০১:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পাওয়া যাবে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙা আম

আগামী জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে রংপুরের বাজারে বেচা কিনা হবে সুমিষ্ট আঁশবিহীন ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙা আম। সরকারিভাবে হাড়িভাঙ্গা আম স্বীকৃতি পাওয়ায় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় গতবারের চেয়ে এই আমের চাষ বেড়েছে। এবছর হাড়িভাঙা আমের ভালো ফলন হয়েছে। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা, রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়ন, বদরগঞ্জ এই তিনটি উপজেলায় বানিজ্যিকভাবে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ করা হচ্ছে। আমটির অতুলনীয় স্বাদ ও গন্ধের কারণে দিনে দিনে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাশর্^বর্তী জেলা এবং উপজেলাগুলোতেও এ আমের চাষ ছড়িয়ে পড়ছে। হাড়িভাঙা আমের চাষ রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। এতে করে শত শত আম চাষির ভাগ্যের চাকা ঘুরছে। তাদের সংসারে ফিরে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান।
রংপুর কৃষি বিভাগ বলছেন, জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হাঁড়ি ভাঙ্গা আম বাজারে পাওয়া যাবে। চলতি বছরে হাড়িভাঙা আমের ফলন ভালো হয়েছে। তাই বেশ খুশি এই অঞ্চলের আম চাষিরা। তাদের বিশ্বাস এবারও তারা লাভের মুখ দেখবেন।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরাহাট, পদাগঞ্জ, মাঠেরহাট, বদরগঞ্জের গোপালপুর, নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, রংপুর নগরের বড়বাড়ী, সদর উপজেলার সদ্যপুস্করণী ইউপির কাঁটাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিশাল বিশাল বাগানে সারি সারি আম গাছ। থোকা থোকা সবুজ আমের ভাড়ে নুইয়ে পড়ছে গাছের ডাল। বাড়ির উঠান ও ধানের জমির আইলসহ চারিদিকে সারি সারি ভাবে আবাদ করা হয়েছে হাড়িভাঙা আম। গ্রামের প্রতিটি সড়কের দুই ধারে, প্রতিটি বাসা-বাড়ির পরিত্যক্ত জায়গা লাগানো হয়েছে আমগাছ। প্রত্যেকটি গ্রাম যেন আমের গ্রামে পরিনত হয়েছে।
রংপুর কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানাগেছে, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ৭হাজার ১শ’ ৩৩ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙা আমের চাষ করা হয়েছে। আর এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯২ হাজার ৭শ’১৫ মেট্রিকটন আম। যাহা দেশের অর্থনীতিকে অগ্রভুমিকা পালন করবে। রংপুরে হাড়িখভাঙা আমের আবাদ করা হয়েছে ৩ হাজার ২শ’ ৮০ হেক্টর জমিতে। গাইবান্ধায় জেলায় ১ হাজার ৬শ’৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় ৪শ’৩০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৪শ’৭৪ হেক্টর ও নীলফামারিতে হাড়িভাঙা আমের আবাদ করা হয়েছে ৭ হাজার ১শ’৩৩ হেক্টর জমিতে।
রংপুর কৃষি বিভাগের তদারকি নেই উল্লেখ করে মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষী হাফেজ মাওলানা মো. আওলাদ হোসেন বলেন, হাড়িভাঙা আম এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। হাড়িভাঙা আম চাষ করে বেকার যুবকরা তাদের ভাগ্যকে পরিবর্তন করেছেন। শুধুমাত্রা মিঠাপুকুরে সাড়ে ৩হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে হাড়িভাঙা আমের চাষ করা হয়ে থাকে। আওলাদ হোসেন আরও বলেন, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের কোন কর্মকর্তাকে মাঠে কাজ করতে দেখিনি বা কোন পরামর্শ পাইনি। আম চাষিরা নিজ বুদ্ধি দিয়ে ওষুধ ক্রয় করে গাছে স্প্রে করছেন।
আম চাষি শফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর এক একর জমির আম বাগানে মুকুল আসার পর তিনি দেড় লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। আরো ৫টি বাগান আছে তার। আমে লাভ বেশি হওয়ায় ধান চাষ বাদ দিয়েছেন। বাড়ি ভিটায় এক একর জমিতে উঠান থেকে শুরু করে ১৫০টি আম গাছ লাগিয়েছেন।
সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়নের আম চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, আট থেকে ১০ বছর আগেও রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষজন অভাবে ছিলেন। তিন বেলা তো দূরের কথা, অনেকের এক বেলাও খাবার জুটত না। এলাকার মাটি লাল হওয়ার কারণে এখানে বছরে একবার ধান হতো। বাকি আট মাস জমি পড়ে থাকত। কিন্তু হাঁড়িভাঙা আম তাদের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে।
হাঁড়িভাঙ্গা আমকে ঘিরে রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় বেকার মানুষের সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে মিঠাপুকুর উপজেলার লালপুর, পদাগঞ্জ, তেয়ানিসহ আশপাশের গ্রামের বেকার যুবকরা এখন আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে অর্থ উপার্জনের এক নুতন পথ খুঁজে পেয়েছেন।
রংপুরে হাঁড়িভাঙ্গা আমের স¤প্রসারক আব্দুস সালাম জানান, স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় এই হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান এখন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় করা হয়েছে। আমটির ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠায়, এই আমের সুনাম দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হাড়িভাঙা আম রংপুর অঞ্চলের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র বদলে দিচ্ছে ।
রংপুর কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত কার্যালয়ের কৃষিবিদ ও উদ্যান বিশেজ্ঞ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম জানান, রংপুরে এখন ব্যাপকভাবে এই আম চাষ হচ্ছে। এই আম চাষে খুব একটা পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় না হওয়ায় মানুষজন আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তিনি আরও বলেন, শিলাবৃষ্টি বা ঘুণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে হাড়িভাঙ্গা আম বিদেশেও রপ্তানী করা যাবে। তিনি এ অঞ্চলে আম সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
রংপুরের ডিসি আসিব আহসান বলেন, ‘আম বেচা-কেনায় যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় এবং পরিবহনে ব্যবসায়ীদের কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয় সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে প্রশাসন।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

হামে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবিহীন শিশু

জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পাওয়া যাবে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙা আম

প্রকাশিত : ০৪:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ মে ২০২১

আগামী জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে রংপুরের বাজারে বেচা কিনা হবে সুমিষ্ট আঁশবিহীন ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙা আম। সরকারিভাবে হাড়িভাঙ্গা আম স্বীকৃতি পাওয়ায় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় গতবারের চেয়ে এই আমের চাষ বেড়েছে। এবছর হাড়িভাঙা আমের ভালো ফলন হয়েছে। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা, রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়ন, বদরগঞ্জ এই তিনটি উপজেলায় বানিজ্যিকভাবে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ করা হচ্ছে। আমটির অতুলনীয় স্বাদ ও গন্ধের কারণে দিনে দিনে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাশর্^বর্তী জেলা এবং উপজেলাগুলোতেও এ আমের চাষ ছড়িয়ে পড়ছে। হাড়িভাঙা আমের চাষ রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। এতে করে শত শত আম চাষির ভাগ্যের চাকা ঘুরছে। তাদের সংসারে ফিরে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান।
রংপুর কৃষি বিভাগ বলছেন, জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হাঁড়ি ভাঙ্গা আম বাজারে পাওয়া যাবে। চলতি বছরে হাড়িভাঙা আমের ফলন ভালো হয়েছে। তাই বেশ খুশি এই অঞ্চলের আম চাষিরা। তাদের বিশ্বাস এবারও তারা লাভের মুখ দেখবেন।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরাহাট, পদাগঞ্জ, মাঠেরহাট, বদরগঞ্জের গোপালপুর, নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, রংপুর নগরের বড়বাড়ী, সদর উপজেলার সদ্যপুস্করণী ইউপির কাঁটাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিশাল বিশাল বাগানে সারি সারি আম গাছ। থোকা থোকা সবুজ আমের ভাড়ে নুইয়ে পড়ছে গাছের ডাল। বাড়ির উঠান ও ধানের জমির আইলসহ চারিদিকে সারি সারি ভাবে আবাদ করা হয়েছে হাড়িভাঙা আম। গ্রামের প্রতিটি সড়কের দুই ধারে, প্রতিটি বাসা-বাড়ির পরিত্যক্ত জায়গা লাগানো হয়েছে আমগাছ। প্রত্যেকটি গ্রাম যেন আমের গ্রামে পরিনত হয়েছে।
রংপুর কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানাগেছে, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ৭হাজার ১শ’ ৩৩ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙা আমের চাষ করা হয়েছে। আর এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯২ হাজার ৭শ’১৫ মেট্রিকটন আম। যাহা দেশের অর্থনীতিকে অগ্রভুমিকা পালন করবে। রংপুরে হাড়িখভাঙা আমের আবাদ করা হয়েছে ৩ হাজার ২শ’ ৮০ হেক্টর জমিতে। গাইবান্ধায় জেলায় ১ হাজার ৬শ’৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় ৪শ’৩০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৪শ’৭৪ হেক্টর ও নীলফামারিতে হাড়িভাঙা আমের আবাদ করা হয়েছে ৭ হাজার ১শ’৩৩ হেক্টর জমিতে।
রংপুর কৃষি বিভাগের তদারকি নেই উল্লেখ করে মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষী হাফেজ মাওলানা মো. আওলাদ হোসেন বলেন, হাড়িভাঙা আম এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। হাড়িভাঙা আম চাষ করে বেকার যুবকরা তাদের ভাগ্যকে পরিবর্তন করেছেন। শুধুমাত্রা মিঠাপুকুরে সাড়ে ৩হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে হাড়িভাঙা আমের চাষ করা হয়ে থাকে। আওলাদ হোসেন আরও বলেন, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের কোন কর্মকর্তাকে মাঠে কাজ করতে দেখিনি বা কোন পরামর্শ পাইনি। আম চাষিরা নিজ বুদ্ধি দিয়ে ওষুধ ক্রয় করে গাছে স্প্রে করছেন।
আম চাষি শফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর এক একর জমির আম বাগানে মুকুল আসার পর তিনি দেড় লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। আরো ৫টি বাগান আছে তার। আমে লাভ বেশি হওয়ায় ধান চাষ বাদ দিয়েছেন। বাড়ি ভিটায় এক একর জমিতে উঠান থেকে শুরু করে ১৫০টি আম গাছ লাগিয়েছেন।
সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়নের আম চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, আট থেকে ১০ বছর আগেও রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষজন অভাবে ছিলেন। তিন বেলা তো দূরের কথা, অনেকের এক বেলাও খাবার জুটত না। এলাকার মাটি লাল হওয়ার কারণে এখানে বছরে একবার ধান হতো। বাকি আট মাস জমি পড়ে থাকত। কিন্তু হাঁড়িভাঙা আম তাদের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে।
হাঁড়িভাঙ্গা আমকে ঘিরে রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় বেকার মানুষের সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে মিঠাপুকুর উপজেলার লালপুর, পদাগঞ্জ, তেয়ানিসহ আশপাশের গ্রামের বেকার যুবকরা এখন আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে অর্থ উপার্জনের এক নুতন পথ খুঁজে পেয়েছেন।
রংপুরে হাঁড়িভাঙ্গা আমের স¤প্রসারক আব্দুস সালাম জানান, স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় এই হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান এখন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় করা হয়েছে। আমটির ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠায়, এই আমের সুনাম দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হাড়িভাঙা আম রংপুর অঞ্চলের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র বদলে দিচ্ছে ।
রংপুর কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত কার্যালয়ের কৃষিবিদ ও উদ্যান বিশেজ্ঞ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম জানান, রংপুরে এখন ব্যাপকভাবে এই আম চাষ হচ্ছে। এই আম চাষে খুব একটা পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় না হওয়ায় মানুষজন আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তিনি আরও বলেন, শিলাবৃষ্টি বা ঘুণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে হাড়িভাঙ্গা আম বিদেশেও রপ্তানী করা যাবে। তিনি এ অঞ্চলে আম সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
রংপুরের ডিসি আসিব আহসান বলেন, ‘আম বেচা-কেনায় যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় এবং পরিবহনে ব্যবসায়ীদের কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয় সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে প্রশাসন।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ