তিন বছরের কন্যাকে নিয়ে চিকিৎসক স্বামী ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা শ্বশুরসহ শ্বশুর বাড়ির নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানিয়েছেন বৈশাখী ভট্টাচার্য (মৌ) নামে এক নারী। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে এই আকুতি জানান তিনি। বৈশাখী অভিযোগ করেন, তার স্বামী চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসক কামনাশীষ চক্রবর্তী সেতু, শাশুড়ি এবং তার শ্বশুর সাবেক অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী মিলে যৌতুকের দাবিতে গত ৪ বছরের বেশি সময় ধরে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাদের নির্যাতনের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে তাতে ভুক্তভোগী নারীর মৃত্যুও হতে পারতো। তাদের পাশবিক নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি ওই নারীর ৩ বছর বয়সী কন্যাসন্তানও। কিন্তু শ্বশুর পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা হওয়ায় ওই নারী আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সুরক্ষা সেবা কিংবা আইনী সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উত্থাপন করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। সংবাদ সম্মেলনে বৈশাখী ভট্টাচার্য জানান, বিয়ের সময় চাপে ফেলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন ৫০ লাখ টাকা মূল্যের জিনিসপত্র যৌতুক হিসেবে আদায় করে নেয়। এরপর বিয়ের তিন মাস যেতে না যেতেই একটি ফ্লাট যৌতুক দাবি করে। ফ্লাট না পেয়ে বৈশাখী ভট্টাচার্যের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি। বৈশাখী বলেন, আমার শাশুড়ি গরম খুন্তি দিয়ে আমার পিঠে ছ্যাঁকা দিত। আমার চুল কেটে দিয়েছিল। চার মাসের অন্তসত্ত্বা থাকা অবস্থায় গরম পানি ঢেলে দিয়েছিল শাশুড়ি। আমি যখন ৬ মাসের অন্তস্বত্তা তখন শ্বশুর আমাকে মেরে ঘর থেকে বের করে দেয় এবং বলে ৮০ লাখ টাকা বাবার থেকে নিয়ে আসতে। আমি এক কাপড়ে বাবার ঘরে চলে । আমি যখন ৯ মাসের অন্তস্বত্তা আমার ডাক্তার রিংকু দাসের কাছে চেকআপ এর জন্য যাই। সেখানে আমার স্বামী ও শ্বশুর আমাকে বলে আমাকে আমার বাসায় নামিয়ে দিয়ে তারা চলে যাবে। আমিও সরল বিশ্বাসে তাদের সাথে গাড়ি করে আসি। তারা আমাকে বাবার বাসায় না নামিয়ে তাদের চট্টগ্রামের মমিন রোডের বাসার নিচে নিয়ে যায়।
সেখানে নিয়ে গিয়ে আমার শশুর বলে আমার বাবাকে কল করে ৮০ লক্ষ টাকা আনতে বলে। ৮০ লক্ষ টাকা না দিলে আমার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না এবং আমাকে ৮০ লক্ষ টাকার জন্য মারধর করে এবং খালি স্টাম্পে স্বাক্ষর করতে বলে। সেখান থেকে পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার পেয়ে আমি আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা করি। পারিবারিক মামলা নং-২১৫/২০। এভাবে ৩ (তিন) বছর কেটে যায়। বাচ্চা আর আমার কোনো দায়িত্ব আমার স্বামী নেয় নাই। বৈশাখী বলেন, এরপর ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল তারিখে মামলাটি যখন শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য থাকে সেদিন তারা কোর্টে হাজির হয়ে আপোষণামা জমা দিয়ে বলে আমাকে নিয়ে যাবে ও সংসার করবে। ২০২২ সালের ৬ মে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ এলাকার বিলকিস ভবন নিচ তলায় তারা বাসা ভাড়া নেয়। আমাকে আর মেয়েকে আমার স্বামী ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। আমি মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার সাথে আমি চলে যাই। বাসায় যাওয়ার ২/৩ দিন পর আমর শ্বশুর শাশুড়ি ভাড়া বাসায় আসে এবং আমাকে পুনরায় ৮০ লাখ টাকার কথা বলে তারা আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে এবং অকথ্য গালি-গালাজ করে চয়ে যায়। এরপর হতে প্রত্যেকদিন আমার স্বামী ৮০ লাখ টাকার জন্য আমাকে মানসিক চাপ দিতে থাকে। ২০২২ সালের ২৩ মে তারিখ রাত ১০ টায় আমার স্বামী বাসায় আসলে আমি তাকে খেতে দিই। তখন সে ৮০ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা হয়েছে কিনা বলে আমাকে লাথি মারে এবং থাপ্পর মারে। আমি তাকে মারছে কেন জিজ্ঞেস করলে সে সার্জিক্যাল ছুরি দ্বারা আমার হাতে পোচ মারলে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়। আমার স্বামী তার বাবাকে কল করে বলে আমাকে চিরতরে সরিয়ে দিতে হবে। তা শোনামাত্র আমি ৯৯৯ এ কল করি। এর মধ্যে আমার শ্বশুর শাশুড়ি ঘরে ঢুকে পরে ফোন ছিনিয়ে নেয়। আমার শ্বশুর আমাকে ডান চোখে ঘুষি মারে এবং আমার শাশুড়ি আমাকে ভাঙ্গা ইট দিয়ে বাম হাতের উপরে মারে। এরপর আমার শশুর শাশুড়ি আমার জামা ছিড়ে দেয় এবং আমাকে আমার স্বামী ও শাশুড়ি গলা চেপে ধরলে আমার রক্তবমি হয়। আমার মেয়ে এগিয়ে আসলে আমার শশুর শাশুড়ি আমার মেয়েকে মেরে জখম করে। আমার চিৎকারে বাসার কেয়ারটেকার এবং ভাড়াটিয়ারা এগিয়ে আসে। আমি বিবস্ত্র অবস্থায় বাইরে এসে ঘটনা খুলে বললে তাদেরকে ভাড়াটিয়ারা আটকিয়ে রাখে। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদেরকে এবং আমাকে মেয়েকে গাড়ি করে কোতয়ালী থানায় নিয়ে যায়। আমার অবস্থা খারাপ দেখে পুলিশ আমাকে চট্টগ্রাম হাসপাতালে ২৭ নং ওয়ার্ডে ৪৮ নং বেডে ভর্তি করে দেয়। পরের দিন বিকেলে হাসপাতালে ৩ জন ডাক্তারী পোষাক পরা ছেলে এসে আমাকে বলে গতকালের কোন বিষয়ে যেন জানাজানি না হয়। জানাজানি হলে আমার এবং আমার পরিবারের ক্ষতি হবে। কোন মামলা যেন না করি করলে আমার জান মালের ক্ষতি করবে। বৈশাখী বলেন, আমার শ্বশুর পুরিশের সাবেক কর্মকর্তা হওয়ায় চট্টগ্রাম মহানাগরের কোতয়ালী থানা মামলা নেয়না আমার। এরপর আমি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭, চট্টগ্রামে মামলা দায়ের করি যার নং ১৩৯/২২। ঘটনার পর ২৯ মে তারিখে বাড়ির মালিকের সহযোগিতায় আমর স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ি মিলে আমার ও মেয়ের সব জিনিসপত্র যেমন: ব্যাগে থাকা ২০ (বিশ) হাজার টাকা, ১.৫ (দের ভরি) ওজনের গলার ১টি নেকলেস, ১৪ (চৌদ্ধ) আনা ওজনের ১টি স্বর্ণের চেইন, ২ (দুই) ভরি ওজনের স্বর্ণের ২টি হাতে বালা, ৬ (ছয়) আনা ওজনের স্বর্ণের ২টি কানের দুল, পাসপোর্ট, এনআইডি কার্ড, আমার শাড়ি কাপড়, মেয়ের কাপড় চোপড়, মোবাইলফোন সহ সকল মূল্যবান জিনিস নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি ও তার তিন বছরের মেয়ে জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জীবনের নিরপত্ত প্রার্থনা করেছেন।
















