১২:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা:রংপুরে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সংকট

কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই প্লাবিত হয়েছে রংপুর নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চল।

শনিবার (২ মে) সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হলেও এই তুলনামূলক মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ, আর এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বাবুখা, মাস্টারপাড়া, আবহাওয়া অফিস এলাকা, চারতলা মোড় কলোনি, লালবাগ, পার্কের মোড়, মেডিকেল ক্যাম্পাস, নীলকণ্ঠ সোটাপীর ও শান্তিবাগসহ অন্তত ১০টি এলাকায় সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে আছে।কোথাও কোথাও ড্রেন উপচে ময়লা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে দুর্গন্ধে চলাচল করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।অনেক বাসিন্দাকে বাধ্য হয়ে ময়লা পানির মধ্য দিয়েই যাতায়াত করতে দেখা গেছে।তবে কয়েক ঘন্টার পর পানি নেমে গেলেও ভোগান্তি থেকে যায়।

নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। কারও কারও বিছানা পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে। এমনকি কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষেও পানি প্রবেশ করায় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, রংপুর সিটি করপোরেশন একাধিক সড়ক নির্মাণ করলেও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কোথাও অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও কোনো ড্রেনই নেই। অনেক স্থানে ড্রেন থাকলেও তা নিয়মিত পরিষ্কার বা সংস্কার করা হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা স্থায়ী হয়ে থাকছে।

মাস্টারপাড়ার দারুল ইসলাম হাফেজিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, “এই এলাকায় কোনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই মাদরাসায় পানি ঢুকে যায়।ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের থাকার কক্ষ পানিতে ডুবে যায়। বাধ্য হয়ে তাদের মসজিদের ভেতরে রাখতে হচ্ছে। এটি বহুদিনের সমস্যা, কিন্তু কোনো সমাধান নেই।”

৯০ বছর বয়সী বাসিন্দা সামাদ আলী বলেন, “এলাকায় বড় বড় ভবন হয়েছে, রাস্তা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা হয়নি। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়, ময়লা ভেসে বেড়ায়। আমাদের এই কষ্টের যেন কোনো শেষ নেই।”

চারতলা মোড় কলোনির বাসিন্দা মহসিন আলী বলেন, “দশকের পর দশক ধরে এখানে বসবাস করছি। প্রতি বর্ষায় একই সমস্যা। সিটি করপোরেশন শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো উন্নতি হয় না। আমাদের দুর্ভোগ কেউ দেখে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে,অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই রংপুর নগরীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। দ্রুত কার্যকর মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন না হলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নগরবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

এ অবস্থায় নগরবাসীর একটাই দাবি-টেকসই ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করা হোক।

এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বরত) রাকিব হাসান বলেন, “নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন কোনো সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান ছিল না। সে কারণেই এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি উন্নত কনসালটিং ফার্ম ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।”

তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়েছে এবং সাময়িক সমাধানের চেষ্টা চলছে।

রংপুরের আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান,গত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এরপর আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিএস./

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা:রংপুরে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সংকট

প্রকাশিত : ০৫:৪৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই প্লাবিত হয়েছে রংপুর নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চল।

শনিবার (২ মে) সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হলেও এই তুলনামূলক মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ, আর এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বাবুখা, মাস্টারপাড়া, আবহাওয়া অফিস এলাকা, চারতলা মোড় কলোনি, লালবাগ, পার্কের মোড়, মেডিকেল ক্যাম্পাস, নীলকণ্ঠ সোটাপীর ও শান্তিবাগসহ অন্তত ১০টি এলাকায় সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে আছে।কোথাও কোথাও ড্রেন উপচে ময়লা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে দুর্গন্ধে চলাচল করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।অনেক বাসিন্দাকে বাধ্য হয়ে ময়লা পানির মধ্য দিয়েই যাতায়াত করতে দেখা গেছে।তবে কয়েক ঘন্টার পর পানি নেমে গেলেও ভোগান্তি থেকে যায়।

নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। কারও কারও বিছানা পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে। এমনকি কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষেও পানি প্রবেশ করায় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, রংপুর সিটি করপোরেশন একাধিক সড়ক নির্মাণ করলেও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কোথাও অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও কোনো ড্রেনই নেই। অনেক স্থানে ড্রেন থাকলেও তা নিয়মিত পরিষ্কার বা সংস্কার করা হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা স্থায়ী হয়ে থাকছে।

মাস্টারপাড়ার দারুল ইসলাম হাফেজিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, “এই এলাকায় কোনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই মাদরাসায় পানি ঢুকে যায়।ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের থাকার কক্ষ পানিতে ডুবে যায়। বাধ্য হয়ে তাদের মসজিদের ভেতরে রাখতে হচ্ছে। এটি বহুদিনের সমস্যা, কিন্তু কোনো সমাধান নেই।”

৯০ বছর বয়সী বাসিন্দা সামাদ আলী বলেন, “এলাকায় বড় বড় ভবন হয়েছে, রাস্তা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা হয়নি। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়, ময়লা ভেসে বেড়ায়। আমাদের এই কষ্টের যেন কোনো শেষ নেই।”

চারতলা মোড় কলোনির বাসিন্দা মহসিন আলী বলেন, “দশকের পর দশক ধরে এখানে বসবাস করছি। প্রতি বর্ষায় একই সমস্যা। সিটি করপোরেশন শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো উন্নতি হয় না। আমাদের দুর্ভোগ কেউ দেখে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে,অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই রংপুর নগরীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। দ্রুত কার্যকর মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন না হলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নগরবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

এ অবস্থায় নগরবাসীর একটাই দাবি-টেকসই ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করা হোক।

এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বরত) রাকিব হাসান বলেন, “নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন কোনো সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান ছিল না। সে কারণেই এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি উন্নত কনসালটিং ফার্ম ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।”

তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়েছে এবং সাময়িক সমাধানের চেষ্টা চলছে।

রংপুরের আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান,গত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এরপর আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিএস./