♦ বাগেরহাটে আতঙ্কিত মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে
♦ ৯৭৭ আশ্রয়কেন্দ্র
♦ ‘বাফেলো ওয়াল’ তুলে খাদ্যগুদামের সুরক্ষা
সুপার সাইক্লোন ‘আমফান’এর প্রভাবে সুন্দরবন সন্নিহিত উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে প্রলঙ্করি সিডরের মত আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্কিত লোকজন মহাবিপদ সংকেত জানার পর ঘুর্ণীঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছেন। সাথে প্রয়োজনীয় মালামাল ও গবাদীপশু নিচ্ছেন।
সারারাত থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও বুধবার বিকেল থেকে বাতাসের তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। এখানে সকল নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ ভেড়িবাঁধ নিয়ে তারা খুবই উদ্বিগ্ন। বলেশ্বর পানগুছি, পশুর-সহ সুন্দরবন সংলগ্ন সমূদ্রে ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চু ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

সুন্দরবন সন্নিহিত জেলার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শরণখোলা, মোংলা ও মোড়েলগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ ভর আমাবশ্যার সময় ‘আমফানে’ বিধ্বংসি ঝড় ও জলোচ্ছাসের শঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এসব এলাকায় কাঁচাঘর বাড়ি, ফসল, গাছ-পালা ও বিদ্যুরে খুটি উপড়ে এবং জলোচ্ছাসে মারত্মক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। তবে পুলিশ, কোষ্টগার্ড, নৌবাহিনী, সেচ্ছাসেবক, রেডক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস-সহ বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মাুষের সহযোগীতায় জেলা প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগে ‘আমফান’ মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহন করেছ। মোংলা বন্দরের সকল জাহাজ নিরাপদে নেওয়া হয়েছে। মালামাল ওঠা-নামা বন্ধ রয়েছে।জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয়দের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অব্যাহত মাইকিং চলছে।
জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, চারটি উপকূলীয় উপজেলা মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রামপাল ও মোংলা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ অধিকাংশ লোকজনকে ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। সকলকে করোনার সংক্রমন প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে। ১২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক, ৮৪টি মেডিকেল টিম, ৭টি ফায়ার সার্ভিস টিম কাজ করছে। ৯৭৭ টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৭৭ জন মানুষ ও প্রায় ৮৫ হাজার গবাদি পশু আশ্রয় নিতে পারবে। কেন্দ্রে গুলোতে আশ্রয় নেয়া জনসাধারনের মাঝে মাক্স, গ্লোভস ও হ্যান্ডস্যানিটাইজার বিতারন করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় ১৩ মে.টন চাল নগত ৩ লাখ টাকা, শিশু খাদ্যের জন্য ২ লাখ. গো খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ১০টি কন্টোল রুম খোলা হয়েছে। নৌ-বাহিনী, কোষ্টগার্ড, পুলিশ, রেডক্রিসেন্ট, সিপিসি অনুরূপ তৎপর রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, সুপার সাইক্লোন আম্ফানের প্রভাবে সমূদ্র প্রচন্ড উত্তাল হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন ও সংলগ্ন সমুদ্রে থাকা প্রায় সকল জেলে বাওয়ালীদের ইতোমধ্যে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সুন্দরবনের ১০টি ষ্টেশন ও টহল ফাঁড়ির সকলকে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে কঠোর নজরদারী বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
পরিবেশবিদ ও উন্নয়ন কর্মী মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল জলিল বলেন, এবারও অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের ‘আমফান’ বুকে নিয়ে অতিতের মত সুন্দরবন লোকালয়ের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে পারে। তবে জলোচ্ছাসে ব্যাপক অঞ্চল নোনা পানিতে ডুবে যেতে পারে। কিন্তু সুন্দরবনের মারত্মক ক্ষতি হতে পারে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোতোষ কুমার মজুমদার বলেন, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা এলাকায় সকল খদ্যগুদাম রক্ষায় ‘বাফেলো ওয়াল’ তৈরী করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এখন মজুদকৃত খাদ্য শস্য নষ্ট হবার কোন আশঙ্কা নেই।
বাগেরহাট ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার কর্মকার ও পল্লীবিদ্যুতের জিএম জাকির হোসেন বলেন, ছুটি বাতিল করে সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে সার্বক্ষনিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ‘আমফানের’ আঘাতে কোথাও কোন প্রকার বিদ্যুত বিপর্যয় হলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক রঘুনাথ কর বলেন, ‘আমপান’-এর মধ্যেও বুধবার সকালে ফকিরহাট, মোল্লাহাট-সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ধান কাটা হয়েছে। তার ভাষায়, প্রায় সব ধান কাটা হয়েে গেছে। অতি সামান্য ধান মাঠে রয়েছে, যার অধিকাংশ কাঁচা।”
এদিকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান জানান, ‘আমফান’ মোকাবেলার মোংলা বন্দরের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে। বন্দরের মালামাল ওঠানামার কাজ বন্ধ রেখে সকল জাহাজ গুলোকে নিরাপদে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্দর জেটিতে নৌ বাহিনী ও কোস্ট গার্ডের আটটি যুদ্ধ জাহাজ অবস্থান নিয়েছে। বন্দরে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।’’
বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মাসুদ সরদার বলেন, বুলবুলের প্রভাব মানুষকে জানিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য আমাদের ৬টি টিম বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করছে। এছাড়া জেলার ৫টি স্টেশনে ৮টি টিম প্রস্তুত রয়েছে। পার্শ্ববর্তী জেলাতেও কথা বলা আছে, প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছু ইউনিট বাগেরহাটের জন্য আনা হবে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় জানান, পুলিশের পক্ষ থেকেও উপকূলবাসীকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনতে সহায়তা করা হচ্ছে। বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা সেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে কাজ করছেন।
উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন, এমপি শেখ সারহান সাসের তন্ময় ও এমপি এ্যাড: আমিরুল আলম মিলন বলেন, উপকূলীয় বাগেরহাটে ঘুর্ণিঝড় ‘আমফান’ মোকাবেলায় সকল প্রকার প্রস্তুতি সার্বক্ষণিক মনিটরিয় করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তায় পর্যাপ্ত ত্রান মজুদ রয়েছে। যে কোন বিপর্যয় ও উদ্ধার তৎপরতা তাৎক্ষনিক চালানো হবে। তাঁরা আতঙ্কিত না হয়ে সকলকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে অনুরোধ করেন।
বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক




















