০৩:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬

ফেনীর ফুলগাজীর আশ্রয়কেন্দ্র ‘বাঁধ না অইলে এই মরার খেলা চলতেই থাইকব’

ফুলগাজী উপজেলার ৮৫টি গ্রামে শুধু পানি আর পানি। উপজেলার মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া নদীর দেড়পাড়া, উত্তর শ্রীপুর, দৌলতপুরসহ ৮টি বেড়িবাঁধ ভাঙনে পানির তীব্র স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় ঘরের চাল ও বেড়া। গ্রামের হতদরিদ্র কিছু লোক গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে দোতলায় আশ্রয় নিয়েছে। গাদাগাদি করে ছোট্ট কক্ষে কয়েকটি পরিবার। এই দুর্যোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে এসেছেন ৭৫ বছর বয়সী উত্তর শ্রীপুরের আবুল কাশেম, চল্লিশোর্ধ্ব মোতালেব কিংবা বত্রিশ বছর বয়সী নারী কাওসার সুলতানার। নতুন মুন্সীরহাট আজমেরী বেগম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও তৎসংলগ্ন খোলা বাজারে উঁচু স্থানে এমন শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া নদী বিধৌত এদের মতোই বানের জলে ভেসে আসা ফুলগাজীর বাসিন্দা আরও সহস্রাধিক হতদরিদ্র পরিবারের ঠাঁই হয়েছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০!কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০!

ফুলগাজী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ও মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছে শতাধিক পরিবার। চব্বিশের বন্যা সুলতানার সবটুকু নিয়ে ভালোবাসা হিসেবে রেখে গেল একটি পুত্র সন্তান, এবারের বন্যায় ভালোবাসার সন্তানটি নিয়ে আশ্রিতা হলেন ঠিকই কিন্তু নেই বসতভিটা, খেতখামার। কান্নাভেজা কণ্ঠে মোতালেব বলেন, এই বয়সে ঘরছাড়া অইছি। রাইত ১২টায় আইছি, বউয়ের জন্য ওষুধ কিনমু কেন্নে, পেট খালি, হোলাহাইনে কান্দে- এভাবেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে লুঙ্গির ভাঁজে কান্না লুকিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, স্কুলের ওই দোতলায় উঠছি, কিন্তু মাথার ওঁচে ছাদ থাইকলেই কি ঘর হয়?

একই কষ্টের ভাগিদার আরেক ঘরছাড়া লিপি বেগম (ছদ্মনাম, নাম প্রকাশ করতে চান না)। তিনি বর্তমানে দুই সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছেন মুন্সীরহাট আলী আজম উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায়। তার কণ্ঠে ক্ষোভ আর হাহাকার, ছোডবেলাতুন দেখি এই হানির ঝামেলা। বিয়া করিও শান্তি নাই। গতবারও এই দোতলায় উইঠছিলাম। এবার আবার আইলাম। কিন্তু কয়দিন থাকমু? ঘরে তো হানি, আর ইয়ানে খানা নাই, হুইতবার জায়গা অইলেই হোতন যায় না। লিপি বেগমের কণ্ঠে প্রশ্ন, এই স্কুল যদি একদিন ডুবি যায়, আন্ডা তন কন্ডে যামু?

পড়ে যাওয়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর নাম সফলতাপড়ে যাওয়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর নাম সফলতা আশ্রয়কেন্দ্রে আসা কয়েকজন বলেন, এখানে যা আছে, তা অনেক সময় নিরাপদ নয়। নেই আলাদা নারীকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিশুদের প্রয়োজনীয় কোনও ব্যবস্থা। অনেক সময় খাবারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। বরাদ্দ আসে, কিন্তু তা সবার কাছে পৌঁছায় না।

অবশ্য শুধু লিপি কিংবা কাশেম মিয়া নন-এ গল্প পুরো আশ্রয়কেন্দ্রে আসা সকলের। তাদের ভাষায়, পানি নেমে গেলেও শুরু হবে নতুন করে বাচাঁর লড়াই। আমজাদহাট, জিএমহাট, মুন্সিরহাট, দরবারপুর-সব ইউনিয়নের মানুষ পানির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে গত কয়েক বছর।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধ মেরামত বা টেকসই প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তেমন কিছু চোখে পড়ে না। স্থানীয়রা বলেন, একটা টেকসই বাঁধ চাই। নইলে এই মরার খেলা চলতেই থাকবে।

মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, আজমেরী বেগম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের গিয়ে আশ্রিতদের খোঁজ নেওয়া হয়েছে। আশ্রিতদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজ ও আগামীকাল কাস্টম হাউজ খোলাআজ ও আগামীকাল কাস্টম হাউজ খোলা জানা যায়, ইউএনও ফাহরিয়া ইসলাম ফুলগাজী সদরের আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করে খাবার বিতরণ করেছেন।

জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফুলগাজী উপজেলায় ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে যার মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩২টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৭টি। শুকনো খাবার বিতরণে প্রশাসন ইতোপূর্বে ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। জেলায় ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১হাজার ৬৫০ প্ররিবারের ৬হাজার ৯৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

ডিএস..

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

শিরোপার লড়াইয়ে রাতে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ

ফেনীর ফুলগাজীর আশ্রয়কেন্দ্র ‘বাঁধ না অইলে এই মরার খেলা চলতেই থাইকব’

প্রকাশিত : ০৩:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫

ফুলগাজী উপজেলার ৮৫টি গ্রামে শুধু পানি আর পানি। উপজেলার মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া নদীর দেড়পাড়া, উত্তর শ্রীপুর, দৌলতপুরসহ ৮টি বেড়িবাঁধ ভাঙনে পানির তীব্র স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় ঘরের চাল ও বেড়া। গ্রামের হতদরিদ্র কিছু লোক গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে দোতলায় আশ্রয় নিয়েছে। গাদাগাদি করে ছোট্ট কক্ষে কয়েকটি পরিবার। এই দুর্যোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে এসেছেন ৭৫ বছর বয়সী উত্তর শ্রীপুরের আবুল কাশেম, চল্লিশোর্ধ্ব মোতালেব কিংবা বত্রিশ বছর বয়সী নারী কাওসার সুলতানার। নতুন মুন্সীরহাট আজমেরী বেগম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও তৎসংলগ্ন খোলা বাজারে উঁচু স্থানে এমন শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া নদী বিধৌত এদের মতোই বানের জলে ভেসে আসা ফুলগাজীর বাসিন্দা আরও সহস্রাধিক হতদরিদ্র পরিবারের ঠাঁই হয়েছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০!কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০!

ফুলগাজী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ও মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছে শতাধিক পরিবার। চব্বিশের বন্যা সুলতানার সবটুকু নিয়ে ভালোবাসা হিসেবে রেখে গেল একটি পুত্র সন্তান, এবারের বন্যায় ভালোবাসার সন্তানটি নিয়ে আশ্রিতা হলেন ঠিকই কিন্তু নেই বসতভিটা, খেতখামার। কান্নাভেজা কণ্ঠে মোতালেব বলেন, এই বয়সে ঘরছাড়া অইছি। রাইত ১২টায় আইছি, বউয়ের জন্য ওষুধ কিনমু কেন্নে, পেট খালি, হোলাহাইনে কান্দে- এভাবেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে লুঙ্গির ভাঁজে কান্না লুকিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, স্কুলের ওই দোতলায় উঠছি, কিন্তু মাথার ওঁচে ছাদ থাইকলেই কি ঘর হয়?

একই কষ্টের ভাগিদার আরেক ঘরছাড়া লিপি বেগম (ছদ্মনাম, নাম প্রকাশ করতে চান না)। তিনি বর্তমানে দুই সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছেন মুন্সীরহাট আলী আজম উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায়। তার কণ্ঠে ক্ষোভ আর হাহাকার, ছোডবেলাতুন দেখি এই হানির ঝামেলা। বিয়া করিও শান্তি নাই। গতবারও এই দোতলায় উইঠছিলাম। এবার আবার আইলাম। কিন্তু কয়দিন থাকমু? ঘরে তো হানি, আর ইয়ানে খানা নাই, হুইতবার জায়গা অইলেই হোতন যায় না। লিপি বেগমের কণ্ঠে প্রশ্ন, এই স্কুল যদি একদিন ডুবি যায়, আন্ডা তন কন্ডে যামু?

পড়ে যাওয়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর নাম সফলতাপড়ে যাওয়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর নাম সফলতা আশ্রয়কেন্দ্রে আসা কয়েকজন বলেন, এখানে যা আছে, তা অনেক সময় নিরাপদ নয়। নেই আলাদা নারীকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিশুদের প্রয়োজনীয় কোনও ব্যবস্থা। অনেক সময় খাবারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। বরাদ্দ আসে, কিন্তু তা সবার কাছে পৌঁছায় না।

অবশ্য শুধু লিপি কিংবা কাশেম মিয়া নন-এ গল্প পুরো আশ্রয়কেন্দ্রে আসা সকলের। তাদের ভাষায়, পানি নেমে গেলেও শুরু হবে নতুন করে বাচাঁর লড়াই। আমজাদহাট, জিএমহাট, মুন্সিরহাট, দরবারপুর-সব ইউনিয়নের মানুষ পানির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে গত কয়েক বছর।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধ মেরামত বা টেকসই প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তেমন কিছু চোখে পড়ে না। স্থানীয়রা বলেন, একটা টেকসই বাঁধ চাই। নইলে এই মরার খেলা চলতেই থাকবে।

মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, আজমেরী বেগম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের গিয়ে আশ্রিতদের খোঁজ নেওয়া হয়েছে। আশ্রিতদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজ ও আগামীকাল কাস্টম হাউজ খোলাআজ ও আগামীকাল কাস্টম হাউজ খোলা জানা যায়, ইউএনও ফাহরিয়া ইসলাম ফুলগাজী সদরের আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করে খাবার বিতরণ করেছেন।

জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফুলগাজী উপজেলায় ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে যার মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩২টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৭টি। শুকনো খাবার বিতরণে প্রশাসন ইতোপূর্বে ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। জেলায় ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১হাজার ৬৫০ প্ররিবারের ৬হাজার ৯৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

ডিএস..