০৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে উত্তাল গাজীপুর: পুলিশ বক্স ও কারখানায় আগুন, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই টানা অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আন্দোলন চলাকালে উত্তেজিত শ্রমিক ও দুর্বৃত্তরা কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া ছাড়াও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পুলিশের গাড়ি ও ‘ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড’ কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী সহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৫ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকাল ৮টার পর থেকেই কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, তেলিচালা এবং মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় শত শত শ্রমিক লাঠিসোঁটা হাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা মহাসড়কে পুরোপুরি অবস্থান নিয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

রতনপুর এলাকার করণী নিট কম্পোজিট ও নিট এশিয়াসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কাজ যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। আবার কিছু কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করে হাজিরা নিশ্চিত করার পরই বাইরে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভে যোগ দেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকার অন্তত ১৮টি পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

দীর্ঘ সময় মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় সড়ক প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। এসময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের অনেককে মহাসড়কের ওপর ফুটবল ও ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠতেও দেখা যায়।

সকাল ১০টার দিকে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী এলাকায় উত্তেজিত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ঘটে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে শ্রমিকেরা কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে গ্লাস ভেঙে দেয় এবং পরবর্তীতে বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম জানান, পুলিশ বক্সটি মূলত দায়িত্বরত সদস্যরা বিশ্রামের কাজে ব্যবহার করতেন। বক্সে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা বড় ধরনের মালামাল না থাকলেও ভেতরের আসবাবপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

এদিকে দুপুর ১২টার দিকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ‘ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড’ পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে এবং কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনের তীব্র ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলেও মহাসড়কে তীব্র বাধার মুখে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে দেওয়ায় তারা প্রথমে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে বিজিবির বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মহাসড়কের উল্টো পথে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয় বলে নিশ্চিত করেছেন কালিয়াকৈর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা তারেকুল ইসলাম।

শিল্পাঞ্চলের সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাসসহ সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এসব এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী থানার ওসি ইফতেখার হোসেন এবং কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ন্যূনতম মাসিক মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেও সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকেরা। এর আগে শনিবারও একই দাবিতে দিনভর মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন তারা।

ডিএস./

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

সুইহারী আশ্রম এর দূর্গাপূজা পুর্নমিলনীতে এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে উত্তাল গাজীপুর: পুলিশ বক্স ও কারখানায় আগুন, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

প্রকাশিত : ০৪:১২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই টানা অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আন্দোলন চলাকালে উত্তেজিত শ্রমিক ও দুর্বৃত্তরা কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া ছাড়াও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পুলিশের গাড়ি ও ‘ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড’ কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী সহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৫ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকাল ৮টার পর থেকেই কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, তেলিচালা এবং মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় শত শত শ্রমিক লাঠিসোঁটা হাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা মহাসড়কে পুরোপুরি অবস্থান নিয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

রতনপুর এলাকার করণী নিট কম্পোজিট ও নিট এশিয়াসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কাজ যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। আবার কিছু কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করে হাজিরা নিশ্চিত করার পরই বাইরে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভে যোগ দেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকার অন্তত ১৮টি পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

দীর্ঘ সময় মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় সড়ক প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। এসময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের অনেককে মহাসড়কের ওপর ফুটবল ও ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠতেও দেখা যায়।

সকাল ১০টার দিকে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী এলাকায় উত্তেজিত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ঘটে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে শ্রমিকেরা কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে গ্লাস ভেঙে দেয় এবং পরবর্তীতে বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম জানান, পুলিশ বক্সটি মূলত দায়িত্বরত সদস্যরা বিশ্রামের কাজে ব্যবহার করতেন। বক্সে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা বড় ধরনের মালামাল না থাকলেও ভেতরের আসবাবপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

এদিকে দুপুর ১২টার দিকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ‘ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড’ পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে এবং কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনের তীব্র ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলেও মহাসড়কে তীব্র বাধার মুখে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে দেওয়ায় তারা প্রথমে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে বিজিবির বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মহাসড়কের উল্টো পথে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয় বলে নিশ্চিত করেছেন কালিয়াকৈর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা তারেকুল ইসলাম।

শিল্পাঞ্চলের সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাসসহ সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এসব এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী থানার ওসি ইফতেখার হোসেন এবং কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ন্যূনতম মাসিক মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেও সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকেরা। এর আগে শনিবারও একই দাবিতে দিনভর মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন তারা।

ডিএস./