০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

পদ্মার গর্ভে ১৭০টি পরিবারের বাড়ি-ঘর, হুমকীর মুখে ১৩০ পরিবার

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের সর্বনাশা পদ্মার ভাঙ্গন তীব্র হতে তীব্রতর হচ্ছে। এতে করে এলাকার মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পাঁকা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের চরলক্ষীপুর (প্রায় ৮ পাড়া মিলে একটি গ্রাম) গ্রামের প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে বসবাস করা ৩’শ পরিবারের মধ্যে প্রায় ১৭০টি পরিবারের বসতভিটা পদ্মা নদীর গর্ভে চলে গেছে। আর প্রায় ১৩০টি পরিবার চরম হুমকীর মধ্যে রয়েছে। নদী ভাঙ্গনে পদ্মার গর্ভে প্রায় ৮ হাজার বিঘা আম বাগান, বাঁশ বাগান ও ফসলী জমি। বিলীন হয়েছে ৭/৮টি ওয়াক্তিয়া মসজিদ ও একটি জামে মসজিদ, গোরস্থানসহ অনেক কিছু।

সরজমিনে এলাকায় গিয়ে চরলক্ষীপুর জ্যাটপাড়া গ্রামের মৃত শাম মোহাম্মদ আলীর ছেলে ৯২ বছর বয়সী সহিমুদ্দিন মড়ল জানান, এবার দিয়ে আমার জীবনে ৫বার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছি। এবার শেষবারের মত ভাঙ্গনের কবলে বোগলাউড়ি গ্রামের নজরুল ইসলাম হাজির বাড়ির উঠানে ছোট একখান খুঁপড়ি তুলে বাস করছি। এর আগে বার বার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে শেষে চরলক্ষীপুর জ্যাট পাড়া গ্রামে একজনের সামান্য কয়েক কাঠা জমি বর্গা নিয়ে কোন রকমে দিনাদিপাত করছিলাম। সেটাও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এক সময় আমি গ্রামের মড়ল ছিলাম। আমার ৩০বিঘা জমি ছিল, বাড়ি-ঘর, সন্তান ছিল। এখন আমি বাস্ত হারা। নেই পেটে খাবার, পরনে নেই কাপড়, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। অসুস্থ মানুষ, ভিক্ষা করতেও যেতে পারি না। তিন দিন থেকে পাড়ার লোকজন রান্না করা সামান্য কিছু খাবার দিচ্ছে তা দিয়ে স্বামী-স্ত্রী খেয়ে কোন রকমে দিন পার করছি। আমার ৯ ছেলে মেয়ে থেকেও আজ কেউ নেই। সবই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করে না।

শত বছরের লবন দাসী রবিদাস বলেন, হামার (আমার) কেহ ন্যাই। হামি (আমি) ওই গায়ের (গ্রামের) মানুষের বাড়তে বাড়তে (বাড়িতে বাড়িতে) খ্যাইটা (শ্রমদিয়ে) খাইতুন (খেতাম)। ওরা সবার বাড়ি নদীতে পড়ে গেছে। এখন ওরঘে থাকার জায়গা নাই, হামি কোনঠে থাকবো? তাই চলে আইনু বোগলা উড়িতে। শুধু সহিমুদ্দিনই ও লবন দাসী রবিদাসই নয়, এ গ্রামের আরো শতধিক পরিবারের একই অবস্থা।

সরজমিনে দেখা গেছে, পদ্মার ভাঙ্গন কবলিত এলাকার শতধিক মানুষ তাদের বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে নৌকা যোগে নদীর কেউ কেউ বোগড়াউড়ি ঘাট এলাকায় অন্যের জমিতে, কেউ কেউ দূর্লভপুর ইউনিয়নের বেড়ী বাধের দুইদিকে অস্থায়ী ভাবে খোলা আকাশের নীচে বসবাস বাস করছে। কেউ কেউ কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরী করা নিয়ে ব্যস্ত আছে। আবার কেউ কেউ আবার আশ্রয় না পেয়ে ঘাট এলাকায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

চরলক্ষীপুর গ্রামের মোশারফ হোসেন (৬০), আলাউদ্দিন, মিঠু, জিয়ারুল ইসলাম, পারুল ইসলাম, সুমন, শেফালী বেগম, জোসনা বেগম, সাদিকুল ইসলাম, আতাবুর রহমানসহ প্রায় ৫০/৬০জন নারী-পুরুষ জানান, গত দেড় মাস থেকেই চরলক্ষীপুর গ্রামের জ্যাটপাড়া, ক্যাইঠাপাড়া, মড়ল পাড়া, ডাক্তার পাড়া, বহরাপাড়া, কলিমুদ্দিন বিশ্বাসের পাড়ায় পদ্মা নদীর ভাঙ্গন চলছে। তার মধ্যে কয়েক দিনের ভাঙ্গন খুব জোরে শুরু হয়েছে। আমরা কোন উপায় না পেয়ে বোগলাউড়ি ঘাটের দুই পাড়ে ও দূর্লভপুর ইউনিয়নের বেড়ী বাধের দুই পাশে অস্থায়ী ভাবে মাথা গোজার ঠাঁই নেয়ার চেষ্টা করছি।

তারা আরো বলেন, আমাদের এ বিপদের সময় কোন নেতা ও মেম্বার-চেয়ারম্যান মুখ দেখাতেও আসেনি। সহযোগিতা করা তো দূরের কথা। শুধু আমাদের এলাকার সন্তান ও পাঁকা ইউনিয়ন আওয়ামীগের সহ-সভাপতি আব্দুল বারী আমাদের সাথে থেকে বাড়ি-ঘর সরানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন।

এব্যাপারে আওয়ামীলীগ নেতা ও চরলক্ষীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল বারী জানান, বর্তমানে চরলক্ষীপুর গ্রামের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে ৩’শ পরিবারের মধ্যে ১৭০টি পরিবারের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আরো ১৩০টি পরিবার হুমকীর মুখে রয়েছে। নদী ভাঙ্গন এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আমি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব আল রাব্বী ও উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসককে সাথে নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ আসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

চঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ময়েজ উদ্দিন বলেন, চরলক্ষীপুর এলাকার ভাঙ্গন সম্পর্কে জানলাম, দ্রত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ জনের মৃত্যু

পদ্মার গর্ভে ১৭০টি পরিবারের বাড়ি-ঘর, হুমকীর মুখে ১৩০ পরিবার

প্রকাশিত : ০৭:০৭:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের সর্বনাশা পদ্মার ভাঙ্গন তীব্র হতে তীব্রতর হচ্ছে। এতে করে এলাকার মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পাঁকা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের চরলক্ষীপুর (প্রায় ৮ পাড়া মিলে একটি গ্রাম) গ্রামের প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে বসবাস করা ৩’শ পরিবারের মধ্যে প্রায় ১৭০টি পরিবারের বসতভিটা পদ্মা নদীর গর্ভে চলে গেছে। আর প্রায় ১৩০টি পরিবার চরম হুমকীর মধ্যে রয়েছে। নদী ভাঙ্গনে পদ্মার গর্ভে প্রায় ৮ হাজার বিঘা আম বাগান, বাঁশ বাগান ও ফসলী জমি। বিলীন হয়েছে ৭/৮টি ওয়াক্তিয়া মসজিদ ও একটি জামে মসজিদ, গোরস্থানসহ অনেক কিছু।

সরজমিনে এলাকায় গিয়ে চরলক্ষীপুর জ্যাটপাড়া গ্রামের মৃত শাম মোহাম্মদ আলীর ছেলে ৯২ বছর বয়সী সহিমুদ্দিন মড়ল জানান, এবার দিয়ে আমার জীবনে ৫বার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছি। এবার শেষবারের মত ভাঙ্গনের কবলে বোগলাউড়ি গ্রামের নজরুল ইসলাম হাজির বাড়ির উঠানে ছোট একখান খুঁপড়ি তুলে বাস করছি। এর আগে বার বার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে শেষে চরলক্ষীপুর জ্যাট পাড়া গ্রামে একজনের সামান্য কয়েক কাঠা জমি বর্গা নিয়ে কোন রকমে দিনাদিপাত করছিলাম। সেটাও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এক সময় আমি গ্রামের মড়ল ছিলাম। আমার ৩০বিঘা জমি ছিল, বাড়ি-ঘর, সন্তান ছিল। এখন আমি বাস্ত হারা। নেই পেটে খাবার, পরনে নেই কাপড়, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। অসুস্থ মানুষ, ভিক্ষা করতেও যেতে পারি না। তিন দিন থেকে পাড়ার লোকজন রান্না করা সামান্য কিছু খাবার দিচ্ছে তা দিয়ে স্বামী-স্ত্রী খেয়ে কোন রকমে দিন পার করছি। আমার ৯ ছেলে মেয়ে থেকেও আজ কেউ নেই। সবই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করে না।

শত বছরের লবন দাসী রবিদাস বলেন, হামার (আমার) কেহ ন্যাই। হামি (আমি) ওই গায়ের (গ্রামের) মানুষের বাড়তে বাড়তে (বাড়িতে বাড়িতে) খ্যাইটা (শ্রমদিয়ে) খাইতুন (খেতাম)। ওরা সবার বাড়ি নদীতে পড়ে গেছে। এখন ওরঘে থাকার জায়গা নাই, হামি কোনঠে থাকবো? তাই চলে আইনু বোগলা উড়িতে। শুধু সহিমুদ্দিনই ও লবন দাসী রবিদাসই নয়, এ গ্রামের আরো শতধিক পরিবারের একই অবস্থা।

সরজমিনে দেখা গেছে, পদ্মার ভাঙ্গন কবলিত এলাকার শতধিক মানুষ তাদের বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে নৌকা যোগে নদীর কেউ কেউ বোগড়াউড়ি ঘাট এলাকায় অন্যের জমিতে, কেউ কেউ দূর্লভপুর ইউনিয়নের বেড়ী বাধের দুইদিকে অস্থায়ী ভাবে খোলা আকাশের নীচে বসবাস বাস করছে। কেউ কেউ কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরী করা নিয়ে ব্যস্ত আছে। আবার কেউ কেউ আবার আশ্রয় না পেয়ে ঘাট এলাকায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

চরলক্ষীপুর গ্রামের মোশারফ হোসেন (৬০), আলাউদ্দিন, মিঠু, জিয়ারুল ইসলাম, পারুল ইসলাম, সুমন, শেফালী বেগম, জোসনা বেগম, সাদিকুল ইসলাম, আতাবুর রহমানসহ প্রায় ৫০/৬০জন নারী-পুরুষ জানান, গত দেড় মাস থেকেই চরলক্ষীপুর গ্রামের জ্যাটপাড়া, ক্যাইঠাপাড়া, মড়ল পাড়া, ডাক্তার পাড়া, বহরাপাড়া, কলিমুদ্দিন বিশ্বাসের পাড়ায় পদ্মা নদীর ভাঙ্গন চলছে। তার মধ্যে কয়েক দিনের ভাঙ্গন খুব জোরে শুরু হয়েছে। আমরা কোন উপায় না পেয়ে বোগলাউড়ি ঘাটের দুই পাড়ে ও দূর্লভপুর ইউনিয়নের বেড়ী বাধের দুই পাশে অস্থায়ী ভাবে মাথা গোজার ঠাঁই নেয়ার চেষ্টা করছি।

তারা আরো বলেন, আমাদের এ বিপদের সময় কোন নেতা ও মেম্বার-চেয়ারম্যান মুখ দেখাতেও আসেনি। সহযোগিতা করা তো দূরের কথা। শুধু আমাদের এলাকার সন্তান ও পাঁকা ইউনিয়ন আওয়ামীগের সহ-সভাপতি আব্দুল বারী আমাদের সাথে থেকে বাড়ি-ঘর সরানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন।

এব্যাপারে আওয়ামীলীগ নেতা ও চরলক্ষীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল বারী জানান, বর্তমানে চরলক্ষীপুর গ্রামের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে ৩’শ পরিবারের মধ্যে ১৭০টি পরিবারের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আরো ১৩০টি পরিবার হুমকীর মুখে রয়েছে। নদী ভাঙ্গন এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আমি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব আল রাব্বী ও উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসককে সাথে নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ আসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

চঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ময়েজ উদ্দিন বলেন, চরলক্ষীপুর এলাকার ভাঙ্গন সম্পর্কে জানলাম, দ্রত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর