আমাদের দেশের নারীরা সচেতনতার অভাব, সঙ্কোচ এবং লজ্জায় শরীরে রোগ পুষতে থাকেন, শেষমেষ যখন তারা চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে আসেন তখন আর করার কিছু থাকে না। এমনটাই জানিয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান (গাইনোকোলোজি) ডা. ফাতেমা আশরাফ।
আগামীনিউজ ডটকমকে তিনি বলেন, জরায়ু বা ইউটেরাস নামক অঙ্গটি খুবই স্পর্শকাতর। এই জরায়ুর নিচের দিকে সরু অংশটিকে বলা হয় জরায়ুমুখ, ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় সারভিক্স। এই সারভিক্সের ক্যান্সারকে বলা হয় সারভাইক্যাল বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার। জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)।
যা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে মেলামেশা বয়ে আনতে পারে নারীর জন্য এই ভয়াবহ বিপদ। বিপথগামী স্বামী কিংবা পুরুষ সঙ্গীর কারণে একজন নারীর শরীর আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া হয় এইচপিভি ভাইরাসের কারণে শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও সংক্রামন হতে পারে।
ডা. ফাতেমা আশরাফ আরো বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত নারী কিছু লক্ষণে খুব সহজেই বুঝতে পারেন। মাসিকের রাস্তায় অতিরিক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব যাওয়া। মাসিকের রাস্তায় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। এটি কয়েক রকম হতে পারে। যেমন: প্রতিমাসে মহিলাদের মাসিকের সময়কাল যদি হঠাৎ করে বেড়ে যায় যে পরিমাণ রক্ত সাধারণত যায়, এর থেকে যদি বেশি পরিমাণ রক্ত যাওয়া শুরু হয়। মাসের মাঝখানে যদি আবার এ রকম রক্তক্ষরণ হয়। মেনোপোজ অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়মে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর, যদি হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পর যদি রক্তক্ষরণ হয় বা ব্যথা হয়— এগুলো হলে নারী খুব সহজেই বুঝতে পারবেন তার জরায়ুমুখে ক্যান্সার হয়েছে। তবে রোগটি যখন একটু অগ্রসর হয়ে যায়, যখন আশপাশের অঙ্গ-প্রতঙ্গ আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে আরো কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন তলপেটে ব্যথা হতে পারে। প্রস্রাবের রাস্তার সঙ্গে পায়খানার রাস্তার সঙ্গে এটি যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
উপরে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়া মাত্রই যদি একজন রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় এবং তার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।
এ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সারের বেলায় একটি বিশেষ আশাবাদের জায়গা আছে। সেটা হলো ক্যান্সার স্ক্রিনিং। স্ক্রিনিংয়ের দুটো প্রধান পরীক্ষা রয়েছে। প্যাপটেস্ট, যাকে গ্ল্যান্ডস্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরা হয়। আরেকটি হলো ভায়া টেস্ট (ভিআইএ)। এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা যায়। এই পরীক্ষা দুটি নিয়ে কোনো আতঙ্ক বা ভয়-ভীতির কিছু নেই। এটা কাটা ছেড়া বা কষ্টদায়ক পরীক্ষা নয়। একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ যেভাবে একজন মহিলা রোগীকে পরীক্ষা করেন, অনেকটা সেইরকম।
আলাপকালে ডা. ফাতেমা আশরাফ এই প্রতিবেদককে জানান, ক্যান্সার চূড়ান্ত পর্যায়ে দরকার অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি নাকি রেডিওথেরাপি সেটা আমরা বসে ঠিক করি। রোগীর একাধিক পদ্ধতিরও প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত চারটি পর্যায়ে ডাক্তাররা রোগের অবস্থাকে ভাগ করে – ১, ২, ৩ ও ৪। এর মধ্যে আবার এ ও বি করে ভাগ করা হয়। যখন স্টেজ বা পর্যায় ২-এ পর্যন্ত থাকে তখন প্রধান চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার করে জরায়ু ফেলে দেওয়া। পরে যদি অন্যান্য চিকিৎসা লাগে সেগুলো করা হয়। এই চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। আর যদি আরো দেরি হয়ে যায় বা ওই পর্যায়টি পার হয়ে যায়, তখন হয়তো সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করা যায় না। তখন দরকার রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি। তবে এই রোগে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে এসব বিষয়ে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন নারী ক্যান্সার রোগীর একজন জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছেন। ক্যান্সার আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর স্থান বাংলাদেশে দ্বিতীয় (প্রায় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ)।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার’ এর তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮৪৭ নারী এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৬৫ নারী। বাংলাদেশে মহিলা ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বাংলাদেশে প্রতিবছর জরায়ুমুখের ক্যান্সারে প্রায় ৮ হাজার ৬৮ নারী আক্রান্ত হন, যা নারী ক্যান্সার রোগীর প্রায় ১২ শতাংশ। প্রতি বছর মারা যান প্রায় ৫ হাজার ২১৪ নারী।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ


























