০৪:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কঙ্কাল আছে কিনা নিশ্চিতে স্বজনরা ছুটছেন কবরস্থানে

ময়মনসিংহ শহরের একটি বাসা থেকে কঙ্কাল প্রাপ্তির খবর শোনার পর গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের লোকজন কবরস্থানের দিকে ছুটছেন। তারা কবর খুঁড়ে দেখছেন প্রিয়জনের লাশ আছে কিনা। অনেকেই জানিয়েছেন, কবরে তাদের প্রিয়জনদের লাশ নেই। গ্রামবাসীর কয়েকজন জানান, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে একবার শোনা গেল কবরে লাশ নেই।

এরপর তারা কবরস্থানে গিয়ে দেখেন মাত্র দুই-আড়াই ফুট ফাঁক করে অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক কবরের কঙ্কাল চুরি হয়ে গেছে। বিষয়টি থানায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। এরই মধ্যে শনিবার রাতে ময়মনসিংহের আরকে মিশন রোডের একটি বাসা থেকে ১২টি কঙ্কাল ও দুই বস্তা হাড় উদ্ধার হয়।

যেভাবে লাশ চুরির খবর ফাঁস : ২০১৮ সালের মার্চ মাসে চুরি হওয়া কঙ্কাল বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আকির হোসেন, রাসেল মিয়া আর হযরত আলী নামে তিনজনের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়। এই বিবাদের জেরেই চুরির ঘটনা ফাঁস হয়। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিবাদের বিষয়টি শুনতে পান ভাংনামারী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে নয়ন মিয়া।

এ চক্রের ৩ জনের বাড়িই তার এলাকায়। বিষয়টি তিনি তার ভাই ফয়সাল ইসলামকে ফোনে জানান। তার দাদা ওয়াহেদ আলী ও দাদি কদর বানুর কবরে কঙ্কাল আছে কিনা জানতে চান? পরিবারের লোকজন ছুটে গিয়ে দেখেন, দুটি কবরেই দুই-আড়াই ফুট করে গর্ত (ফাঁকা)। কবরে কঙ্কাল নেই! এরপর ছুটে আসেন আত্মীয়স্বজনরা।

লাশ চুরির ঘটনা শুনে ভাংনামারী ইউনিয়নের হাজী আবদুল মজিদের ছেলে আবুল হাসাদ বাচ্চু ছুটে যান মায়ের কবরে। কবরের মাথার অংশে দুই-আড়াই ফুট ফাঁকা দেখে চমকে ওঠেন। গ্রামবাসীকে নিয়ে মাটি সরিয়ে দেখেন ‘কঙ্কাল’ নেই। স্ত্রীর কঙ্কাল নেই এ কথা শুনেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন হাজী আবদুল মজিদ। বাচ্চু জানান, তার মা নূরজাহান বেগম প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। মা হারানোর শোক এখনও কাটাতে পারেননি। এখন দেখছেন কবরে মায়ের কঙ্কাল নেই।

কুলিয়ারচর গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর স্ত্রী হাসনা আক্তারের কবর খুঁড়ে কঙ্কাল পাওয়া যায়নি। তিনি মারা যান প্রায় ২ বছর আগে। ৩ বছর আগে মারা যান মোর্শেদ আলী। কবরে তার কঙ্কালও নেই। গজারিয়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাক জানান, কবরে তার ভাই আবু চান ও সালেহা খাতুনের কঙ্কাল নেই। কবরে জুবেদা খাতুন নামে একজনের কঙ্কালও নেই।

তার ছেলে আবদুল খালেক জানান, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরেও মায়ের কবর মেরামত করেছি। কবর ভেঙে গেছে দেখে মেরামত করেছি। কঙ্কাল নেই, সেটা আগে বুঝতে পারিনি। গ্রামের লোকজন কবর খোঁড়াখুঁড়ি শেষে নিশ্চিত করেন ২১টি কবরে কঙ্কাল নেই। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। লাশ চুরি করে তা বিক্রি করে ব্যবসা হয় এটা আগে জানা ছিল না। এটা ভয়ানক একটি বিষয়। এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

ভাংনামারী ইউনিয়নের আবুল হাসনাত বাচ্চু বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা থাকায় অভিযোগ দায়ের করি। পুলিশ অভিযোগ নিয়েও চিহ্নিত চোরদের গ্রেফতারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দীর্ঘদিন পরও স্বজনদের কঙ্কাল সন্ধান পাইনি। মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর উপজেলার সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, চুরির বিষয়টি পুলিশ জানানোর পরও ব্যবস্থা না নেয়া দুঃখজনক।

মানবাধিকারকর্মী ফয়সাল ইসলাম জানান, করব থেকে কঙ্কাল চুরির ঘটনায় আমরা বিস্মিত। ধারণা করা হচ্ছে, বিশেষ ধরনের কোনো যন্ত্র দিয়ে পুরো কঙ্কাল সহজেই চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।

জানতে চাইলে গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ বোরহান উদ্দিন বলেন, ২০১৮ সালের ঘটনা সম্পর্কে আমার জানা নেই। আপনাদের মাধ্যমে প্রথম জানলাম। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান মাসুদ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

কঙ্কাল আছে কিনা নিশ্চিতে স্বজনরা ছুটছেন কবরস্থানে

প্রকাশিত : ০২:২৯:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০২০

ময়মনসিংহ শহরের একটি বাসা থেকে কঙ্কাল প্রাপ্তির খবর শোনার পর গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের লোকজন কবরস্থানের দিকে ছুটছেন। তারা কবর খুঁড়ে দেখছেন প্রিয়জনের লাশ আছে কিনা। অনেকেই জানিয়েছেন, কবরে তাদের প্রিয়জনদের লাশ নেই। গ্রামবাসীর কয়েকজন জানান, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে একবার শোনা গেল কবরে লাশ নেই।

এরপর তারা কবরস্থানে গিয়ে দেখেন মাত্র দুই-আড়াই ফুট ফাঁক করে অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক কবরের কঙ্কাল চুরি হয়ে গেছে। বিষয়টি থানায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। এরই মধ্যে শনিবার রাতে ময়মনসিংহের আরকে মিশন রোডের একটি বাসা থেকে ১২টি কঙ্কাল ও দুই বস্তা হাড় উদ্ধার হয়।

যেভাবে লাশ চুরির খবর ফাঁস : ২০১৮ সালের মার্চ মাসে চুরি হওয়া কঙ্কাল বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আকির হোসেন, রাসেল মিয়া আর হযরত আলী নামে তিনজনের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়। এই বিবাদের জেরেই চুরির ঘটনা ফাঁস হয়। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিবাদের বিষয়টি শুনতে পান ভাংনামারী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে নয়ন মিয়া।

এ চক্রের ৩ জনের বাড়িই তার এলাকায়। বিষয়টি তিনি তার ভাই ফয়সাল ইসলামকে ফোনে জানান। তার দাদা ওয়াহেদ আলী ও দাদি কদর বানুর কবরে কঙ্কাল আছে কিনা জানতে চান? পরিবারের লোকজন ছুটে গিয়ে দেখেন, দুটি কবরেই দুই-আড়াই ফুট করে গর্ত (ফাঁকা)। কবরে কঙ্কাল নেই! এরপর ছুটে আসেন আত্মীয়স্বজনরা।

লাশ চুরির ঘটনা শুনে ভাংনামারী ইউনিয়নের হাজী আবদুল মজিদের ছেলে আবুল হাসাদ বাচ্চু ছুটে যান মায়ের কবরে। কবরের মাথার অংশে দুই-আড়াই ফুট ফাঁকা দেখে চমকে ওঠেন। গ্রামবাসীকে নিয়ে মাটি সরিয়ে দেখেন ‘কঙ্কাল’ নেই। স্ত্রীর কঙ্কাল নেই এ কথা শুনেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন হাজী আবদুল মজিদ। বাচ্চু জানান, তার মা নূরজাহান বেগম প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। মা হারানোর শোক এখনও কাটাতে পারেননি। এখন দেখছেন কবরে মায়ের কঙ্কাল নেই।

কুলিয়ারচর গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর স্ত্রী হাসনা আক্তারের কবর খুঁড়ে কঙ্কাল পাওয়া যায়নি। তিনি মারা যান প্রায় ২ বছর আগে। ৩ বছর আগে মারা যান মোর্শেদ আলী। কবরে তার কঙ্কালও নেই। গজারিয়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাক জানান, কবরে তার ভাই আবু চান ও সালেহা খাতুনের কঙ্কাল নেই। কবরে জুবেদা খাতুন নামে একজনের কঙ্কালও নেই।

তার ছেলে আবদুল খালেক জানান, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরেও মায়ের কবর মেরামত করেছি। কবর ভেঙে গেছে দেখে মেরামত করেছি। কঙ্কাল নেই, সেটা আগে বুঝতে পারিনি। গ্রামের লোকজন কবর খোঁড়াখুঁড়ি শেষে নিশ্চিত করেন ২১টি কবরে কঙ্কাল নেই। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। লাশ চুরি করে তা বিক্রি করে ব্যবসা হয় এটা আগে জানা ছিল না। এটা ভয়ানক একটি বিষয়। এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

ভাংনামারী ইউনিয়নের আবুল হাসনাত বাচ্চু বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা থাকায় অভিযোগ দায়ের করি। পুলিশ অভিযোগ নিয়েও চিহ্নিত চোরদের গ্রেফতারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দীর্ঘদিন পরও স্বজনদের কঙ্কাল সন্ধান পাইনি। মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর উপজেলার সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, চুরির বিষয়টি পুলিশ জানানোর পরও ব্যবস্থা না নেয়া দুঃখজনক।

মানবাধিকারকর্মী ফয়সাল ইসলাম জানান, করব থেকে কঙ্কাল চুরির ঘটনায় আমরা বিস্মিত। ধারণা করা হচ্ছে, বিশেষ ধরনের কোনো যন্ত্র দিয়ে পুরো কঙ্কাল সহজেই চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।

জানতে চাইলে গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ বোরহান উদ্দিন বলেন, ২০১৮ সালের ঘটনা সম্পর্কে আমার জানা নেই। আপনাদের মাধ্যমে প্রথম জানলাম। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান মাসুদ