০৮:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬

কর্ণফুলী পেপার মিলের লোকসান কয়েকশ’ কোটি টাকা

অর্থ সংকট, পুরাতন যন্ত্রপাতি, মিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহেলা, কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা ও বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)। ক্রমাগত লোকসানের ভারে এখন ধুঁকছে মিলটি। সঠিক দিকনির্দেশনা ও নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই মিলের উত্পাদন আগের মতো আসবে বলে মনে করছেন মিলের প্রাক্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী ৬ জুলাই শিল্পমন্ত্রীর মিল পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে। এ খবরে শ্রমিকদের মাঝে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কয়েকশ’ কোটি টাকা। অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেক পাওনা ও বকেয়া রয়েছে। কাঁচামাল ও বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের পাওনা রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের পাওনা পরিশোধ এবং নতুন করে অর্থ যোগান দিয়ে কারখানাটি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসানের মধ্যে থাকায় ঠিকাদাররাও কাঁচামাল সরবরাহে আগ্রহ হারিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানার মেশিন (টারবাইন) চালানোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০ টন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মাসে খরচ পড়ে দেড় কোটি টাকার মতো। কিন্তু খরচের তুলনায় তেমন কাগজ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। কারণ কাগজ উত্পাদন করার জন্য যেসব আধুনিক মেশিনারিজ দরকার হয় তেমন মেশিন এ প্রতিষ্ঠানে নেই। পুরনো আমলের যে মেশিনগুলো আছে তা সংস্কার না করার কারণে নষ্ট হওয়ার পথে। আর যেগুলো আছে তা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে কাগজ উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না।

মিলের শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদের সভাপতি আবদুল রাজ্জাক জানান, কেপিএম এখন ধ্বংসের পথে। প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যাওয়ার কোনো অবস্থা নেই। বর্তমানে ৩০০ জন স্থায়ী শ্রমিক রয়েছে। উত্পাদন না থাকায় তাদের দু’মাসের বেতন বন্ধ। তিনি আরও বলেন, মূলত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং অর্থ বিনিয়োগ না করায় প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের মুখে। কর্তৃপক্ষের সুনজরে এলে কেপিএম হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

মিল সূত্র জানায়, বিসিআইসির পক্ষ থেকে দফায় দফায় বরাদ্দ দিয়েও কারখানাটি লাভজনক করা যায়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার মেট্রিক টন কাগজের উত্পাদন কম হয়েছে। ফলে কেপিএম বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় বিচলিত এখন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এ বিষয়ে জানতে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. এম এম কাদেরের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ভঙ্গুরদশা থেকে মুক্তি দিতে ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর পার্বত্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি টিম কেপিএম পরিদর্শন করে। তারা প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে এবং ওই এলাকায় নতুন করে আরেকটি মিল প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে আশ্বাস দেয়। কিন্তু বছর চলে গেলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

প্রসঙ্গত, ১৯৫১ সালে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে এক লাখ ২৬ হাজার একর জায়গাজুড়ে কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে প্রথম বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু হয়। এই প্রতিষ্ঠানের তিনটি ইউনিটে দৈনিক উত্পাদন ক্ষমতা ১১০ থেকে ১৩০ মেট্রিক টন। লাভের ধারাবাহিকতা ২০০১ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানামুখী দুর্নীতি ও অনিয়মে কেপিএম লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

 

বিবি/এমএ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বিপুল পরিমান ইয়াবাসহ এক মাদক কারবারী’কে গ্রেফতার করেছে: সিটিটিসি

কর্ণফুলী পেপার মিলের লোকসান কয়েকশ’ কোটি টাকা

প্রকাশিত : ১২:৩৩:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুলাই ২০১৯

অর্থ সংকট, পুরাতন যন্ত্রপাতি, মিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহেলা, কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা ও বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)। ক্রমাগত লোকসানের ভারে এখন ধুঁকছে মিলটি। সঠিক দিকনির্দেশনা ও নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই মিলের উত্পাদন আগের মতো আসবে বলে মনে করছেন মিলের প্রাক্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী ৬ জুলাই শিল্পমন্ত্রীর মিল পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে। এ খবরে শ্রমিকদের মাঝে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কয়েকশ’ কোটি টাকা। অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেক পাওনা ও বকেয়া রয়েছে। কাঁচামাল ও বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের পাওনা রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের পাওনা পরিশোধ এবং নতুন করে অর্থ যোগান দিয়ে কারখানাটি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসানের মধ্যে থাকায় ঠিকাদাররাও কাঁচামাল সরবরাহে আগ্রহ হারিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানার মেশিন (টারবাইন) চালানোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০ টন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মাসে খরচ পড়ে দেড় কোটি টাকার মতো। কিন্তু খরচের তুলনায় তেমন কাগজ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। কারণ কাগজ উত্পাদন করার জন্য যেসব আধুনিক মেশিনারিজ দরকার হয় তেমন মেশিন এ প্রতিষ্ঠানে নেই। পুরনো আমলের যে মেশিনগুলো আছে তা সংস্কার না করার কারণে নষ্ট হওয়ার পথে। আর যেগুলো আছে তা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে কাগজ উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না।

মিলের শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদের সভাপতি আবদুল রাজ্জাক জানান, কেপিএম এখন ধ্বংসের পথে। প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যাওয়ার কোনো অবস্থা নেই। বর্তমানে ৩০০ জন স্থায়ী শ্রমিক রয়েছে। উত্পাদন না থাকায় তাদের দু’মাসের বেতন বন্ধ। তিনি আরও বলেন, মূলত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং অর্থ বিনিয়োগ না করায় প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের মুখে। কর্তৃপক্ষের সুনজরে এলে কেপিএম হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

মিল সূত্র জানায়, বিসিআইসির পক্ষ থেকে দফায় দফায় বরাদ্দ দিয়েও কারখানাটি লাভজনক করা যায়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার মেট্রিক টন কাগজের উত্পাদন কম হয়েছে। ফলে কেপিএম বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় বিচলিত এখন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এ বিষয়ে জানতে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. এম এম কাদেরের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ভঙ্গুরদশা থেকে মুক্তি দিতে ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর পার্বত্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি টিম কেপিএম পরিদর্শন করে। তারা প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে এবং ওই এলাকায় নতুন করে আরেকটি মিল প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে আশ্বাস দেয়। কিন্তু বছর চলে গেলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

প্রসঙ্গত, ১৯৫১ সালে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে এক লাখ ২৬ হাজার একর জায়গাজুড়ে কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে প্রথম বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু হয়। এই প্রতিষ্ঠানের তিনটি ইউনিটে দৈনিক উত্পাদন ক্ষমতা ১১০ থেকে ১৩০ মেট্রিক টন। লাভের ধারাবাহিকতা ২০০১ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানামুখী দুর্নীতি ও অনিয়মে কেপিএম লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

 

বিবি/এমএ