ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এই আধুনিক সময়ে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বই পড়ার চর্চা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন গেমস ও নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের ভিড়ে লাইব্রেরীকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার মানব সভ্যতার জ্ঞান, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের অর্জিত জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিস্তারে লাইব্রেরির ভূমিকা অপরিসীম।
জ্ঞান অর্জন ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রে লাইব্রেরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি লাইব্রেরি শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি মানুষের চিন্তা, মনন ও সৃজনশীলতার বিকাশের একটি কেন্দ্র। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় লাইব্রেরিগুলো জ্ঞান সঞ্চালনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত বই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মানুষের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে পৌঁছে দেয়।
অনেকের জীবনের সঙ্গে লাইব্রেরির সম্পর্ক গড়ে ওঠে শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় স্কুলের কাছাকাছি থাকা একটি লাইব্রেরি থেকেই অনেকের জ্ঞান ও বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিকেলের অবসর সময়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে নানা ধরনের জ্ঞানবিষয়ক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার মধ্য দিয়ে বইয়ের জগতে প্রবেশ ঘটে। সেই অভ্যাসই পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ বা অবস্থানের সময় স্থানীয় লাইব্রেরি ঘুরে দেখার আগ্রহ তৈরি করে।

তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারের কারণে লাইব্রেরি চর্চা অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন বই পড়ার পরিবর্তে অনলাইন জগতে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এখনো লাইব্রেরি ব্যবহারের সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে লাইব্রেরি ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জন করে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই লাইব্রেরির সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার ফলে তারা বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু বয়স থেকেই যদি শিশুদের লাইব্রেরির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে টিকটক, অনলাইন জুয়া, অনলাইন গেমসসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ডিজিটাল আসক্তি থেকে দূরে থাকতে পারবে এবং বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
এমন প্রেক্ষাপটে নওগাঁ জেলা পুলিশ লাইনে নতুন করে বই পড়ার পরিবেশ গড়ে তুলতে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করেছে পুলিশ লাইন লাইব্রেরি “বাতিঘর”। এই লাইব্রেরির মূল উদ্দেশ্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।
এর আগে বিভিন্ন কর্মস্থলেও ছোট পরিসরে লাইব্রেরি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত অবস্থায় একটি ছোট কিন্তু সুন্দর লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয় এবং সহকর্মীদের বই পড়ায় উৎসাহিত করা হয়। একইভাবে নাটোর জেলায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ লাইনের ছোট লাইব্রেরিটিকেও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
নওগাঁ জেলা পুলিশ লাইনে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই “বাতিঘর” লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই লাইব্রেরির মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা অবসর সময়ে বই পড়ার সুযোগ পাবেন এবং তাদের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।
লাইব্রেরিটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক বই সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার লেখক, গবেষক ও সচেতন নাগরিকদের নিজস্ব লেখা বই বা প্রকাশনা লাইব্রেরি “বাতিঘর”-এ দান করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আগ্রহীরা তাদের বই ব্যক্তিগতভাবে, কুরিয়ার বা ডাকযোগে পুলিশ সুপারের কার্যালয়, নওগাঁতে পাঠাতে পারবেন।
উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সমাজে বই পড়ার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করতে লাইব্রেরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রয়োজনীয় ব্যবহার বজায় রেখে যদি মানুষ অবসর সময়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
জ্ঞানচর্চার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের আশা, নওগাঁ পুলিশ লাইনের “বাতিঘর” লাইব্রেরি ভবিষ্যতে জ্ঞান, মনন ও আলোর এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
ডিএস./





















