বাংলাদেশের কৃষিকে একটি লাভজনক ও আধুনিক খাতে পরিণত করার ওপর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে গাজীপুরে প্রথম সফরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শন এবং ‘নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বিএআরআইয়ের অবদান এবং বর্তমান অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি বলেন, উপযুক্ত আয় না থাকায় কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন শ্রমিকরা, যার ফলে বর্তমানে মাঠে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত কৃষক পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কৃষিপণ্যের বিপণন ও সংরক্ষণের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকরা প্রায়ই তাদের উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরাঞ্চলে প্রচুর আলু উৎপাদিত হলেও কৃষকদের অনেক সময় রাস্তায় আলু ফেলে দিতে হয়, অথচ পরবর্তী সময়ে বীজ আলুর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। একইভাবে উৎপাদনস্থল থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর সবজির দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। শুধু আলু বা সবজি নয়, ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে বলে মত দেন তিনি। তবে পেঁয়াজ উৎপাদনে গবেষকদের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি একে একটি ইতিবাচক অর্জন বলে উল্লেখ করেন।
কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দেন।
কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ সময় কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশন-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য কৃষিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং দেশের বিভিন্ন সংকটে কৃষিবিদ ও বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
দেশ গঠন ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট মতবিনিময় সভায় বর্তমান জাতীয় পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আজ দেশ গঠনের এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের প্রতিটি খাত ধ্বংস, দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে বিপর্যস্ত করা হয়েছিল এবং দেশ থেকে অর্থ পাচার করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই ধ্বংসস্তূপ কাটিয়ে উঠতে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে ঐক্যবদ্ধভাবে ধীরে ধীরে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে রাষ্ট্রপতি বারি প্রাঙ্গণে পৌঁছালে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার, গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল কাদির এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম।
সভার শুরুতে বারির মহাপরিচালক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম উপস্থাপন করেন। আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি বারির জিন ব্যাংক এবং বিভিন্ন গবেষণা স্টল পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিনি উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্র (পিজিআরসি) প্রাঙ্গণে ‘বারি কাঁঠাল-৬’ জাতের একটি ফলজ গাছের চারা রোপণ করেন।
ডিএস./



















