টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোতে নেমেছে প্রাণের জোয়ার। খৈয়াছড়া, সহস্রধারা, নাপিত্তাছড়া, সুপ্তধারা, রূপসী, ঝরঝরি ও চন্দ্রনাথ পাহাড়সংলগ্ন বিভিন্ন ঝর্ণায় এখন গর্জন তুলে ছুটে চলেছে স্বচ্ছ জলধারা। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত পর্যটক ভিড় করছেন সীতাকুণ্ডে।
সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি অবকাশের দিনগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। পরিবার, বন্ধু কিংবা ভ্রমণপিপাসু তরুণ-তরুণীরা দলবেঁধে ছুটে আসছেন পাহাড়, ঝর্ণা আর সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ফলে পুরো পর্যটন এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতিপ্রেমী ও ট্র্যাকিংপ্রেমীদের অন্যতম প্রিয় স্থান। বর্ষা এলেই পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো নতুন রূপে সেজে ওঠে। পাথরের গা বেয়ে ধাপে ধাপে নেমে আসা জলধারা, দুর্গম ট্রেইলের রোমাঞ্চ এবং সবুজ বনভূমির নৈসর্গিক পরিবেশ পর্যটকদের বারবার টেনে আনে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের সমাগম দেখা যাচ্ছে বড়তাকিয়ার পূর্ব পাশে অবস্থিত নয় ধাপের খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। এছাড়া ছোট দারোগাহাটের সহস্রধারা-২, বড় দারোগাহাটের রূপসী ঝর্ণা, হাদি ফকিরহাট এলাকার নাপিত্তাছড়া, সুপ্তধারা, কমলদহ, ছাগলকান্দা, কুপিকাটা খুম ও মিটছড়ির দুর্গম ঝর্ণাপথেও প্রতিদিন ভ্রমণকারীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে।
পর্যটকদের আগমনকে ঘিরে চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। আবাসিক হোটেল, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, স্থানীয় যানবাহন, পার্কিং এবং ছোট ব্যবসায়ীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীও ঝর্ণার প্রবেশপথ ও ট্রেইলের আশপাশে গড়ে তুলেছে অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল এবং পর্যটকসেবা কেন্দ্র।
স্থানীয় তরুণরা গাইড হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বাঁশের লাঠি, রেইনকোট ও ট্র্যাকিং সরঞ্জাম ভাড়া দিচ্ছেন। অনেকেই পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ, লকার ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে আয় করছেন। পাশাপাশি পাহাড়ি আনারস, ডাব, লটকন, পেঁপে ও বাঁশকোড়ল বিক্রি করেও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় মানুষের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি পর্যটক আসেন। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গাইড, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং আশপাশের বহু পরিবার সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন। ঝর্ণাকেন্দ্রিক পর্যটন অনেক তরুণের জন্য কর্মসংস্থানেরও নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বন বিভাগ ও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেইল ত্যাগের নির্দেশনা, নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড নিয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক মোঃ রাকিব হাসান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীতাকুণ্ডের ঝর্ণাগুলোর অনেক ভিডিও দেখেছি। বর্ষাকালে এসে বাস্তবে যে সৌন্দর্য দেখলাম, তা ছবির চেয়েও অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর। বিশেষ করে খৈয়াছড়া ঝর্ণার জলধারা এবং পাহাড়ি ট্রেইলের রোমাঞ্চ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে পর্যটকদেরও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।”
কুমিল্লাহ থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে আসা সাবিহা ইসলাম বলেন, “প্রতিবার বর্ষা এলেই সীতাকুণ্ডে আসার চেষ্টা করি। এখানকার সবুজ পাহাড়, ঝর্ণার শীতল পানি আর প্রাকৃতিক পরিবেশ মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। এবার আগের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি দেখেছি। প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে পরিবার নিয়ে ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হবে।”
হোটেল সী-হিল সীতাকুণ্ড আবাসিক এর স্বত্বাধিকারী ইসমাঈল হোসেন সেলিম বলেন, “বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে হোটেলের কক্ষের চাহিদা বেশি থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক একদিনের পাশাপাশি রাতেও অবস্থান করছেন। এতে আমাদের ব্যবসা যেমন বাড়ছে, তেমনি হোটেলের কর্মচারী, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গেও মানুষের আয় বাড়ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সীতাকুণ্ডে সারা বছরই পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হবে।”
সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন ঝর্ণার ইজারাদার অহিদুল ইসলাম শরীফ চৌধুরী বলেন, “সহস্রধারা-২ থেকে রূপসী হয়ে খৈয়াছড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ঝর্ণাগুলোতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসছেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝর্ণাগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি সতর্কীকরণ ব্যানার, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড এবং প্রয়োজনীয় পর্যটকসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।”
বারৈয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল বলেন, “বর্ষা মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখ যোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে ভারী বৃষ্টি বা আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা জারি হলে পাহাড়ি ঝর্ণা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় বন বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।”
পরিবেশবিদ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ডের ঝর্ণাগুলোকে ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রমের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, পাহাড়ি ট্রেইলে শব্দদূষণ এবং ঝর্ণার পাথর ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, প্রশিক্ষিত গাইড নিয়োগ এবং বর্ষায় ভারী বৃষ্টির সময় ঝর্ণায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তারা।
তাদের মতে, পর্যটকদের চাপ সামলাতে নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশ্রামাগার স্থাপন এবং স্থানীয় জনগণকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন পাহাড়-ঝর্ণার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ আরও বাড়বে।
পরিকল্পিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা গেলে সীতাকুণ্ডের খৈয়াছড়া, সহস্রধারা, নাপিত্তাছড়া, সুপ্তধারা ও রূপসীসহ বিভিন্ন ঝর্ণাকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই ইকো-ট্যুরিজম বলয় গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটন বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া গেলে সীতাকুণ্ড শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও পরিচিতি পেতে পারে।
ডিএস./





















