০৬:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬

ভরা মৌসুমেও কপালে জুটছে না ইলিশ, দাম বেশ চড়া

ইলিশের মৌসুম যাই যাই করছে। এর মধ্যে পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে ইলিশের দাম বেশ চড়া। নিম্ন আয়ের মানুষেরা ইলিশ পাতে তুলতে পারছেন না। এমনকি ইলিশের বাড়িতে মানুষের পাতেও উঠছে না জাতীয় মাছটি। অনেকে বলছেন- এবার মনে হয় ভরা মৌসুমেও কপালে জুটছে না ইলিশ।

ইলিশের বাড়ি বলা হয় দ্বীপ জেলা ভোলাকে। কারণ এর চারপাশে ইলিশের অভয়াশ্রম বলে খ্যাত মেঘনা আর তেঁতুলিয়া নদী। মৌসুমের শেষে এসে কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশের দেখা মিললেও কমেনি দাম।

জেলেরা বলছে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত ইলিশের দেখা না মেলায় দাম কমছে না।

মাছের ব্যাপারীরা বলছেন, ভরা মৌসুমেও তেমন ইলিশ ধরা পড়েনি। তাই জেলেদের চাহিদা (খরচ না ওঠা) এখনো পূরণ হয়নি। তাদের চাহিদা পূরণ হওয়ার পর দাম কমবে।

বিক্রেতারা বলছে, নদীতে আগে বেশি ইলিশ ধরা পড়লেও এখন সে তুলনায় কম ধরা পড়ছে। তাই দাম কমেনি।

চরফ্যাশনের চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা খালেক মাঝি বলেন, ইলিশ মাছের সিজনে ইলিশ মাছ খাইতে পারি না। কিনব কিভাবে- এবার ইলিশের যে দাম গেল কয়েক বছরের তুলনায় ডাবল। এতো দামে খাওয়া সম্ভব না। তাই ইলিশ কিনি নাই, কিনার ইচ্ছাও করি না। তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ বাড়লে ইলিশের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে জানিয়েছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হবে প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা, দেশে ইলিশ ধরা বন্ধ হয়ে যাবে ২২ দিনের জন্য। ডিম ছাড়ার পর এমনিতেই ইলিশ মেদহীন ও অপুষ্ট হয়ে যায়। এতে ইলিশের সেই স্বাদ আর থাকে না। ফলে সুস্বাদু ইলিশ খেতে চাইলে কিনতে হবে এই সময়ের মধ্যেই। সেই আশা নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত ক্রেতারা, তবে দাম শুনেই ভ্রূ কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। বাজারে ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকলেও দাম নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। প্রতিদিন চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটের সকাল-বিকাল ক্রেতায় ঠাসা থাকে।

চরফ্যাশনের মাছের বাজারে ব্যবসায়ী সাইফুল এসেছিলেন ইলিশ কিনতে। তার কাছে বিক্রেতা প্রতি কেজি ছোট ইলিশের দাম চাইলেন ৭০০ টাকা। এর চেয়ে একটু বড়, তবে ওজন এক কেজির নিচে সেগুলোর কেজি এক হাজার টাকা। এক কেজি বা তার চেয়ে বেশি ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু।

চড়া দাম দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইফুল বলেন, ‘এবার মনে হয় কপালে ইলিশ জুটবে না।’

আরেক ক্রেতা চরফ্যাশন দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বিক্রেতাকে প্রশ্ন করেন, বছরের অন্য সময় ইলিশের যে দাম, মৌসুমেও একই দাম কেন? বিক্রেতা কিছুটা বিরক্তির ভাব নিয়ে জবাব দিলেন, ‘আড়তে দাম বেশি হলে আমার করার কী আছে?’ অতৃপ্তি নিয়ে শেষ হবে ইলিশের প্রধান মৌসুম?

বর্তমানে এক কেজি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর থেকে দাম কমে গেলে জেলে থেকে শুরু করে মৎস্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলেই কেবল সীমিত আয়ের মানুষের পাতে উঠতে পারে। নইলে অতৃপ্তি নিয়েই শেষ হবে এবার ইলিশের প্রধান মৌসুম।সামরাজ ঘাটের শাহাবুদ্দিন দালাল নামে এক মৎস্য ব্যবসায়ী বলেন, ইলিশ মাছের আমদানি কম তবে চাহিদা অনেক বেশি। তার জন্য মাছের দাম একটু বেশি। মাছের দাম একটু বেশি হওয়ায় আমাদের বেচা-বিক্রিও অনেক কমেছে। ক্রেতারা আসে তবে তাদের সাধ্যের মধ্যে না হওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতারাই ফিরে যান।

চরফ্যাশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মালিক সমিতির নেতা আজ্জি পাটোয়ারি বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে নদীতে ইলিশের সংখ্যা কম হওয়ায় আমদানিও কম। তাই বাজারে অন্য সব দিনের তুলনায় দাম একটু বেশি। নিম্নচাপ থাকায় এতদিন জেলেরা বেকার ছিলেন। গত কয়েক দিন হলো তারা সাগরে গিয়েছেন। জেলেরা ফিরে এলেই বাজারে ইলিশের দাম অনেকটাই কমে আসবে। তবে সাগরে যেতে আগের চেয়ে জেলেদের তেলের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশের দামও একটি বেশি।

সামরাজ মৎস্যঘাট জেলে সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, অধিক ঝুঁকি জেনেও মাছের ব্যবসা করছি। দীর্ঘ বছর ধরে এ ব্যবসার সাথে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। চরফ্যাশন উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তর মৎস্যঘাট হলো সামরাজ ঘাট। ইলিশের ভরা মৌসুমে এ ঘাটে দৈনিক ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। এ বছরের শুরুর দিকে যে খারাপ অবস্থা ছিলো, তা গত ৯-১০ বছরেও দেখিনি। বৃষ্টি-বাতাসে কারনে নদীর পানি বেড়েছে। একারনে নদীতে ইলিশ ধরা পড়েছে তা-ও আশানুরূপ না। জেলেরা তেলের খরচ উঠাতে পারলেও আড়তদারদের দাদন পরিশোধ করার মতো সুযোগ হয় না। এই মৎস্যঘাটে ৯৮ জন মৎস্য আড়তদার রয়েছে। এসব আড়তদাররা প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

‎চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীতে লবনাক্ততা কমেছে। এতে নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নদী ও সমুদ্রে যেতে পারেনি। একারনে ইলিশের সরবরাহ কম। বর্তমানে ইলিশের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।

ডিএস./

ট্যাগ :

ভরা মৌসুমেও কপালে জুটছে না ইলিশ, দাম বেশ চড়া

ভরা মৌসুমেও কপালে জুটছে না ইলিশ, দাম বেশ চড়া

প্রকাশিত : ০৬:০৪:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

ইলিশের মৌসুম যাই যাই করছে। এর মধ্যে পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে ইলিশের দাম বেশ চড়া। নিম্ন আয়ের মানুষেরা ইলিশ পাতে তুলতে পারছেন না। এমনকি ইলিশের বাড়িতে মানুষের পাতেও উঠছে না জাতীয় মাছটি। অনেকে বলছেন- এবার মনে হয় ভরা মৌসুমেও কপালে জুটছে না ইলিশ।

ইলিশের বাড়ি বলা হয় দ্বীপ জেলা ভোলাকে। কারণ এর চারপাশে ইলিশের অভয়াশ্রম বলে খ্যাত মেঘনা আর তেঁতুলিয়া নদী। মৌসুমের শেষে এসে কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশের দেখা মিললেও কমেনি দাম।

জেলেরা বলছে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত ইলিশের দেখা না মেলায় দাম কমছে না।

মাছের ব্যাপারীরা বলছেন, ভরা মৌসুমেও তেমন ইলিশ ধরা পড়েনি। তাই জেলেদের চাহিদা (খরচ না ওঠা) এখনো পূরণ হয়নি। তাদের চাহিদা পূরণ হওয়ার পর দাম কমবে।

বিক্রেতারা বলছে, নদীতে আগে বেশি ইলিশ ধরা পড়লেও এখন সে তুলনায় কম ধরা পড়ছে। তাই দাম কমেনি।

চরফ্যাশনের চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা খালেক মাঝি বলেন, ইলিশ মাছের সিজনে ইলিশ মাছ খাইতে পারি না। কিনব কিভাবে- এবার ইলিশের যে দাম গেল কয়েক বছরের তুলনায় ডাবল। এতো দামে খাওয়া সম্ভব না। তাই ইলিশ কিনি নাই, কিনার ইচ্ছাও করি না। তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ বাড়লে ইলিশের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে জানিয়েছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হবে প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা, দেশে ইলিশ ধরা বন্ধ হয়ে যাবে ২২ দিনের জন্য। ডিম ছাড়ার পর এমনিতেই ইলিশ মেদহীন ও অপুষ্ট হয়ে যায়। এতে ইলিশের সেই স্বাদ আর থাকে না। ফলে সুস্বাদু ইলিশ খেতে চাইলে কিনতে হবে এই সময়ের মধ্যেই। সেই আশা নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত ক্রেতারা, তবে দাম শুনেই ভ্রূ কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। বাজারে ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকলেও দাম নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। প্রতিদিন চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটের সকাল-বিকাল ক্রেতায় ঠাসা থাকে।

চরফ্যাশনের মাছের বাজারে ব্যবসায়ী সাইফুল এসেছিলেন ইলিশ কিনতে। তার কাছে বিক্রেতা প্রতি কেজি ছোট ইলিশের দাম চাইলেন ৭০০ টাকা। এর চেয়ে একটু বড়, তবে ওজন এক কেজির নিচে সেগুলোর কেজি এক হাজার টাকা। এক কেজি বা তার চেয়ে বেশি ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু।

চড়া দাম দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইফুল বলেন, ‘এবার মনে হয় কপালে ইলিশ জুটবে না।’

আরেক ক্রেতা চরফ্যাশন দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বিক্রেতাকে প্রশ্ন করেন, বছরের অন্য সময় ইলিশের যে দাম, মৌসুমেও একই দাম কেন? বিক্রেতা কিছুটা বিরক্তির ভাব নিয়ে জবাব দিলেন, ‘আড়তে দাম বেশি হলে আমার করার কী আছে?’ অতৃপ্তি নিয়ে শেষ হবে ইলিশের প্রধান মৌসুম?

বর্তমানে এক কেজি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর থেকে দাম কমে গেলে জেলে থেকে শুরু করে মৎস্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলেই কেবল সীমিত আয়ের মানুষের পাতে উঠতে পারে। নইলে অতৃপ্তি নিয়েই শেষ হবে এবার ইলিশের প্রধান মৌসুম।সামরাজ ঘাটের শাহাবুদ্দিন দালাল নামে এক মৎস্য ব্যবসায়ী বলেন, ইলিশ মাছের আমদানি কম তবে চাহিদা অনেক বেশি। তার জন্য মাছের দাম একটু বেশি। মাছের দাম একটু বেশি হওয়ায় আমাদের বেচা-বিক্রিও অনেক কমেছে। ক্রেতারা আসে তবে তাদের সাধ্যের মধ্যে না হওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতারাই ফিরে যান।

চরফ্যাশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মালিক সমিতির নেতা আজ্জি পাটোয়ারি বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে নদীতে ইলিশের সংখ্যা কম হওয়ায় আমদানিও কম। তাই বাজারে অন্য সব দিনের তুলনায় দাম একটু বেশি। নিম্নচাপ থাকায় এতদিন জেলেরা বেকার ছিলেন। গত কয়েক দিন হলো তারা সাগরে গিয়েছেন। জেলেরা ফিরে এলেই বাজারে ইলিশের দাম অনেকটাই কমে আসবে। তবে সাগরে যেতে আগের চেয়ে জেলেদের তেলের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশের দামও একটি বেশি।

সামরাজ মৎস্যঘাট জেলে সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, অধিক ঝুঁকি জেনেও মাছের ব্যবসা করছি। দীর্ঘ বছর ধরে এ ব্যবসার সাথে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। চরফ্যাশন উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তর মৎস্যঘাট হলো সামরাজ ঘাট। ইলিশের ভরা মৌসুমে এ ঘাটে দৈনিক ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। এ বছরের শুরুর দিকে যে খারাপ অবস্থা ছিলো, তা গত ৯-১০ বছরেও দেখিনি। বৃষ্টি-বাতাসে কারনে নদীর পানি বেড়েছে। একারনে নদীতে ইলিশ ধরা পড়েছে তা-ও আশানুরূপ না। জেলেরা তেলের খরচ উঠাতে পারলেও আড়তদারদের দাদন পরিশোধ করার মতো সুযোগ হয় না। এই মৎস্যঘাটে ৯৮ জন মৎস্য আড়তদার রয়েছে। এসব আড়তদাররা প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

‎চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীতে লবনাক্ততা কমেছে। এতে নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নদী ও সমুদ্রে যেতে পারেনি। একারনে ইলিশের সরবরাহ কম। বর্তমানে ইলিশের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।

ডিএস./