চেনা সেই মুখরিত বিকেলগুলো হুট করেই হারিয়ে গিয়েছিল এক অজানা স্তব্ধতায়। যে প্রবীণ গুণী মানুষটি বিনামূল্যে শহরের তরুণদের বুকে গানের বীজ বুনে দিতেন, যার হাত ধরে কোনো এক পথিকও হয়ে উঠতেন সঙ্গীতশিল্পী সেই প্রলয় চাকী আজ না-ফেরার দেশে। তবে মৃত্যু কি আর সব স্বপ্নের অবসান ঘটাতে পারে? বাবার রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ অনুভূতির মশালটি এবার বুক আগলে তুলে নিয়েছেন সন্তান সানি চাকী।
প্রলয় চাকীর সেই চেনা সুরের আঙিনা আবার ফিরে এসেছে, নতুন ঠিকানায়, নতুন সাজে।পাবনার সঙ্গীতানুরাগীদের কাছে ‘সপ্তসুর’ কেবল একটি সংগঠনের নাম নয়, নতুন প্রজন্মেরর শিল্পী গড়ে তোলার এক নিভৃত আশ্রম। প্রয়াত দেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী প্রলয় চাকীর হাত ধরে ২০১২ সালে যে সুরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পেছনে ছিল এক মহৎ উদ্দেশ্য। প্রথাগত গান শেখানোর পাশাপাশি পরিবেশনের সূক্ষ্ম কৌশলগুলো তিনি শেখাতেন পরম মমতায় মাইক্রোফোন ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি, গাওয়ার মাঝে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, স্কেল ও কর্ডের প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জন্য ছিলেন আলাদা প্রশিক্ষকও। আর এই সমস্ত আয়োজনই চলত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
গানের মানুষ প্রলয় চাকী খাঁটি প্রতিভার খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন শহরের আনাচে-কানাচে। অটোরিকশা চালাতে চালাতে আনমনে কেউ গান গাইছেন এমন সুর কানে এলেও তিনি থমকে দাঁড়াতেন; পরম আদরে তাকে ডেকে আনতেন ‘সপ্তসুর’-এর আঙিনায়। শুধু গান শেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি প্রলয় চাকী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নতুনদের আত্মপ্রকাশের জন্য একটি উপযুক্ত মঞ্চ প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই পুত্র সানি চাকীর সঙ্গে পরামর্শ করে পাবনায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও ‘স্টুডিও কৃত্তিম’। সেখান থেকে সপ্তসুরের তরুণ শিল্পীদের গান ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। দেশ-বিদেশের অগণিত শ্রোতার মন জয় করার পাশাপাশি দেশের অনেক কিংবদন্তি ও গুণী শিল্পীর প্রশংসাও কুড়ায় তাদের এই প্রয়াস।
তবে ২০২৪ সালে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বন্ধ হয়ে যায় সপ্তসুরের নিয়মিত কার্যক্রম। চেনা সেই গান আর আড্ডার বিকেলগুলো আবার ফিরে আসবে এমন স্বপ্ন বুক বেঁধে রেখেছিলেন প্রলয় চাকী। কিন্তু সেই পুনর্জাগরণ আর দেখে যাওয়া হয়নি তাঁর; ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। বাবার সেই অসম্পূর্ণ অনুভূতির প্রদীপটি নিভে যেতে দেননি সন্তান সানি চাকী। বাবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নতুন করে সাজিয়েছেন সপ্তসুরকে।
পুনর্জাগরণের বিষয়ে সানি চাকী বলেন, “বাবার মূল ভাবনাকেন্দ্রিক জায়গাটি অক্ষুণ্ণ রেখেই সপ্তসুরের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। নিয়মিত রেওয়াজ ও আগের প্রশিক্ষণগুলোর পাশাপাশি এবার শিশু-কিশোরদের জন্য গিটার ও ছবি আকা শেখার বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে। এছাড়া সেটেও আনা হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া রাতের শহর ও ছাদের আবহ তৈরি করে সেট ডিজাইন করা হয়েছে। লাইটিং ও ক্যামেরার কাজ শেষ হলেই শিল্পীদের রেওয়াজ ও লাইভ পরিবেশনা সরাসরি অনলাইনে দেখতে পাবেন দর্শক-শ্রোতারা।”
প্রলয় চাকীর সুরের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে সানি চাকী ও সপ্তসুরের তরুণ শিল্পীরা এখন নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণ ফিরিয়ে আনা এই পথচলায় তাঁরা সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা চেয়েছেন।
ডিএস./











