউনিয়নে ১৩টি এবং ছদাহা ইউনিয়নের খোদ্দ কেঁওচিয়া এলাকায় রয়েছে ২৭টি ঘর। তিন প্রকল্পে মোট ৮৮টি ঘরের মধ্যে কতটি ঘরে প্রকৃত বরাদ্দভোগীরা বসবাস করছেন এবং কতটি ঘর অন্যের দখলে, ভাড়া কিংবা কথিত বিক্রির আওতায় গেছে তা এখন তদন্তের বিষয়।
মাদার্শার ১৩টি ঘরের মধ্যে সরেজমিনে দুটি ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি ঘরের বরাদ্দভোগী সেখানে বসবাস না করে অন্যত্র থাকছেন এবং ঘরটি ভাড়া দিয়েছেন। এরই মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক বাসিন্দা দাবি করেছেন, তিনি তিন মাস আগে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ঘর কিনেছেন। সরকারি বরাদ্দের ঘর কীভাবে, কার কাছ থেকে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কেনাবেচা হয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এর কোনো বৈধতা আছে কি না, তা প্রশাসনিক তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
এওচিয়া ইউনিয়নের ৪৮টি ঘরের চিত্র আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৩০টি ঘরে মানুষ বসবাস করলেও ১৮টি ঘরে নিয়মিত কেউ থাকেন না বলে স্থানীয়রা জানান। কোনো কোনো ঘর থেকে বিদ্যুতের মিটারও খুলে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত কয়েকজনের ভাষ্য, যেসব ঘরে নিয়মিত কেউ থাকেন না, সেসব ঘরের বরাদ্দভোগীরা মাঝে মধ্যে আসেন, আবার চলে যান। তাদের অনেকের নিজস্ব বাড়িও রয়েছে এবং পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন কয়েকটি ঘর অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
ছদাহা ইউনিয়নের খোদ্দ কেঁওচিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের চিত্র আরও উদ্বেগজনক বলে দাবি স্থানীয়দের। সেখানে রয়েছে ২৭টি ঘর। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই মাত্র তিনটি পরিবার নিয়মিত বসবাস করছে। বাকি ঘরগুলোর বেশিরভাগই খালি পড়ে আছে, ভাড়া দেওয়া হয়েছে কিংবা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, বরাদ্দ পাওয়ার পর অনেকেই নিজেরা সেখানে বসবাস না করে অন্যত্র চলে গেছেন। সম্প্রতি প্রায় এক মাস আগেও একটি ঘর ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। আরও কয়েকটি ঘর বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য দেওয়া ঘর যদি বরাদ্দভোগীরাই ব্যবহার না করেন, তাহলে সরকারের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, যারা ঘর পেয়েছেন তাদের কেউ কেউ নিজস্ব বাড়িতে থাকছেন, কেউ ঘর ভাড়া দিয়েছেন, আবার কেউ বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ আশপাশে এখনো অনেক ভূমিহীন পরিবার রয়েছে, যাদের নিজস্ব মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তাই প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরের বরাদ্দ, বর্তমান দখল ও বসবাসের অবস্থা যাচাই করে অনিয়ম পাওয়া গেলে বরাদ্দ বাতিল এবং প্রকৃত ভূমিহীনদের কাছে ঘর হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর যারা সেখানে বসবাস করছেন না, তাদের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর তদারকি না থাকায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কেউ ঘর ভাড়া দিলে কিংবা বিক্রি করলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো সরকারি আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের যেসব ঘর দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশ কিছু ঘরে মানুষ বসবাস করেন না বলে তারা জানতে পেরেছেন। অনেকে ঘর ভাড়া দিয়েছেন এবং কেউ কেউ বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। একটি কমিটি গঠন করে সরেজমিনে তদন্ত করা হবে। তদন্তের পর শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে স্থায়ী আবাসনের সুযোগ করে দেওয়া। ফলে বরাদ্দ পাওয়া ঘরে প্রকৃত সুবিধাভোগী বসবাস করছেন কি না, ঘর অন্যের কাছে ভাড়া বা বিক্রি করা হয়েছে কি না—এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু কাগজপত্রে নয়, প্রতিটি ঘরে সরেজমিনে গিয়ে প্রকৃত চিত্র বের করবে প্রশাসন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ঘরগুলো ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
সাতকানিয়ায় ৮৮টি আশ্রয়ণের ঘর নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ এখন প্রশাসনিক তদন্তের অপেক্ষায়। তদন্তেই বেরিয়ে আসবে—কতটি ঘরে প্রকৃত বরাদ্দভোগী বসবাস করছেন, কতটি ঘর তালাবদ্ধ, কতটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং বিক্রির অভিযোগের কতটা সত্য। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—ভূমিহীনদের জন্য রাষ্ট্রের দেওয়া আশ্রয় যদি শেষ পর্যন্ত ভাড়া-বিক্রির সম্পত্তিতে পরিণত হয়, তাহলে প্রকৃত আশ্রয়হীনদের ঠাঁই হবে কোথায়?



















