০৬:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
সাতকানিয়ায় ইউএনওকে ঘিরে অপপ্রচার, নেপথ্যে কি সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ?

বন্যার ত্রাণ, মাটি-বালু ও মাদকবিরোধী অভিযান, প্রকল্প-বরাদ্দ ও তদবির না শোনায় ক্ষুব্ধ মহল — সাবেক প্রশাসনের নানা অভিযোগ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের দায়িত্বকাল ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ও প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব প্রচারণার নেপথ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ কিংবা স্বার্থান্বেষী কোনো মহলের অসন্তোষ কাজ করছে কি না—এমন প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও সাবেক উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমালোচনা, বিরোধিতা কিংবা ভুল বোঝাবুঝি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিয়মনীতি ও সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে কোনো ব্যক্তি বা মহলের আবদার কিংবা সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নানা ধরনের প্রচারণা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে নানা ধরনের আবদার ও সুপারিশ এসেছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তিনি তা গ্রহণ করেননি। বিশেষ করে বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণ, উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টিউবওয়েল বরাদ্দসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা মহলভিত্তিক সুপারিশের পরিবর্তে প্রশাসনিক নিয়ম ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় একটি সুবিধাভোগী মহলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় বলে সূত্রগুলোর দাবি।

সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন পক্ষের চাপ ও সুপারিশের কথা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যার্তদের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিতরণের অবস্থান নেয় উপজেলা প্রশাসন। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ত্রাণ সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব প্রশাসন গ্রহণ করেনি বলেও সূত্রটির দাবি। ফলে ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়া একটি পক্ষ প্রশাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্যার সময় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজের পরিচয় ব্যবহার করে ত্রাণ নেওয়ার বিষয়েও একটি ঘটনা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একটা সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে একজন ব্যক্তি দুই ধাপে মোট ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও চাল নিয়ে যান। পরবর্তীতে আরও ত্রাণের চাহিদা জানানো হলে উপজেলা প্রশাসন তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে ত্রাণ বিতরণের রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন নিয়েও প্রশাসনের সঙ্গে একটি মহলের মতবিরোধের কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনের আপত্তির কারণে ওই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়েও কমিটি গঠনের নথি, প্রস্তাবিত তালিকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে টিউবওয়েল, উন্নয়ন প্রকল্পসহ সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যক্তি ও মহলভিত্তিক সুপারিশ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এসব আবদারের সবগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় একটি মহলের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউএনওকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু হয়।

সাবেক উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, সাতকানিয়ায় অবৈধ মাটি-বালুর ব্যবসা ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের তদবির উপেক্ষা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বলে তাঁদের দাবি।

সাবেক উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত তদবিরকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ইউএনওর বিরুদ্ধে একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়। তাঁদের দাবি, সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

সাবেক প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু সাংবাদিক রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি কিংবা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব গুজব ও অপপ্রচারে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের দাবি, অনুসন্ধানে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো সুস্পষ্ট ভিত্তি বা সত্যতা নেই। এমনকি কিছু সাংবাদিক সামান্য অর্থের বিনিময়ে, কখনো ২০০ বা ৫০০ টাকা নিয়ে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন।

তবে অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকদের অপপ্রচারে যুক্ত হওয়ার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, লেনদেনের তথ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য ছাড়া এ ধরনের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। ফলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে খোন্দকার মাহমুদুল হাসান একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একটি সময়ে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, যখন উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কার্যকর উপস্থিতি ছিল না। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির সময়ে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চাপ তৈরি হয়েছিল।

বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমেও তাঁকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রাণ সমন্বয়, সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব পালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রমে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

এদিকে বিদায়ের মুহূর্তে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের একটি বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছিলেন, “আমি যদি সাতকানিয়ায় না আসতাম, অনেক কিছুই আমার অজানা থেকে যেত। এমনকি একটি গোষ্ঠীর চেহারা সম্পর্কেও অজানা থেকে যেতাম।” তাঁর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে কোনো ব্যক্তি বা মহলের সঙ্গে মতবিরোধ কিংবা সিদ্ধান্তগত দূরত্ব তৈরি হওয়াকে সরাসরি ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন বলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তীতে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছেন এবং ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন এমন দাবিও সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে সাতকানিয়ার একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধারাবাহিক প্রচারণা চলছে, তা কি সত্যিই তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা, নাকি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে তৈরি হওয়া একটি পরিকল্পিত প্রচারণা?

অবশ্যই প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেটিও নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রচারণা চালানো হলেও সেটি জনস্বার্থের বিষয়।

তাই প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন আবেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে ত্রাণ বিতরণের তালিকা ও রেজিস্টার, সরকারি বরাদ্দের নথি, উন্নয়ন প্রকল্পের কাগজপত্র, ক্রীড়া কমিটি গঠনের প্রস্তাব, প্রশাসনিক আদেশ, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মহলের বক্তব্য যাচাই করা। কারণ একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত, তেমনি তাঁকে ঘিরে অপপ্রচারের অভিযোগও হতে হবে তথ্য-প্রমাণনির্ভর।

সাতকানিয়ার ঘটনাপ্রবাহে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার বক্তব্য কতটা সত্য, কোন অভিযোগের পেছনে কী নথি রয়েছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। আবেগ, পক্ষপাত কিংবা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করাই হতে পারে এ ঘটনার সবচেয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাসুলভ অনুসন্ধান।

ডিএস./

ট্যাগ :

অপরাধীদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই : ড.খন্দকার মারুফ

সাতকানিয়ায় ইউএনওকে ঘিরে অপপ্রচার, নেপথ্যে কি সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ?

বন্যার ত্রাণ, মাটি-বালু ও মাদকবিরোধী অভিযান, প্রকল্প-বরাদ্দ ও তদবির না শোনায় ক্ষুব্ধ মহল — সাবেক প্রশাসনের নানা অভিযোগ

প্রকাশিত : ০৬:০১:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের দায়িত্বকাল ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ও প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব প্রচারণার নেপথ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ কিংবা স্বার্থান্বেষী কোনো মহলের অসন্তোষ কাজ করছে কি না—এমন প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও সাবেক উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমালোচনা, বিরোধিতা কিংবা ভুল বোঝাবুঝি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিয়মনীতি ও সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে কোনো ব্যক্তি বা মহলের আবদার কিংবা সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নানা ধরনের প্রচারণা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে নানা ধরনের আবদার ও সুপারিশ এসেছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তিনি তা গ্রহণ করেননি। বিশেষ করে বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণ, উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টিউবওয়েল বরাদ্দসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা মহলভিত্তিক সুপারিশের পরিবর্তে প্রশাসনিক নিয়ম ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় একটি সুবিধাভোগী মহলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় বলে সূত্রগুলোর দাবি।

সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন পক্ষের চাপ ও সুপারিশের কথা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যার্তদের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিতরণের অবস্থান নেয় উপজেলা প্রশাসন। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ত্রাণ সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব প্রশাসন গ্রহণ করেনি বলেও সূত্রটির দাবি। ফলে ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়া একটি পক্ষ প্রশাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্যার সময় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজের পরিচয় ব্যবহার করে ত্রাণ নেওয়ার বিষয়েও একটি ঘটনা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একটা সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে একজন ব্যক্তি দুই ধাপে মোট ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও চাল নিয়ে যান। পরবর্তীতে আরও ত্রাণের চাহিদা জানানো হলে উপজেলা প্রশাসন তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে ত্রাণ বিতরণের রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন নিয়েও প্রশাসনের সঙ্গে একটি মহলের মতবিরোধের কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনের আপত্তির কারণে ওই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়েও কমিটি গঠনের নথি, প্রস্তাবিত তালিকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে টিউবওয়েল, উন্নয়ন প্রকল্পসহ সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যক্তি ও মহলভিত্তিক সুপারিশ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এসব আবদারের সবগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় একটি মহলের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউএনওকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু হয়।

সাবেক উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, সাতকানিয়ায় অবৈধ মাটি-বালুর ব্যবসা ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের তদবির উপেক্ষা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বলে তাঁদের দাবি।

সাবেক উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত তদবিরকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ইউএনওর বিরুদ্ধে একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়। তাঁদের দাবি, সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

সাবেক প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু সাংবাদিক রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি কিংবা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব গুজব ও অপপ্রচারে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের দাবি, অনুসন্ধানে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো সুস্পষ্ট ভিত্তি বা সত্যতা নেই। এমনকি কিছু সাংবাদিক সামান্য অর্থের বিনিময়ে, কখনো ২০০ বা ৫০০ টাকা নিয়ে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন।

তবে অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকদের অপপ্রচারে যুক্ত হওয়ার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, লেনদেনের তথ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য ছাড়া এ ধরনের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। ফলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে খোন্দকার মাহমুদুল হাসান একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একটি সময়ে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, যখন উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কার্যকর উপস্থিতি ছিল না। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির সময়ে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চাপ তৈরি হয়েছিল।

বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমেও তাঁকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রাণ সমন্বয়, সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব পালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রমে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

এদিকে বিদায়ের মুহূর্তে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের একটি বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছিলেন, “আমি যদি সাতকানিয়ায় না আসতাম, অনেক কিছুই আমার অজানা থেকে যেত। এমনকি একটি গোষ্ঠীর চেহারা সম্পর্কেও অজানা থেকে যেতাম।” তাঁর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে কোনো ব্যক্তি বা মহলের সঙ্গে মতবিরোধ কিংবা সিদ্ধান্তগত দূরত্ব তৈরি হওয়াকে সরাসরি ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন বলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তীতে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছেন এবং ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন এমন দাবিও সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে সাতকানিয়ার একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধারাবাহিক প্রচারণা চলছে, তা কি সত্যিই তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা, নাকি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে তৈরি হওয়া একটি পরিকল্পিত প্রচারণা?

অবশ্যই প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেটিও নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রচারণা চালানো হলেও সেটি জনস্বার্থের বিষয়।

তাই প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন আবেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে ত্রাণ বিতরণের তালিকা ও রেজিস্টার, সরকারি বরাদ্দের নথি, উন্নয়ন প্রকল্পের কাগজপত্র, ক্রীড়া কমিটি গঠনের প্রস্তাব, প্রশাসনিক আদেশ, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মহলের বক্তব্য যাচাই করা। কারণ একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত, তেমনি তাঁকে ঘিরে অপপ্রচারের অভিযোগও হতে হবে তথ্য-প্রমাণনির্ভর।

সাতকানিয়ার ঘটনাপ্রবাহে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার বক্তব্য কতটা সত্য, কোন অভিযোগের পেছনে কী নথি রয়েছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। আবেগ, পক্ষপাত কিংবা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করাই হতে পারে এ ঘটনার সবচেয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাসুলভ অনুসন্ধান।

ডিএস./