০৯:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

৬৮১ বছর ধরে দ্বীনের প্রদীপ জ্বলছে শাহ ওমরের (র.) খানকাহ মসজিদে

পুরো কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের বেশ কিছু অংশ নিয়ে ছিল ‘চকরিয়া’। তখন এখানে
বিভিন্ন জাত গোত্রের মানুষ থাকলেও মুসলিমদের আগমন ঘটে নবম শতাব্দী থেকে।
কিন্তু ঐ সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারে কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল কিনা
ইতিহাসবিদদের কোন গ্রন্থে উল্লেখ নেই। তবে সুফি সাধকদের মধ্যে শাহ
ওমর(র.) ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহ্ জালালের(র.) সাথে সিলেট আসেন। পরে ১৩৪০
খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ্ কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের প্রাক্কালে
চট্রগ্রাম বিজয়ে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন শাহ ওমর(র.)। তিনি
চট্টগ্রাম আসার পথে কিছুদিন নোয়াখালী অবস্থান করেছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই
শাহ ওমর সাধক হিসেবে প্রখ্যাত হয়ে উঠেন। তার প্রভাবে বহু অমুসলিম ইসলাম
ধর্মের দীক্ষিত হয়েছিলেন। পরপরই শাহ ওমর চকরিয়ার কাকারায় এসে খানকাহ্ গড়ে
তোলেন। এই খানকায় দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সালাত কায়েম করা হতো। তবে ওই
সময় আগত শাহ্ ওমর(র.) ফরাসি ভাষাভাষির হওয়ায় সালাতকে ‘নামাজ’ হিসেবে
প্রচার হয়।
সেই হিসেবে চকরিয়ায় খানকাহ্’র মাধ্যমে সালাত আদায়ের মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয়
এখন থেকে ৬৮১ বছর পূর্বে (১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে)। এখানেই শাহ্ উমর ইন্তেকাল
করলে খানকাহ্ মসজিদের পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় শাহ ওমরের(র.) মাজার শরীফ।
সেই থেকে অদ্যাবধি মুসলিম সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভক্তও মুরিদান পূণ্য
অর্জনের লক্ষ্যে শাহ্ ওমরের মাজারে আসলেও এখানেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের
ইসলাম ধর্ম প্রচার ও সালাত কায়েমের প্রথম খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা
প্রায় মানুষেরই অজানা। বর্তমানে ঐ মাজার লাগোয়া মসজিদ ও নিকটেই চারটি
পুকুর এবং খবর স্থান সহ নানা গাছ গাছালি রয়েছে বনঘেষা প্রায় ৬০ একর
পাহাড়ি জমিতে। এখানেই ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে কাকারা নিবাসী শাহ্ এশারাত
উল্লাহ শাহ ওমর(র.) এর মাজার প্রাঙ্গণে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী
শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ড শুরু করেন।
বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের লিখিত পুস্তক মতে, মাতামুহুরি নদী তীরবর্তী
মানিকপুরে ১৮৯০ সালে ফজলুল রহমান সিকদার কিউক কর্তৃক নির্মিত তিন
গম্বুজের ‘কিউকের মসজিদ’টি চকরিয়ার প্রথম মসজিদ হিসেবে প্রচারণায় আনা
হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক নানা রচনাবলিতে মুসলিম ও সুফি সাধকদের আগমন,
অবস্থান ও ইসলাম শিক্ষা প্রচার-প্রসার ও সালাত কায়েম করতে খানকাহ্
নির্মাণ হিসেবে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয় ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে। বাগদাদ
কেন্দ্রীক বৃহত্তর ভারতে বনিক সেজে ব্যবসার সাথে নৌপথে ইসলাম ধর্ম
প্রচারে আসা সুফি সাধকরা ছিলেন ফার্সি ভাষাভাষী। তাই ধর্ম প্রচারেও
ধর্মীয় অনেক প্রচলিত শব্দ ফার্সিতেই প্রচার পায়।
চকরিয়ায় মুসলিম আগমনের ইতিহাসে শাহ ওমর ও এতদঞ্চলে তাঁর আগমন চকরিয়াবাসীর
কাছে ছিল স্বর্গীয় আশীর্বাদ। তিনিই চকরিয়ায় সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক ইসলাম
প্রচার ও প্রসারের ভিত স্থাপন করে চকরিয়াকে ইসলামের আলোই আলোকিত করে
তোলেন। এই আলো ছড়ানোর কেন্দ্র বিন্দু ছিল কাকারায় শাহ্ উমরের প্রতিষ্ঠিত
খানকাহ্।
সরেজমিনে শাহ ওমর মাজারে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য মানুষ পূণ্যের আশায় মাজারে
এসেছে। ওই সময় মাজারের সামনে বৈঠকখানায় খাদেমের দ্বায়িত্বে ছিলেন মনজুরুল
আলম মনজুর। মসজিদে ছিলেন ইমাম হাফেজ জিয়াবুল হক। তারা দু’জনই বলেন, এই
মাজারে মসজিদ কখন প্রতিষ্ঠা হয়েছে আমরা জানিনা। খাদেম মনজুর বলেন,
বংশপরম্পরায় আমাদের পারিবারিক পুরুষ সদস্যরা খাদেমের খাদেমের দায়িত্ব
পালন করে আসছেন।
স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের মতে, মাজারে ভক্ত ও মুরিদানসহ পূণ্য অর্জনে আগত
লোকজনের কাছ থেকে প্রতিবছর বিপুল অংকের আয় হলেও চকরিয়ার সবচেয়ে পুরনো
মসজিদটি নির্মাণে আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি।
উল্লেখ্য, পর্তুগিজ ঐতিহাসিক জ্যো আ দ্যা বেরোস অংকিত বাংলার ম্যাপ এবং
তুর্কি নাবিক সিদি আলি চিলভীর বর্ণনানুসারে বলা যায়, “একসময় বর্তমান
চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের শেষ এলাকা থেকে শুরু করে রামু ও কক্সবাজার
সদরসহ পুরে এলাকাটি ‘চকরিয়া রাজ্য’ নামে পরিচিত ছিল।” আরবীয় ঐতিহাসিক
ইদ্রিসি, আল মাসুদি, আল ইয়াকুবি, সোলায়মান তাজর, কাজি রসিদ বিন জোবায়ের,
ইবনে খুরদাদবাহ, ইবনুল ফকিহ্ হামদাদি প্রমুখ পন্ডিতদের বর্ণনাতেও বেরোস
এবং চিলভির বর্ণনার সমর্থন মেলে। এতে প্রমাণ মেলে পুরো কক্সবাজার এলাকাটি
চকরিয়া নামে পরিচিত ছিল পরবর্তীতে জনবসতি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে
চকরিয়া বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিতি পায়। এর পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব
২০০০ অব্দে ‘চাকরোয়া’ থেকে ‘চকরিয়া’ নামের উৎপত্তি।

বিজনেস বাংলাদেশ/ বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

৬৮১ বছর ধরে দ্বীনের প্রদীপ জ্বলছে শাহ ওমরের (র.) খানকাহ মসজিদে

প্রকাশিত : ০৪:৩৩:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১

পুরো কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের বেশ কিছু অংশ নিয়ে ছিল ‘চকরিয়া’। তখন এখানে
বিভিন্ন জাত গোত্রের মানুষ থাকলেও মুসলিমদের আগমন ঘটে নবম শতাব্দী থেকে।
কিন্তু ঐ সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারে কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল কিনা
ইতিহাসবিদদের কোন গ্রন্থে উল্লেখ নেই। তবে সুফি সাধকদের মধ্যে শাহ
ওমর(র.) ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহ্ জালালের(র.) সাথে সিলেট আসেন। পরে ১৩৪০
খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ্ কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের প্রাক্কালে
চট্রগ্রাম বিজয়ে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন শাহ ওমর(র.)। তিনি
চট্টগ্রাম আসার পথে কিছুদিন নোয়াখালী অবস্থান করেছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই
শাহ ওমর সাধক হিসেবে প্রখ্যাত হয়ে উঠেন। তার প্রভাবে বহু অমুসলিম ইসলাম
ধর্মের দীক্ষিত হয়েছিলেন। পরপরই শাহ ওমর চকরিয়ার কাকারায় এসে খানকাহ্ গড়ে
তোলেন। এই খানকায় দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সালাত কায়েম করা হতো। তবে ওই
সময় আগত শাহ্ ওমর(র.) ফরাসি ভাষাভাষির হওয়ায় সালাতকে ‘নামাজ’ হিসেবে
প্রচার হয়।
সেই হিসেবে চকরিয়ায় খানকাহ্’র মাধ্যমে সালাত আদায়ের মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয়
এখন থেকে ৬৮১ বছর পূর্বে (১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে)। এখানেই শাহ্ উমর ইন্তেকাল
করলে খানকাহ্ মসজিদের পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় শাহ ওমরের(র.) মাজার শরীফ।
সেই থেকে অদ্যাবধি মুসলিম সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভক্তও মুরিদান পূণ্য
অর্জনের লক্ষ্যে শাহ্ ওমরের মাজারে আসলেও এখানেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের
ইসলাম ধর্ম প্রচার ও সালাত কায়েমের প্রথম খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা
প্রায় মানুষেরই অজানা। বর্তমানে ঐ মাজার লাগোয়া মসজিদ ও নিকটেই চারটি
পুকুর এবং খবর স্থান সহ নানা গাছ গাছালি রয়েছে বনঘেষা প্রায় ৬০ একর
পাহাড়ি জমিতে। এখানেই ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে কাকারা নিবাসী শাহ্ এশারাত
উল্লাহ শাহ ওমর(র.) এর মাজার প্রাঙ্গণে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী
শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ড শুরু করেন।
বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের লিখিত পুস্তক মতে, মাতামুহুরি নদী তীরবর্তী
মানিকপুরে ১৮৯০ সালে ফজলুল রহমান সিকদার কিউক কর্তৃক নির্মিত তিন
গম্বুজের ‘কিউকের মসজিদ’টি চকরিয়ার প্রথম মসজিদ হিসেবে প্রচারণায় আনা
হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক নানা রচনাবলিতে মুসলিম ও সুফি সাধকদের আগমন,
অবস্থান ও ইসলাম শিক্ষা প্রচার-প্রসার ও সালাত কায়েম করতে খানকাহ্
নির্মাণ হিসেবে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয় ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে। বাগদাদ
কেন্দ্রীক বৃহত্তর ভারতে বনিক সেজে ব্যবসার সাথে নৌপথে ইসলাম ধর্ম
প্রচারে আসা সুফি সাধকরা ছিলেন ফার্সি ভাষাভাষী। তাই ধর্ম প্রচারেও
ধর্মীয় অনেক প্রচলিত শব্দ ফার্সিতেই প্রচার পায়।
চকরিয়ায় মুসলিম আগমনের ইতিহাসে শাহ ওমর ও এতদঞ্চলে তাঁর আগমন চকরিয়াবাসীর
কাছে ছিল স্বর্গীয় আশীর্বাদ। তিনিই চকরিয়ায় সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক ইসলাম
প্রচার ও প্রসারের ভিত স্থাপন করে চকরিয়াকে ইসলামের আলোই আলোকিত করে
তোলেন। এই আলো ছড়ানোর কেন্দ্র বিন্দু ছিল কাকারায় শাহ্ উমরের প্রতিষ্ঠিত
খানকাহ্।
সরেজমিনে শাহ ওমর মাজারে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য মানুষ পূণ্যের আশায় মাজারে
এসেছে। ওই সময় মাজারের সামনে বৈঠকখানায় খাদেমের দ্বায়িত্বে ছিলেন মনজুরুল
আলম মনজুর। মসজিদে ছিলেন ইমাম হাফেজ জিয়াবুল হক। তারা দু’জনই বলেন, এই
মাজারে মসজিদ কখন প্রতিষ্ঠা হয়েছে আমরা জানিনা। খাদেম মনজুর বলেন,
বংশপরম্পরায় আমাদের পারিবারিক পুরুষ সদস্যরা খাদেমের খাদেমের দায়িত্ব
পালন করে আসছেন।
স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের মতে, মাজারে ভক্ত ও মুরিদানসহ পূণ্য অর্জনে আগত
লোকজনের কাছ থেকে প্রতিবছর বিপুল অংকের আয় হলেও চকরিয়ার সবচেয়ে পুরনো
মসজিদটি নির্মাণে আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি।
উল্লেখ্য, পর্তুগিজ ঐতিহাসিক জ্যো আ দ্যা বেরোস অংকিত বাংলার ম্যাপ এবং
তুর্কি নাবিক সিদি আলি চিলভীর বর্ণনানুসারে বলা যায়, “একসময় বর্তমান
চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের শেষ এলাকা থেকে শুরু করে রামু ও কক্সবাজার
সদরসহ পুরে এলাকাটি ‘চকরিয়া রাজ্য’ নামে পরিচিত ছিল।” আরবীয় ঐতিহাসিক
ইদ্রিসি, আল মাসুদি, আল ইয়াকুবি, সোলায়মান তাজর, কাজি রসিদ বিন জোবায়ের,
ইবনে খুরদাদবাহ, ইবনুল ফকিহ্ হামদাদি প্রমুখ পন্ডিতদের বর্ণনাতেও বেরোস
এবং চিলভির বর্ণনার সমর্থন মেলে। এতে প্রমাণ মেলে পুরো কক্সবাজার এলাকাটি
চকরিয়া নামে পরিচিত ছিল পরবর্তীতে জনবসতি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে
চকরিয়া বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিতি পায়। এর পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব
২০০০ অব্দে ‘চাকরোয়া’ থেকে ‘চকরিয়া’ নামের উৎপত্তি।

বিজনেস বাংলাদেশ/ বিএইচ