ইকো পার্ক মানেই জীব বৈচিত্র আর পাখ-পাখালি ও গাছ-গছালি’র সমাহার। তবে একটু ব্যাতিক্রমি ইকো পার্ক গড়ে উঠেছে শেরপুরের নকলায়। প্রায় ৭ একর জমি’র উপর কেবল মাত্র ধূ ধূ ও উত্তপ্ত বালু জমিতে গড়ে উঠেছে এ ইকো পার্কটি।
যেখানে কোন রকমের গাছ-গাছালি তো দুরের কথা লতা-গুল্মও জন্মাতো না সেখানে কৃষি বিভাগের বিজ্ঞানীরা নানা কৌশল আর গবেষনা করে জন্মিয়েছে আম, জাম, লিচু, কলা, কাঁঠাল, পেঁপে, পেয়ারা, বরই, আতা, তাল, ছফেদাসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতি’র ফলদ এবং বিভিন্ন ওষুধী ও বনজ প্রায় শতাধিক প্রজাতি’র আড়াই হাজার বৃক্ষ।
২০১৪ সালে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী ও শেরপুর-২ আসনের সাংসদ বেগম মতিয়া চৌধুরী এ ইকো পার্কটি শেরপুর কৃষি বিভাগ ও জামালপুর হর্টিকালচার বিভাগের অধিনে গড়ে তোলা হলেও তা বর্তমানে অযতœ আর অবহেলায় পড়ে আছে। এ ইকোপর্কের দেখভালের দায়িত্বে থাকা হার্টিকালচারের উপ পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ জানায়, তৎকালীন সরকার একটি প্রকল্পের মাধ্য আমাদের সহায়তায় সেখানে প্রায় আড়াই হাজার বৃক্ষ রোপন করা হয়েও ইতিমধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সেখানে একজন কেয়ারটেকার রাখা হলেও আমাদের পক্ষে সেখানে আর কোন বরাদ্দ দেয়ার কিছু নেই। ওই কেয়ারটেকারের বেতনটা আমরা নিজেরাই মেনেজ করে দেই, যাতে গাছগুলোর অন্তত কোন ক্ষয়-ক্ষতি না হয় তা দেখার জন্য।
জেলা কৃষি বিভাগ ও হার্টিকালচার বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, জেলার নকলা উপজেলার উরফা ইউনিয়নের উরফা কোদাল দোয়া গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ি ভোগাই, কংশ ও কালা গাঙ্গ নদী। ২০০৯ সালে তৎকালে বর্তমান কৃষি মন্ত্রী ভোগাই নদীর উপর রাবার ড্যাম নির্মান এবং নদী’র নব্যতা বৃদ্ধির জন্য নদী খননের কাজ করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় নদী খননের বালু ভোগাই ও কালা গাঙ্গের মোহনার তীরে স্তুপাকারে রেখে দেয়। পরবর্তিতে ওই বালুর স্তুপ বিছিয়ে দেয়া হয় সরকারী খাস প্রায় ৭ একর জমিতে। পরবর্তিতে সেখানে কেবল মাত্র স্থানীয় গ্রামবাসী’র জন্য ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপন করে জীব বৈচিত্র তৈরীর জন্য ইকো পার্ক নির্মানের পরিকল্পনা করেন তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। প্রথম পর্যায় এলজিইডি বিভাগ থেকে ওই বালু জমিতে গাছের চারা রোপনের দয়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তাদের রোপন করা সকল গাছের চারা ক’দিন পরই মরে যেতো। পরবর্তিতে প্রকল্পের মাধ্যমে হার্টিকালচার বিভাগতে দায়িত্ব দেয়া হলে জামালপুরের হার্টিকালচার বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি সম্পসারণ বিভাগের সাবেক মহা পরিচালক মো. এনামূল হক ওই ইকো পার্কে গাছ জন্মানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে নানা গবেষনা করে বিশেষ কায়দায় অবশেষে প্রায় ৪ বছর পর সফল হয়। এরপর শুরু হয় ইকো পার্ক গড়ার কাজ।

আস্তে আস্তে ২০১৪ সালে ওই ইকো পার্কে রোপন করা হয় দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতি ফলদ, ওষুধী ও বনজ প্রায় ২ হাজার ৫ শতাধিক গাছের চারা। বর্তমানে ওই ইকো পার্কের বেশ কিছু গাছে ফল ধরতে শুরু করেছে। পাশাপাশি দেশীয় নানা প্রজাতির পাখ-পাখালি’র অভয়ারন্যও স্মৃষ্টি হয়েছে। ইকে পার্কের গাছ গুলোকে সতেজ ও জীবন্ত রাখতে সার্বক্ষনিক দু’জন শ্রমিক নিয়োগ থাকলেও প্রকল্প শেষ হওয়ায় গত দুই বছর ধরে ইকো পার্কের গাছের পরিচর্যা করার কোন বরাদ্দ দেয়া হয় না। ফলে বর্তমানে একজন মাত্র কেয়ারটেকার শুধু গাছের রক্ষনা বেক্ষণ করে গেলেও জঙ্গল-আগাছা পরিস্কার, বৃষ্টিতে মাটি ধ্বসে গেলে তা সংস্কারের জন্য কোন বরাদ্দ নেই। তারপরও নিজ উদ্যেগে বর্তমান কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া দেখাশোনা ও আগাছা পরিক্ষার করে যাচ্ছে বলে তিনি জানায়।
ইকো পর্কের তিন পাশে নদী থাকলেও অন্য পাশ দিয়ে বিভিন্ন শেণীর মানুষ ও আশপাশের গ্রামের ছেলে-মেয়েরা যত্রতত্র ইকোপার্কে ঢুকে অপরিপক্ক ফল খেয়ে ফেলে। অনেক সময় গাছেরও ক্ষতি করে বলে জানায় স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। তারা এ ইকো পার্কের রক্ষনাবেক্ষনার জন্য পার্কের চারপাশ দিয়ে কাটাতারের বেড়া নির্মান এবং ইকোপার্কে প্রবেশের জন্য নদীর উপর একটি ফুটব্রীজ জরুরী হয়ে পড়েছে। ৩ পাশে নদী বেষ্টিত ছায়া ঘেরা ইকোপার্কটি দিনে দিনে জেলার বিভিন্ন মহলে প্রচায় হওয়ায় শহর থেকেও অনেক মানুষ একুট প্রকৃতির প্রশান্তি নিতে এবং জীববৈচিত্র দেখতে ছুটে যাচ্ছে সেখানে। কিন্তু নদী পারাপার ও সেখানে কোন রকমের বসার ব্যবস্থা না থাকায় মনকষ্টে ফিরে আসতে হয় ভ্রমন পিপাসুদের। একেবারের প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠা ইকোপার্কে এখন নানা দেশীয় পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ, তিন পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ¯্রােতের কলতান আর প্রকৃতির ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়ায় দিন দিন শহরের মানুষের আকর্ষন করছে। তবে সেখানে রক্ষণাবেক্ষণসহ একটি ফুটব্রীজ এবং ভ্রমনপিপাসুদের বসার জন্য বেঞ্চ নির্মান করা হলে প্রকৃতির নির্মল পরশ পেতে ছুটে যাবে হাজারও পর্যটক। এছাড়া স্থানীয়দেরও বেড়ানো ও প্রশান্তির একটি স্থান গড়ে উঠবে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এবিষয়ে জেলা কৃষি বিভাগের উপ পরিচালক ড. মুুহিদ কুমার জানায়, আসলে ইকোপার্কটি আমাদের সংশ্লিষ্টতার চেয়ে জামালপুর হার্টিকালচার বিভাগের বেশি ছিলো। তাই এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। তবে সরকার যদি আমাদের দায়িত্বে দেয় সে ক্ষেত্রে সেটি দেখভালের কাজ করতে পারবো।
এ বিষয়ে জামালপুর হার্টিকালচারের উপ পরিচালক ড. মেহেদি মাসুদ জানায়, প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাওয়া আমরা আপাতত কিছু করতে পারছি না। সরকারের যে কোন প্রকল্প শেষ হয়ে গেয়ে তা স্থানীয় জনগন এবং প্রশাসনের দায়িত্বে নিতে হয়। তারপর আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে সেখানে একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ রয়েছে। তবে ইকোপার্টটি ভবিষ্যতে পাখপাখালিও অভায়শ্রম ও জীববৈচিত্র রক্ষায় স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ এবং স্থানীয় প্রশাসনের এগিয়ে আসা উচিত সেটাকে ধরে রাখার।
এবিষয়ে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদুর রহমান জানায়, ইকোপার্কের বিষয়ে অবগত আছি, তবে সেখানে গিয়ে সর্বশেষ অবস্থা জেনে স্থানীয় এমপি মহোদয়ের সাথে পরামশ্য করে কী করা যায় সে বিষয়ে পড়ে অবগত করা হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ




















