চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করতে ‘সংবেদনশীল সাংবাদিকতা: সংলাপ ও করণীয়’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন। সংলাপে সংবাদ পরিবেশনে জেন্ডার সমতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব, নৈতিকতা এবং নেতিবাচক জেন্ডারভিত্তিক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেন, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না, মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সংবাদ পরিবেশনে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা, নিরপেক্ষতা এবং সব মানুষের মর্যাদা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকেরা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ইতিহাসের একটি অংশ নির্মাণ করেন। সংবাদে ভুল তথ্য পরিবেশিত হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ কারণে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের যথার্থতা, দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সংবাদে ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানোর পরিবর্তে তাঁদের চরিত্র ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নারী-পুরুষসহ সব মানুষের বিষয়ে পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে তাঁদের বক্তব্য, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহীন নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় তরুণদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ ও গল্প বলার ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা গেলে ক্ষতিকর সামাজিক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করা এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ সুগম হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি বলেন, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত উৎকর্ষের সঙ্গে সংবেদনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করতে সাংবাদিকদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংলাপে সাংবাদিকতায় জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিষয়ক ব্যবহারিক নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা পরিচালনা করেন পিআইবির সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন। তিনি বলেন, জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা মানে শুধু নারী বা নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংবাদ করা নয়; বরং সংবাদে সব মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিচয় ও মর্যাদা যথাযথভাবে তুলে ধরা। সংবাদ সংগ্রহ, ভাষা, ছবি, শিরোনাম, তথ্যসূত্র নির্বাচন ও উপস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। ব্যবহারিক নির্দেশিকাটি সাংবাদিকদের দৈনন্দিন কাজে এ ধরনের চর্চা আরও কার্যকর করতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ নোমান। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের পাশাপাশি ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম অংশীদার জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের বিভাগীয় সমন্বয়ক সুজয় বড়ুয়া অংশ নেন। এ ছাড়া প্রকল্পের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ম্যানেজার হুসাইন শাকির, মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ মো. তাফহিম ও জেন্ডার স্পেশালিস্ট ফারজানা রূপা।
উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে চার বছর মেয়াদি ‘সমতায় তারুণ্য: ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশের আটটি বিভাগের বৈচিত্র্যপূর্ণ তরুণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীরা যেন সহিংসতামুক্ত জীবনযাপন করতে পারে, নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নিজ নিজ সম্প্রদায়, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেন্ডারভিত্তিক নেতিবাচক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করতে উদ্যোগী হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের বিভাগীয় সংলাপের মাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক শেখা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়বে এবং দেশের গণমাধ্যমে আরও দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সংবাদচর্চার পরিবেশ গড়ে উঠবে।
ডিএস./























