বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য নদ-নদী এ দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ নৌ-পথেই বেশি যাতায়াত করে। দেশের উত্তরাঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মানুষ নৌ-পথকেই বেশি ব্যবহার করে থাকে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নদীবিধৌত জেলা সমূহের মানুষকে নৌ-পথেই বেশি যাতায়াত করতে দেখা যায়; যদিও লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির আশংকা বেশি, তবুও মানুষ এই নৌ-পথেই যাতায়াতে স্বাছন্দবোধ করে। এ পথে প্রতি বছর লঞ্চডুবি ও নৌ-দূর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাও অনেক। এছাড়াও বন্যাজনিত কারণে অনেক মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় এবং শিশু মৃত্যুর হার এখানেও অনেক বেশি। প্রতি বছর কাজের সন্ধানে এ দেশের অনেক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার খবর এখন প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। পরিসংখ্যানের দিক থেকে এখানেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। সব মিলিয়ে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, এর মধ্যে ৪০ শতাংশই শিশু। মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশই ঘটে বাংলাদেশের মত মধ্যম আয় ও নিম্ন আয়ের দেশ সমূহে। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশেই পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন লোক পানিতে ডুবে মারা যায় বলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টিই হলো শিশু। এ মৃত্যুকে মহামারী বলে চিহ্নিত করতে এবং তা প্রতিরোধ করতে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে নির্দিষ্ট একটা দিবসের দাবী করে আসছিল বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ড। দিবসটি ঘোষণার জন্য বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডসহ আরও ৭৯টি সদস্য রাষ্ট্রের দাবীর প্রেক্ষিতে ২৮ এপ্রিল,২০২১ তা আলোর মুখ দেখে।জাতিসংঘ প্রথমবারের মত পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস পালনে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবার ফাতেমা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বিলিতে এ দাবীটি উপস্থাপন করেন। তার উপস্থাপনায় জানানো হয় বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যু ও অপুষ্টির জন্য যত লোক মারা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায় পানিতে ডুবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বে শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। যা-প্রতিরোধ করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি রেজিউলেশন জরুরী ছিল।যা বিশ্বের সকল দেশকে একই অবকাঠামোতে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে।তাই, জাতিসংঘ ২৮ এপ্রিল ২০২১ তারিখ প্রতিবছর ২৫ জুলাই পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস পালনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আয়ারল্যান্ড সরকার এ প্রচেষ্টায় অংশীদার হয়ে এ দাবী পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এজন্য জাতিসংঘ সহযোদ্ধা আয়ারল্যান্ডসহ ৭৯টি সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘে বাংলাদেশের সম্মানিত রাষ্ট্রদূতসহ স্থায়ী প্রতিনিধিকে কৃতজ্ঞতা জানান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ(সিআইপিআরবি)।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ সমীক্ষা মোতাবেক ৫ বছরের কম বয়সের শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো পানিতে ডুবে যাওয়া। কিন্তু এই মৃত্যু স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় কম খরচে প্রতিরোধযোগ্য, যা-গবেষণায় প্রমাণ করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ(সিআইপিআরবি)। এ গবেষণা সংস্থাটি ২০০৫ সাল থেকে পানিতে ডুবে যাওয়া মৃত্যু প্রতিরোধ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে পাঁচ বছরের বয়সীদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, ‘আঁচল’ পানিতে ডুবে যাওয়া শিশু মৃত্যু রোধে ৮২ শতাংশ সফল হয়েছে। অন্যদিকে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার শিখিয়ে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে ৯৬ শতাংশ।
তাই, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে এই দুই উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ(সিআইপিআরবি) এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ডঃ আমিনুর রহমান এবং ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার এর ডাইরেক্টর। ডঃ আমিনুর রহমান বলেন, এখন থেকে প্রতি বছর ২৫শে জুলাই পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস পালনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এ বিষয়ে ধারণা নিয়ে অধিক সচেতন হবেন এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবেন ও এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন।
পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবসটি পালনের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ ত্বরান্বিত হবে। ফলে কমে আসতে পারে এভাবে ঘটে যাওয়া অনাকাংখিত মৃত্যুর হার। তাই দিবসটি পালনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।






















