০২:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

নিরাপদ খাদ্যের খোঁজে মাটির কাছে ফেরা: পাবনায় ৮ প্রাকৃতিক কৃষক পেলেন ব্যতিক্রমী সম্মাননা

​“আমি আমার মাকে ঠিক যতটুকু ভালোবাসি, মাটিকেও ততটুকু ভালোবাসি। ফসল আবাদের নামে মাটির ক্ষতি হয় এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করি না।” কথাগুলো টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষক সানোয়ার হোসেনের। অতি রাসায়নিক ও কীটনাশকের যুগে দাঁড়িয়েও যিনি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ফসল ফলিয়ে আজ দেশজুড়ে নজর কেড়েছেন।
​মাটিকে ভালোবেসে যাওয়া এই মানুষটির মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আটজন প্রগতিশীল কৃষক ও প্রতিষ্ঠানকে এবার দেওয়া হয়েছে ‘প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে পাবনার আমিনপুরের দয়ালনগর বাহারুন্নেচ্ছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী সম্মাননা প্রদান করা হয়।

​অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতেই এই আয়োজনের সূচনা হয়।

​আয়োজকরা জানান, সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য সংকটে দেশের মানুষের নানাবিধ রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিজের উৎপাদিত খাদ্য খেয়েও কৃষকরা ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মূল কারণ অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং সামগ্রিকভাবে অনিরাপদ কৃষি আবাদ।
​এই সংকট উত্তরণে প্রচলিত ‘অতি ফলন’ বা রাসায়নিকভিত্তিক কৃষির ধারণার বাইরে গিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে এগিয়ে আসে বিকে ফাউন্ডেশন। এবারের আয়োজনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কৃষক আবেদন করেন। সেখান থেকে দুটি ক্যাটাগরিতে মোট ৮ জন প্রাকৃতিক কৃষককে সম্মাননা দেওয়া হয়।

​অনুষ্ঠানে সেরা বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হিসেবে দুজনকে ১ লাখ টাকা করে এবং প্রথম রানার আপ হিসেবে দুজনকে ৭৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। এছাড়া দ্বিতীয় রানার আপ ৪ জনকে ৫০ হাজার টাকা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।​বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক সম্মাননা পেয়েছেন কোলে কাপড়া কৃষি খামার ও সানোয়ার হোসেন। ​প্রথম রানার আপ হয়েছেন সুলতানা খাতুন ও ‘চাষবাস’ প্রতিষ্ঠান​ দ্বিতীয় রানার আপ ‘প্রযন্ত’, ‘দেশি ফার্ম’, শাহাদুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আলী।

​সারাজীবন বেশি ফসল উৎপাদনের জন্য পুরস্কার পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও প্রাকৃতিক কৃষি চর্চার স্বীকৃতি পেয়ে উচ্ছ্বসিত কৃষকরা। রাজশাহীর পবা উপজেলার নারী কৃষক ও প্রথম রানার আপ সুলতানা খাতুন বলেন, “দেশি বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের তা বিনিময় করি। ধান, গম ও পাটসহ নিরাপদ সবজি আবাদ করি—যেখানে কোনো রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব সার ও প্রাকৃতিক বিতারক পদ্ধতি ব্যবহার করি। প্রাকৃতিক কৃষি আবাদের জন্য এমন সম্মাননা আগে কখনো দেখিনি, এটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে।”

​অনুষ্ঠানে কৃষি বিষয়ক স্বনামে খ্যাত ইনফ্লুয়েন্সার জুয়েল রানা বলেন, “আমরা নিরাপদ খাদ্যের অভাবে নানা রোগে ভুগে ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল বাড়াচ্ছি, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কোনো পদক্ষেপ নেই। উপকারী পোকা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগ সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।”

​পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম বলেন, “আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করা হচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করতে পারলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব না। এ নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবেও নিরাপদ কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

কৃষক সম্মাননা পুরস্কারের উদ্যোক্তা ​বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম.এ বাতেন খান বলেন, “আমাদের দেশের একসময়ের ৩৪ শতাংশ কৃষক ক্যান্সারে আক্রান্তের তথ্য থাকলেও সম্প্রতি তা বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত নাহলে এই সংকট ঘুচবে না। তাই সার ও কীটনাশকের অতি ব্যবহার পরিহার করে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদকে এগিয়ে নিতে আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

​অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রেল সচিব সেলিম রেজা, পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক সাইফুল আজম, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের কনসালটেন্ট ড. মাহবুব আলম, অধ্যাপক ডা. এসএম আব্দুর রাজ্জাক এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার প্রমুখ।

ডিএস./

ট্যাগ :

তাহসিফের সঙ্গে থাকা সেই তরুণী গ্রেফতার, ৭ দিনের রিমান্ড চাইবে পুলিশ

নিরাপদ খাদ্যের খোঁজে মাটির কাছে ফেরা: পাবনায় ৮ প্রাকৃতিক কৃষক পেলেন ব্যতিক্রমী সম্মাননা

প্রকাশিত : ০২:৩৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

​“আমি আমার মাকে ঠিক যতটুকু ভালোবাসি, মাটিকেও ততটুকু ভালোবাসি। ফসল আবাদের নামে মাটির ক্ষতি হয় এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করি না।” কথাগুলো টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষক সানোয়ার হোসেনের। অতি রাসায়নিক ও কীটনাশকের যুগে দাঁড়িয়েও যিনি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ফসল ফলিয়ে আজ দেশজুড়ে নজর কেড়েছেন।
​মাটিকে ভালোবেসে যাওয়া এই মানুষটির মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আটজন প্রগতিশীল কৃষক ও প্রতিষ্ঠানকে এবার দেওয়া হয়েছে ‘প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে পাবনার আমিনপুরের দয়ালনগর বাহারুন্নেচ্ছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী সম্মাননা প্রদান করা হয়।

​অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতেই এই আয়োজনের সূচনা হয়।

​আয়োজকরা জানান, সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য সংকটে দেশের মানুষের নানাবিধ রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিজের উৎপাদিত খাদ্য খেয়েও কৃষকরা ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মূল কারণ অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং সামগ্রিকভাবে অনিরাপদ কৃষি আবাদ।
​এই সংকট উত্তরণে প্রচলিত ‘অতি ফলন’ বা রাসায়নিকভিত্তিক কৃষির ধারণার বাইরে গিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে এগিয়ে আসে বিকে ফাউন্ডেশন। এবারের আয়োজনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কৃষক আবেদন করেন। সেখান থেকে দুটি ক্যাটাগরিতে মোট ৮ জন প্রাকৃতিক কৃষককে সম্মাননা দেওয়া হয়।

​অনুষ্ঠানে সেরা বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হিসেবে দুজনকে ১ লাখ টাকা করে এবং প্রথম রানার আপ হিসেবে দুজনকে ৭৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। এছাড়া দ্বিতীয় রানার আপ ৪ জনকে ৫০ হাজার টাকা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।​বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক সম্মাননা পেয়েছেন কোলে কাপড়া কৃষি খামার ও সানোয়ার হোসেন। ​প্রথম রানার আপ হয়েছেন সুলতানা খাতুন ও ‘চাষবাস’ প্রতিষ্ঠান​ দ্বিতীয় রানার আপ ‘প্রযন্ত’, ‘দেশি ফার্ম’, শাহাদুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আলী।

​সারাজীবন বেশি ফসল উৎপাদনের জন্য পুরস্কার পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও প্রাকৃতিক কৃষি চর্চার স্বীকৃতি পেয়ে উচ্ছ্বসিত কৃষকরা। রাজশাহীর পবা উপজেলার নারী কৃষক ও প্রথম রানার আপ সুলতানা খাতুন বলেন, “দেশি বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের তা বিনিময় করি। ধান, গম ও পাটসহ নিরাপদ সবজি আবাদ করি—যেখানে কোনো রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব সার ও প্রাকৃতিক বিতারক পদ্ধতি ব্যবহার করি। প্রাকৃতিক কৃষি আবাদের জন্য এমন সম্মাননা আগে কখনো দেখিনি, এটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে।”

​অনুষ্ঠানে কৃষি বিষয়ক স্বনামে খ্যাত ইনফ্লুয়েন্সার জুয়েল রানা বলেন, “আমরা নিরাপদ খাদ্যের অভাবে নানা রোগে ভুগে ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল বাড়াচ্ছি, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কোনো পদক্ষেপ নেই। উপকারী পোকা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগ সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।”

​পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম বলেন, “আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করা হচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করতে পারলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব না। এ নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবেও নিরাপদ কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

কৃষক সম্মাননা পুরস্কারের উদ্যোক্তা ​বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম.এ বাতেন খান বলেন, “আমাদের দেশের একসময়ের ৩৪ শতাংশ কৃষক ক্যান্সারে আক্রান্তের তথ্য থাকলেও সম্প্রতি তা বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত নাহলে এই সংকট ঘুচবে না। তাই সার ও কীটনাশকের অতি ব্যবহার পরিহার করে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদকে এগিয়ে নিতে আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

​অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রেল সচিব সেলিম রেজা, পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক সাইফুল আজম, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের কনসালটেন্ট ড. মাহবুব আলম, অধ্যাপক ডা. এসএম আব্দুর রাজ্জাক এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার প্রমুখ।

ডিএস./