লিভারের বিষয়ে কম-বেশি সবাই সচেতন। লিভারে সমস্যা হওয়ার পর মানুষ যতটা সাবধান হয় এর আগে কিন্তু কিঞ্চিৎ পরিমাণও সতর্ক থাকে না শরীরের গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গ নিয়ে। যদি আগে থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গ নিয়ে সতর্ক হওয়া যায় তাহলে কিছুটা হলেও লিভারের সমস্যা ঠেকানো সম্ভব।
লিভার : চিকিৎসকরা বলে থাকেন যে, মানুষের একটা হাত বা পা না থাকলেও সে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হলে আর বাঁচতে পারে না সে। এটি শরীরের সকল কাজে জরুরি। খাবার হজম করে, শরীরে শক্তি উৎপাদন হয় লিভারে। এমনকি বর্জ্য পদার্থের নিষ্কাশনেও কার্যকরী ভূমিকা রাখে লিভার।
যকৃতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকায় লিভারজনিত রোগের উপসর্গগুলো ধীর গতিতে ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ১/৮ যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে শরীর নিজেই সুস্থ করে ফেলতে পারে তা। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটা সম্ভব হয় না। এতে করে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথম দিকে অনেকেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা বুঝতে পারেন না। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করালে ধরা পড়ে এ সমস্যা।
রোগের বিভিন্ন প্রকারভেদ : লিভারের রোগগুলোকে সাধারণত তিনভাগে ভাগ করা হয়। যথা- জেনেটিক, সংক্রমণজনিত ও লাইফস্টাইলঘটিত। জীবন পরিচালনার জন্যই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দেয়। আবার হেপাটাইটিসের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে সংক্রমণ একটি ফ্যাক্টর। আর আয়রন জমার ফলে লিভারে যে সমস্যা তৈরি হয় তা জেনেটিক। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আয়রন জমেও তৈরি হতে পারে এ সমস্যা। তখন এটাকে বলা হয় হিমোক্রোমাটোসিস।
ফ্যাটি লিভার সমস্যা : এটাকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। নন-অ্যালকোহলিক এবং অ্যালকোহলিক। আপনারা শুরুতেই বুঝতে পারছেন যে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে লিভারে ফ্যাট জমার জন্য এটাকে অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার বলা হয়। কোনো ব্যক্তির যদি এমনটা হয় তাহলে রোগীকে সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই মদ্যপান পরিহার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সম্প্রতি ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। আর এর কারণ হচ্ছে সেডেন্টারি লাইফস্টাইল। অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোনো কারণে লিভারে ফ্যাট জমা হলে তাকে বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার। সাধারণত ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, শরীর চর্চার অভাব, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া ইত্যাদির কারণে হয়ে থাকে এই রোগ। অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের মতো বিপজ্জনক না হলেও রোগীকে সচেতন থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। কেননা, জিনগত কারণেও অনেক ক্ষেত্রে লিভারে ফ্যাট জমার প্রবণতা থাকে। জিনে মানুষের কোনো হাত নেই। তাই সুষম জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হয়।
হেপাটাইসি : পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে বিলিরুবিন নামক এক পদার্থ তৈরি হয়। নিয়মিত মল-মূত্রের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলিরুবিন বেরিয়ে যায়। বাকিটা লিভার তার কুপ্রভাব মুক্ত করে গলব্লাডারে পাঠিয়ে দেয়। লিভারের কোষে বেশ কিছু সরু নালি রয়েছে। এ নালি দিয়ে গলব্লাডারে পৌঁছায় বিলিরুবিন। কোষের দেওয়ালগুলো ফুলে গেলে নালিগুলোর মধ্য দিয়ে বিলিরুবিন যেতে পারে না। এ সময় রক্ত জমতে জমতে জন্ডিসে রূপ নেয়। এ থেকেই ইনফেকটিভ জন্ডিস হয়ে থাকে। চিকিৎসকরা বলে থাকেন, লিভার ভালো রাখার জন্য খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হলে অবিলম্বে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিন। পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনুন।
ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় রোগ সৃষ্টি : কিছুকিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও ক্ষতি হতে পারে লিভারের। এপিলেন্সি ও টিবির কিছু ওষুধে লিভারে অতিরিক্ত কপার জমা পড়ে। তাই এ জাতীয় ওষুধের ক্ষেত্রে অবশ্যেই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
রোগের উপসর্গ ও ক্ষতির পর্যায়ক্রম : প্রথম দিকে লিভারের আকার বড় হয়ে যাওয়া। এরপর ফ্যাটি লিভার, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং ক্যানসারের উপসর্গ দেখা দেয়। প্রতিটি স্তরে পরিস্থিতির অবনতি হতে কয়েক বছর করে সময় লেগে যায়। এজন্য প্রথম থেকেই সচেতন হওয়া উচিত। ফ্যাটি লিভারের সমস্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে খাবার হজম হবে না। অনেক সময় বমির উপসর্গও দেখা যাবে। এই সময়ই সতর্ক হতে হবে। সতর্ক না হলে জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা হতে পারে। কিন্তু ঘন ঘন জন্ডিস হওয়া বড় কোনো লক্ষণও হতে পারে। তাই লিভার সুস্থ রাখার জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে হবে।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা।


























