গানের রাজ্যে তার চলাচল ছোটবেলা থেকে। বর্তমানে তিনি আপাদমস্তক একজন গৃহিনী। পরিবারের বড় হওয়ায় বেশ দায়িত্বের চাপ রয়েছে তার ঘাড়ে। স্বামী, সন্তান ছাড়াও বাবার বড় সন্তান হওয়ায় ভাই বোনদের প্রতিও দায়িত্ব কম নয়। অন্যদিকে ডাক্তার স্বামী থাকেন দেশের বাহিরে। তাই চাপটা একটু বেশি। বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া সহ যাবতীয় কাজের মধ্যেই সময় চলে যায়। তার মধ্যে ২বছর হলো বাবা মারা গেছেন। তবে এত কিছুর মধ্যেও থেমে নেই এই প্রতিভাবান। নিজের শখ, আর ইচ্ছাকে বলি দেননি কোনো কিছুর কাছে। সংসার আর গান দু’টি বিষয়ই একই সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন শক্ত হাতে। গানের জগতে তার ঝুলির ভার কম নয়। এরই মধ্যে ভক্ত জুগিয়েছেন বেশ। পেয়েছেন বাংলার সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ‘লোক গানের আসর’ স্বাধীনতা স্মারক ২০১৭ পুরষ্কার। বলছি জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী তাজরিন গহরের কথা।
সংসার জীবনে বলা চলে সফল একজন মানুষ। দায়িত্ববান এই শিল্পী স্বাধীনতা পদক জয়ী গীতিকবি নঈম গহরের বড় মেয়ে। তার ছোট বোন বিখ্যাত অভিনেত্রী ইলোরা গহর। একটা সময় বিটিভির শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন তাজরিন। তবে নব্বইয়ের দশকের আগে বিয়ে করেছেন তিনি। সে সময় দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় দেশে নিজের যোগ্যতার দুত্যি ছড়িয়েছেন একটু দেরিতে। অবশ্য সুযোগ-ই বা-কোথায় অত দায়িত্বের মাঝে। গান আর সংসার জীবনের নানা বিষয়ে কথা হয় এই প্রতিভাবানের সঙ্গে। জানিয়েছেন জীবনের নান গল্প। তার মধ্যে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো পাঠকের জন্য। অবশ্য আমাদের সমাজে যখন নারী উন্নয়ন নিয়ে রীতিমতো আন্দোলন করতে হয় তখন এমন কাউকে পাওয়া সত্যিই কঠিন। যিনি সংসারের মাঝেও ফুটিয়ে তুলছেন নিজের যোগ্যতা। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ৭টি গান নিয়ে একক এ্যালবাম ‘একুশ আসে’। চলছে আরো একটি এলবাম প্রকাশের কাজ।
সংসার আর এত দায়িত্বের মাঝে কিভাবে সময় বের করেন গানের জন্য এমন প্রশ্নের জবাবে এই শিল্পী বলেন, সংসারকে আগে প্রধান্য দেই। আমার পরিবারের সবাই হেল্প ফুল তাই সময় বের করতে পারি। তাও অনেক কিছু ম্যানেজ করে নিতে হয়। গান গাওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন বেশি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিখ্যাত হওয়ার জন্য গান করি না। আমি আমার নিজের জন্য গান করি। সুরটা যদি আমার নিজের ভালো না লাগে তখন সুরকারকে সেটি পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করি। সব গান আমার কণ্ঠে ভালো লাগবে না। তাই সেটি খেয়াল করি। তবে আমার পছন্দের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, মিতালি মোখার্জি তাদের মত করে গাইতে ভালো লাগে। গান ছাড়া আর কি ভালো লাগে জনতে চাইলে এই শিল্পী বলেন, সংসার করতে। আমি খুব উপভোগ করি। তাছাড়া পরিবারকে সময় দিতে হয় তাই ঘরোয়া গানের আসরে চর্চা করতে হয়। কোথাও গিয়ে ঘটা করে চর্চ্চা করার সুযোগ খুব একটা হয় না। সেজন্য আমার ভালো লাগার সব টুকু আমার সংসার ঘিরে। অন্যদিকে আমার স্বামী দেশের বাহিরে থাকেন। তাই বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেয়া করা লাগে। এজন্যও সময় পাই কম। দায়িত্বটা বেশি।
তাজরিন গহরের সংসারে ২ ছেলে আর এক মেয়ে রয়েছেন। বলেন, অনেক টিভি অনুষ্ঠানে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু যেতে পারি নাই। কারণ সংসারে সময় দিতে হতো বেশি। তবে এখন সেটি করতে পারব কারণ বাচ্চারা বড় হয়েছে। বিয়ে করেছেন কত সালে ? এমন প্রশ্নের জবাবে মজা করে বলেন অনেক আগে। গানের জগতে আসা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে ওঠাবসা।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় চার নেতার সামনে শিশু শিল্পী হিসেবে গান করেছি। আব্বা গীতিকবি ছিলেন। বাসায় অনেক বিখ্যাত মানুষজন আসতো। তখন থেকেই শুরু। ‘আব্বা বেঁচে থাকা অবস্থায় গানের অ্যালবাম প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিতেন। নানা কারণে সম্ভব হয়নি। এবার করেছি।’ জীবনে কোনো অপূর্ণতা আছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে খানিকটা ভেবে তিনি বলেন, হ্যা। আরো আগে শুরু করা উচিৎ ছিল। দেশের বাহিরে থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। আমি ছোট বেলা থেকেই গান করি।
বিটিভির বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ এ শিশু শিল্পী হিসেবে প্রথম তিন পর্বে আমি ছিলাম। বিয়ের পর মাঝের সময়টা বন্ধ ছিল। যদিও দেশের বাহিরে থেকে তিনটি গান করেছিলাম। সেগুলো চ্যানেল আইতে প্রচারিত হয়েছিল। এর আগে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। এই বন্ধ থাকার আপসোস আছে। গান করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় কখনো পড়তে হয়েছিল এমন প্রশ্নের স্বভাব সলুভ স্বাবলিল উত্তর দিলেন তিনি। বলেন, আমি একজন গৃহবধু। আয় বলতে কিছু নেই। স্বামী বা বাবার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে গান বের করি। তাই অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। স্পন্সর পাওয়াটাও অনেক কঠিন। তাই একটু হিসেব করে কাজ করতে হয়। আর নতুন একজন শিল্পী আমি তাই স্পন্সর পাওয়াটা খুবই কঠিন। সমস্যা বলতে স্পন্সর ম্যানেজ করা বা অনেক খরচের কারণ ধীরে চলতে হচ্ছে গানের পথে।
এই শিল্পীর প্রকাশিত গানগুলো হচ্ছে একুশ আসে, নিয়ে গেছো ছায়াপথে, ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে পাতায়, এ পথ সে পথ, বসন্তের হাওয়া, কাল রোববার (একক ও দ্বৈত)। এলবামটি ইউটিউবে তার নিজস্ব চ্যনেল তাজরিন গহরে পাওয়া যাবে।

























