০৭:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

টেকনাফে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠছে রোহিঙ্গা ডাকাত দল

কক্সবাজারের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত উপজেলা টেকনাফ।৩৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলায় প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের বসতি ছাড়াও রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে প্রায় ৩ লক্ষ রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একাধিক ক্যাম্প।
এই ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে পাহাড়গুলোতে গড়ে ওঠেছে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ।নিত্যনৈমত্তিক দস্যুতা, স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ,হত্যা,মাদক পাচার সহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
গত মার্চ মাসের শুরুতে র‌্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৭ জন ডাকাত সদস্য মারা যাওয়া পর কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে ডাকাত দলগুলো।ফলে দল গোছাতে নতুন করে সদস্য সংগ্রহ শুরু করতে ক্যাম্পের উঠতি বয়সের যুবকদের টার্গেট করে তারা।
এক পর্যায়ে দল গোছিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরসংলগ্ন পাহাড়গুলোতে ফের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিছু ডাকাতদল।করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে টেকনাফে অপহরন,মুক্তিপণ আদায়, হত্যা ধর্ষণ বিভিন্ন অপরাধে ডাকাত দলগুলো হয়ে ওঠছে বেপরোয়া। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল তারা তুলে নিয়ে গেছে স্থানীয় ৩ বাংলাদেশি কৃষককে।
মুক্তিপণ না পেয়ে এদের একজনকে হত্যা ও অপর দুজনের বাড়িতে মুক্তিপণ চেয়ে না দিলে হত্যার হুমকি পাঠিয়েছে ডাকাত দলের সদস্যরা। পুলিশ এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও কিছু রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের সহযোগিতা পাওয়ায় তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
গত রবিবার ৩ মে থেকে পরের দিন সোমবার পর্যন্ত টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে টেকনাফের গহীন পাহাড়ে ডাকাতের আস্তানায় রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালাই স্থানীয় বাসিন্দাসহ পুলিশের বেশ কয়েকটি আলাদা আলাদা টিম।
তবে কাউকে গ্রফতার করতে না পারলেও হাকিম ডাকাতের আস্তানাসহ অনেক গুলো আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়।ধ্বংস করে দেয় তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সরঞ্জামাদি।
ডাকাত দল নির্মূলের আগ পর্যন্ত পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে জানান প্রদীপ কুমার দাশ। স্থানীয়রাসহ রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেছে, পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়ে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানবপাচার করছে এসব ডাকাত দল।
তবে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারা মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। আর তাদের সহযোগিতা করছে প্রকাশ্যে থাকা রোহিঙ্গাদের একটা চক্র।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, রোহিঙ্গা ডাকাতরা হোয়ািক্যংয়ের স্থানীয় আক্তার উল্লাহ (২৪) নামে এক কৃষককে গত ৩০ এপ্রিল অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করেছে। একই এলাকার শাহ মোহাম্মদ শাহেদ (২৫), মোহাম্মদ ইদ্রিস (২৭) নামে আরও দুই কৃষককে তুলে নিয়ে গেছে তারা।২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না দিলে তাদেরকেও মেরে ফেলার হুমকি দেয় রোহিঙ্গা ডাকাত দল।
নিহত আক্তার উল্লাহর পরিবারের দাবি, সম্প্রতি আক্তার উল্লাহকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে রোহিঙ্গা ডাকাতরা। এরপর মুক্তিপণের টাকা চেয়ে না পাওয়ায় গত শুক্রবার ভোরে আক্তার উল্লাহকে গুলি করে হত্যার পর তার লাশ টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উনছিপ্রাং পুটিবনিয়া নামক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পশ্চিমে রাখা হয়েছে পরিবারের কাছে এমন খবরও পৌঁছে দিয়েছে ডাকাতরা। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ঘিরে ৪-৫টি সংঘবদ্ধ ডাকাত বাহিনী সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে ডাকাত জকির আহমদ ওরফে জকির ও আবদুল হাকিম বাহিনীর দাপটে কাঁপছে রোহিঙ্গা শিবির ও সংলগ্ন এলাকার লাখো মানুষ এমন তথ্য দিয়েছেন রোহিঙ্গারা। তবে কেউ প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। রোহিঙ্গা ডাকাত দলগুলো নিজেদের দল ভারী করে আধিপত্য বিস্তার করতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উঠতি যুবকদের টার্গেট করে গহীন পাহাড়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এ সব তথ্য জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় লোকজন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশের অভিযান চলছে। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে কোনও অপরাধীর ঠাঁই হবে না। বিশেষ করে পাহাড়ি ডাকাতদের ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এদিকে একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানিয়েছেন, ‘করোনাভাইরাসে যখন সারাদেশ লকডাউনে সেসময়ে ক্যাম্পগুলোতে বেড়ে গেছে ডাকাত বাহিনীর আনাগোনা। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ডাকাতদের অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে ক্যাম্পে আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের নজরদারি কমেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গভীর রাতে অস্ত্র-শস্ত্রসহ ক্যাম্পে চলাচল করছে তারা। তাদের ভয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে চলে যেতে আশ্রয়স্থল খুঁজছে। তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি এসব ডাকাতের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে ড্রোন বা স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
পাশাপাশি অভিযান চালানোর আগে পাহাড়ের আশেপাশের বাড়িঘরে থাকা মানুষদের নিশ্চল করে বা পুরোপুরি ঘরবন্দি করে এবং মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে ডাকাতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন তারা। হাকিম ও জকিরের উত্থান মিয়ানমারের রাশিদং থানার বড়ছড়া গ্রামের জানি আলীর ছেলে আবদুল হাকিম। ২০১৫ সালে ১৩ জুন টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পল্লানপাড়ার বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্যদাতা (সোর্স) মোহাম্মদ সেলিম ও ওরফে মুন্ডি সেলিমকে কুপিয়ে হত্যার পর প্রথম আলোচনায় আসে এই ডাকাত সর্দার। এরপর ২০১৬ সালে ৪ জুলাই টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সিরাজুল ইসলামকে (৬৫) গুলি করে হত্যার ঘটনায় হাকিমের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাকিম ডাকাত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে টেকনাফের ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে ডাকাতি, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন আবদুল হাকিম।

অন্যদিকে টেকনাফের নয়াপাড়ার সি ব্লকের আমিনের ছেলে জকির আহমদ ওরফে জকির ডাকাত (২৮) এর নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের হাতে দেশি অস্ত্র ছাড়াও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। একসময় রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করতো নূরে আলম ডাকাত। ২০১৬ সালে ১৪ মে তার গ্রুপ এক আনসার সদস্যকে হত্যা করে তার অস্ত্র লুট করেছিল। ২০১৮ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় ডাকাত জকির। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় সলিম বাহিনী।

নূরে আলম ও সলিম দুজনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল জকিরের। কিন্তু, ইয়াবার মুনাফার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সলিমকে হত্যা করে জকির বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে ক্যাম্পে জকির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে জাদিমুরা ও শালবন ক্যাম্পের পাহাড়ে অপরাধের ‘রাজা’ বনে যান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের পাচঁ মাসের (পহেলা মে পর্যন্ত) বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৩ জন নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ১৯ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল।

এর মধ্যে গত ২ মার্চ র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৭ জন, ১২ মার্চ ২ জন এবং সর্বশেষ পহেলা মে ২ জনসহ মোট ১১ জন পাহাড়ি ডাকাত নিহত হয়েছে। তারা সবাই জকির বাহিনীর সদস্য ছিল। সদস্য কমে যাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন করে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছিল ডাকাত বাহিনীরা।

এ বিষয়ে র‌্যাব-১৫ সিপিসি-১, টেকনাফ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অ্যাডিশনাল এসপি বিমান চন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ঘিরে ডাকাত গ্রুপসহ অন্যান্য যেসব অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের গ্রেফতারের অভিযান চলছে। যে কোনওভাবে ডাকাতদের নির্মূল করা হবে।’

ট্যাগ :

খাল খনন কর্মসূচি চালু করায় কৃষকের মুখে হাসি

টেকনাফে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠছে রোহিঙ্গা ডাকাত দল

প্রকাশিত : ০৩:৫৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২০
কক্সবাজারের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত উপজেলা টেকনাফ।৩৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলায় প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের বসতি ছাড়াও রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে প্রায় ৩ লক্ষ রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একাধিক ক্যাম্প।
এই ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে পাহাড়গুলোতে গড়ে ওঠেছে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ।নিত্যনৈমত্তিক দস্যুতা, স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ,হত্যা,মাদক পাচার সহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
গত মার্চ মাসের শুরুতে র‌্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৭ জন ডাকাত সদস্য মারা যাওয়া পর কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে ডাকাত দলগুলো।ফলে দল গোছাতে নতুন করে সদস্য সংগ্রহ শুরু করতে ক্যাম্পের উঠতি বয়সের যুবকদের টার্গেট করে তারা।
এক পর্যায়ে দল গোছিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরসংলগ্ন পাহাড়গুলোতে ফের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিছু ডাকাতদল।করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে টেকনাফে অপহরন,মুক্তিপণ আদায়, হত্যা ধর্ষণ বিভিন্ন অপরাধে ডাকাত দলগুলো হয়ে ওঠছে বেপরোয়া। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল তারা তুলে নিয়ে গেছে স্থানীয় ৩ বাংলাদেশি কৃষককে।
মুক্তিপণ না পেয়ে এদের একজনকে হত্যা ও অপর দুজনের বাড়িতে মুক্তিপণ চেয়ে না দিলে হত্যার হুমকি পাঠিয়েছে ডাকাত দলের সদস্যরা। পুলিশ এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও কিছু রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের সহযোগিতা পাওয়ায় তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
গত রবিবার ৩ মে থেকে পরের দিন সোমবার পর্যন্ত টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে টেকনাফের গহীন পাহাড়ে ডাকাতের আস্তানায় রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালাই স্থানীয় বাসিন্দাসহ পুলিশের বেশ কয়েকটি আলাদা আলাদা টিম।
তবে কাউকে গ্রফতার করতে না পারলেও হাকিম ডাকাতের আস্তানাসহ অনেক গুলো আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়।ধ্বংস করে দেয় তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সরঞ্জামাদি।
ডাকাত দল নির্মূলের আগ পর্যন্ত পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে জানান প্রদীপ কুমার দাশ। স্থানীয়রাসহ রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেছে, পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়ে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানবপাচার করছে এসব ডাকাত দল।
তবে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারা মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। আর তাদের সহযোগিতা করছে প্রকাশ্যে থাকা রোহিঙ্গাদের একটা চক্র।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, রোহিঙ্গা ডাকাতরা হোয়ািক্যংয়ের স্থানীয় আক্তার উল্লাহ (২৪) নামে এক কৃষককে গত ৩০ এপ্রিল অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করেছে। একই এলাকার শাহ মোহাম্মদ শাহেদ (২৫), মোহাম্মদ ইদ্রিস (২৭) নামে আরও দুই কৃষককে তুলে নিয়ে গেছে তারা।২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না দিলে তাদেরকেও মেরে ফেলার হুমকি দেয় রোহিঙ্গা ডাকাত দল।
নিহত আক্তার উল্লাহর পরিবারের দাবি, সম্প্রতি আক্তার উল্লাহকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে রোহিঙ্গা ডাকাতরা। এরপর মুক্তিপণের টাকা চেয়ে না পাওয়ায় গত শুক্রবার ভোরে আক্তার উল্লাহকে গুলি করে হত্যার পর তার লাশ টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উনছিপ্রাং পুটিবনিয়া নামক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পশ্চিমে রাখা হয়েছে পরিবারের কাছে এমন খবরও পৌঁছে দিয়েছে ডাকাতরা। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ঘিরে ৪-৫টি সংঘবদ্ধ ডাকাত বাহিনী সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে ডাকাত জকির আহমদ ওরফে জকির ও আবদুল হাকিম বাহিনীর দাপটে কাঁপছে রোহিঙ্গা শিবির ও সংলগ্ন এলাকার লাখো মানুষ এমন তথ্য দিয়েছেন রোহিঙ্গারা। তবে কেউ প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। রোহিঙ্গা ডাকাত দলগুলো নিজেদের দল ভারী করে আধিপত্য বিস্তার করতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উঠতি যুবকদের টার্গেট করে গহীন পাহাড়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এ সব তথ্য জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় লোকজন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশের অভিযান চলছে। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে কোনও অপরাধীর ঠাঁই হবে না। বিশেষ করে পাহাড়ি ডাকাতদের ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এদিকে একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানিয়েছেন, ‘করোনাভাইরাসে যখন সারাদেশ লকডাউনে সেসময়ে ক্যাম্পগুলোতে বেড়ে গেছে ডাকাত বাহিনীর আনাগোনা। ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ডাকাতদের অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে ক্যাম্পে আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের নজরদারি কমেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গভীর রাতে অস্ত্র-শস্ত্রসহ ক্যাম্পে চলাচল করছে তারা। তাদের ভয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে চলে যেতে আশ্রয়স্থল খুঁজছে। তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি এসব ডাকাতের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে ড্রোন বা স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
পাশাপাশি অভিযান চালানোর আগে পাহাড়ের আশেপাশের বাড়িঘরে থাকা মানুষদের নিশ্চল করে বা পুরোপুরি ঘরবন্দি করে এবং মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে ডাকাতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন তারা। হাকিম ও জকিরের উত্থান মিয়ানমারের রাশিদং থানার বড়ছড়া গ্রামের জানি আলীর ছেলে আবদুল হাকিম। ২০১৫ সালে ১৩ জুন টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পল্লানপাড়ার বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্যদাতা (সোর্স) মোহাম্মদ সেলিম ও ওরফে মুন্ডি সেলিমকে কুপিয়ে হত্যার পর প্রথম আলোচনায় আসে এই ডাকাত সর্দার। এরপর ২০১৬ সালে ৪ জুলাই টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সিরাজুল ইসলামকে (৬৫) গুলি করে হত্যার ঘটনায় হাকিমের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাকিম ডাকাত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে টেকনাফের ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে ডাকাতি, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন আবদুল হাকিম।

অন্যদিকে টেকনাফের নয়াপাড়ার সি ব্লকের আমিনের ছেলে জকির আহমদ ওরফে জকির ডাকাত (২৮) এর নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের হাতে দেশি অস্ত্র ছাড়াও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। একসময় রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করতো নূরে আলম ডাকাত। ২০১৬ সালে ১৪ মে তার গ্রুপ এক আনসার সদস্যকে হত্যা করে তার অস্ত্র লুট করেছিল। ২০১৮ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় ডাকাত জকির। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় সলিম বাহিনী।

নূরে আলম ও সলিম দুজনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল জকিরের। কিন্তু, ইয়াবার মুনাফার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সলিমকে হত্যা করে জকির বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে ক্যাম্পে জকির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে জাদিমুরা ও শালবন ক্যাম্পের পাহাড়ে অপরাধের ‘রাজা’ বনে যান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের পাচঁ মাসের (পহেলা মে পর্যন্ত) বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৩ জন নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ১৯ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল।

এর মধ্যে গত ২ মার্চ র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৭ জন, ১২ মার্চ ২ জন এবং সর্বশেষ পহেলা মে ২ জনসহ মোট ১১ জন পাহাড়ি ডাকাত নিহত হয়েছে। তারা সবাই জকির বাহিনীর সদস্য ছিল। সদস্য কমে যাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন করে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছিল ডাকাত বাহিনীরা।

এ বিষয়ে র‌্যাব-১৫ সিপিসি-১, টেকনাফ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অ্যাডিশনাল এসপি বিমান চন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ঘিরে ডাকাত গ্রুপসহ অন্যান্য যেসব অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের গ্রেফতারের অভিযান চলছে। যে কোনওভাবে ডাকাতদের নির্মূল করা হবে।’