ঢাকা দুপুর ১২:৫৬, মঙ্গলবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

খাস জমিতে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান

খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন ১১ পরিবারের এরশাদ আলম, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে মাথা গুজার ঠাঁই হলো ১১ দিনমজুর অসহায় পরিবারের। সরকারি খাস জায়গা পাহাড়ি এলাকায় চারা রোপিত বাগানে মানবেতর জীবন যাপন করছে তারা। গত ৫ ডিসেম্বর বিকেলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের রশিদের ঘোনা মৌজার দক্ষিণ চাকফিরানী ফার্ম মুড়ায় নির্মাণাধীন আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে। সরজমিন পরিদর্শনকালে জানা যায়, ৩০ নভেম্বর দিনব্যাপি ওই এলাকায় গড়ে ওঠা গরুর খামার সহ ১২ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে উপজেলা প্রশাসন। তাতে ১১ পরিবারের থাকার জায়গা টিনের ঘর ভেঙে ফেলা হয়েছে। যার দরুন, বাস্তুহারা হয়ে তাদের জীবন ধারণ হয়ে উঠেছে প্রকট। উচ্ছেদকৃত টিনের ঘরগুলো এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে। গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আধাপাকা একটি ঘরও। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে একসাথে জড়ো হয়ে ভুক্তভোগী মাজেদা বেগম, আয়েশা বেগম, রাজিয়া বেগম, শাহীন আক্তার, নূর আয়েশা, মিনু আক্তার, জুনু আক্তার আক্ষেপের সাথে বলেন, সরকার ভূমিহীনদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বসতবাড়ী করে দিচ্ছে; আর আমাদের বাড়ি ভেঙে আশ্রয়হীন করে দিচ্ছে। এখন আমরা যাব কোথায়? আমরা আমাদের ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে যাযাবরের মতো মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছি। এ বিষয়ে আমাদের এম.পি মহোদয়, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহৃদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এলাকার ভুক্তভোগী ভূমিহীন সোহেল বলেন, আমার কোন বাড়িঘর না থাকায় ৬ বছর আগে স্থানীয় মিয়া ফজলুল কাদের গং থেকে ৫ গন্ডা দখলীয় জায়গা ক্রয় করে বসতি গড়ে বসবাস করছি। তাছাড়া বন্য হাতির হামলা হতে রক্ষার জন্য ৫টি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে একটি সেমি-পাকা ঘর তুলেছি। সেই ঘরটি আজ চুরমার হয়ে গেলো। অন্য এক ভুক্তভোগী কামাল উদ্দীন কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছোট শিশুদের নিয়ে আমরা এখন যাব কোথায়? আমার টিনের ছাউনি ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন। এমনকি আমার বাড়ির আসবাবপত্রও নষ্ট করে ফেলেছে। আমি তখন বাহিরে কাজ করতে গিয়েছিলাম। গরুর খামারের মালিক আবদুল কাইয়ুম বলেন, জনৈক গুরা পুতু থেকে দখলীয় জায়গা কিনেছি। ঐ জায়গায় ঘর তৈরি করার জন্য জায়গা বন্ধক দেই এবং ব্যাংক থেকে লোন গ্রহণ করি। এখন আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল গফুর বলেন, স্থানীয় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাদের রেষারেষিতে প্রতিপক্ষের লোককে ঘায়েল করতে কিছু অসহায় নিরীহ ব্যক্তির উপর যে আঘাত এসেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন তাদের মাথা গুজার ঠাঁই নেই। এদের প্রতি এগিয়ে আসার জন্য বিত্তশীল ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আরেক আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ সমাজসেবক শফিউল আলম বলেন, সরকার দেশের ভূমিহীনদেরকে শতভাগ আশ্রয় দানের কাজে সাফল্য অর্জন করেছেন। আর অন্য দিকে অসহায়-দরিদ্রদের ঘর ভেঙে দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রতিষ্ঠা কোন ধরণের উন্নয়নের দৃষ্টান্ত তা আমি বুঝতে পারছি না। সাবেক ইউপি সদস্য আইয়ুব মেম্বার জানান, এলাকায় প্রতিহিংসার রাজনীতিতে কতগুলো সাধারণ মানুষ আজ নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। তাছাড়া স্বার্থান্বেষী মহল সংবাদকর্মীদের ভুয়া তথ্য দিয়ে পত্রিকায় কাল্পনিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে আজকে এলাকার সাধারণ মানুষের চোখ কালো ছায়ায় জর্জরিত। তাতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফরিদুল আলম জানান, কথিত এক সাংবাদিক প্রতিপক্ষের সাথে আঁতাৎ করে সরকারি খাস জায়গার দখল বিষয়ে আমাকে জড়িয়ে যে সংবাদ প্রকাশ করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ উল্যাহ বলেন, উক্ত এলাকায় কিছু পরিবার সরকারি খাস জায়গার উপর ভাসমান ঘর তৈরি করে বসবাস করছিলো। সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় পড়ার কারণে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদেরকে মৌখিকভাবে বাসস্থান ছেড়ে দেওয়ার জন্য জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় এবং তারা ঘরবাড়ি অপসারণ না করায় তাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উচ্ছেদগুলো ঘরগুলো নতুন স্থাপনা। সেখানে কেউ বসবাস করে না। শুধু মাত্র ১টি ঘরে লোকজন বসবাস করে। সরকারি খাস জায়গায় তাদের থাকার সুযোগ নেই। তারা যদি ভূমিহীন হয়ে থাকে তাহলে আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ