ঢাকা দুপুর ২:৫১, রবিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

লক্ষ্যে অবিচল এক মহান নেত্রী

আশ্বিনের এক সোনালি রোদ্দুর ছড়ানো দুপুরে টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর জন্ম। গ্রামের ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এবং সরল-সাধারণ জীবনের মাধুর্যের মধ্য দিয়ে তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তার শৈশবের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষায় কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাকজ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক শুনে, তালতমালের ঝোপে বৈচি, দিঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনায়কদের শিরোপা তাঁর মাথায়। তাঁর শিরোপার উষ্ণীষে লেখা রয়েছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। বিবিসি’র জরিপে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে, তেমনি বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল, যোগ্য ও দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার নামটিও বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি উচ্চারিত হবে। পিতা-পুত্রী এবং দুজন স্বতন্ত্র্য মানুষ হলেও, বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তিন-দফায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে যে কাজগুলো করেছেন, জীবিত থাকলে বঙ্গবন্ধু সেই কাজগুলো হয়তো অনেক আগেই করতেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন রূপায়ণে, তাঁর প্রিয় দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাঁর আরাধ্য ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ শেখ হাসিনা সম্পন্ন করেছেন। দাঁড় করিয়েছেন বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় রোল মডেল হিসেবে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন করেছেন বলেই বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিয়ে পরস্পরের পরিপূরক বলেছি। দেশবাসী এখন শেখ হাসিনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পান। সেটি কেবল সন্তান হিসেবে নয়, সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।

একটি রাজনৈতিক পরিবারে শেখ হাসিনার জন্ম। ছাত্রজীবনে গভীরভাবে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে যে পটভ‚মিতে তাঁকে আসতে হয়েছে, তা ছিল তাঁর চিন্তার বাইরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত না হলে, শেখ হাসিনাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ১৯৮১ সালে পুত্র-কন্যাদের ছেড়ে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং দলের দায়িত্বভার নিতে হতো না। শেখ হাসিনার জবানীতেই আমরা জানি, তিনি লিখেছেন

“রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। পিতা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। একদিন যে আমাকেও তাঁর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে ভাবিনি। সময়ের দাবি আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি এই আদর্শ নিয়ে বিগত ২৮ বছর যাবৎ জনগণের সেবক হিসেবে রাজনীতি করে যাচ্ছি।”

শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম সংস্করণের ভ‚মিকা, ৩০শে নভেম্বর, ২০০৯

এই লেখার পর আরও প্রায় ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। পিতার আদর্শের পথ ধরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ৩৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই ৩৮ বছরের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন কী ছিল?

অনেকেই সরলীকরণ করে বলেন, পিতার হত্যার বিচার, তাঁর মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই ছিল শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন। নিঃসন্দেহে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের মধ্যে এই অভীষ্টগুলো ছিল। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, অপরাধীদের কয়েকজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অর্থাৎ জাতির পিতার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালেই আওয়ামী লীগকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদি এটুকুতেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভিশন সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে এই ভিশন বা লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর তাঁর আর রাজনীতিতে থাকার প্রয়োজন ছিল না। বস্তুত কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তিনি রাজনীতি করেননি এবং করছেন না। রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে :

“আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ক্ষমতায় আরোহণের জন্য আমাদের দেশে সাধারণত রাজনৈতিক ইস্যুকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। সমাজসংস্কার বা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ইস্যু করা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিরোধী দল রাজনৈতিক ইস্যুর সন্ধানে অনেক সময় ব্যয় করেছে। অবশ্য এটা ঠিক যে, একটা পর্যায় পর্যন্ত এর প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল ততদিন পর্যন্ত যতদিন গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ছিল না। আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতির একটা পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা হতে হবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। আন্দোলন হবে সমাজসংস্কারের জন্য। আর এ উন্নয়ন মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। এ উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য।”

বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খন্ড , পৃ. ২১১-২১৩।

জননেত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় যে কথাগুলো বারবার উচ্চারণ করেছেন, তা হলো

(১) সকল মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূর্ণ করতে হবে;
(২) প্রত্যেক কর্মক্ষম নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
(৩) প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা;
(৪) শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রভৃতি নিশ্চিত করাই হবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

বিশেষ করে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ বঞ্চিত মানুষের ওপর। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চনার অবসান ঘটানোই হবে রাজনীতির লক্ষ্য। আর এজন্য, তার ভাষায় :

“সম্পদের সুষম বণ্টন প্রয়োজন। কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না। সকলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কর্মসূচি প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, সুস্থ-সবল জাতি গঠন করা। রাজনীতি হতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। দেশকে আমরা কী দিতে পারলাম সেটাই একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা-ভাবনা হতে হবে। দেশকে গড়ে তোলা, মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি নিয়ে আসা, মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মিটানো অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলবে, শান্তিতে ঘুমাবে। আমাদের চিন্তা মানুষকে ঘিরে। দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনেই আমরা নিবেদিত। মানুষের অসহায়ত্ত আমাদের পীড়া দেয়। তাই সামাজিক সমস্যা দূর করা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে এই ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়া এমন একটি সমাজ, যেখানে থাকবে না শোষণ-বঞ্চনা। সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যেই নতুন সমাজ গড়তে হবে।”

শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খন্ড , পৃ. ২১৩-২১৪।

এ-কথাগুলো যে কেবল আপ্তবাক্য নয়, শেখ হাসিনা তিন-দফা রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাস্তব কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন।

শেখ হাসিনা এ-কথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন, কেবল চটকদার প্রতিশ্রতি ঘোষণা এবং বাগাড়ম্বর দিয়ে বেশিদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। যে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের কথা তিনি বলেছেন, তা করতে হলে সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। সম্পদ না থাকলে সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা অর্থহীন হয়ে পড়বে। খাদ্য ঘাটতি এবং খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত খাদ্য প্রয়োজন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, তার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই (১৯৯৬-২০০১) বাংলাদেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। কিন্তু ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসায় দেশ আবার খাদ্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত, টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে ৪৪ শতাংশ থেকে চরম দারিদ্র্যসীমা ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়াও উন্নয়ন ঘটেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

মেহেদী হাসান বাবু, সম্পাদক ও প্রকাশক, আজকের বিজনেস বাংলাদেশ

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

এ বিভাগের আরও সংবাদ