০৬:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম আজ

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর হমানের ৯৯তম জন্মদিন শনিবার (১৭ মার্চ)। ইতিহাসের এ মহানায়ক ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার মহানায়কের এ জন্ম দিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বার বার কারাবরণ করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এই বয়সী অনেক রাজনীতিক এবং বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব এবং স্ব-স্ব কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকার নজির থাকলেও আমাদের জাতির পিতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ৫৫ বছর বয়সে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

জাতি যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে। দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়াতেও প্রতিবারের মত বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণসহ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সে শেখ রাসেল স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্তকরণ, ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ শিশু গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, সেলাই মেশিন বিতরণ, ‘উঠব জেগে, ছুটব বেগে’ শীর্ষক ভিডিও প্রদর্শন, শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান, বইমেলা উদ্বোধন ও শিশুদের আঁকা আমার ভাবনায় ৭ই মার্চ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করবেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী দূতাবাসসমূহে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

শনিবার সারাদিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ড বাজানো হবে। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে সারাদেশে বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম গ্রেফতার হন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তিনি কারারুদ্ধ হন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে ঢাকায় সেক্রেটারিয়েট ভবনের সামনে পিকেটিং করতে গিয়েই তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত এভাবে তিনি বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হন।

পাকিস্তানি শাসনের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছরই বঙ্গবন্ধুকে কারাজীবন কাটাতে হয়েছিল। কখনো একই বছরে তিনবার, কখনো এক সাথে তিন বছর (১৯৬৬-১৯৬৯খ্রি.) কারাভোগ করেছেন। আবার কখনো ১৭-১৮ মাস বন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়ে জেলগেটে পুনরায় গ্রেফতার হন। ১৯৪৮-১৯৫৪ সালের মধ্যে এক নাগাড়ে ২৭ মাস পর্যন্ত তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।

3

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিলের পর তিনিই ঐ মন্ত্রিসভার একমাত্র সদস্য ছিলেন যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করে সকল প্রকার রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৯৫৮ সালের ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় থাকার পর তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেটে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে তিনি মুক্তি লাভ করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালের ১৮ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় গ্রেফফতার করা হয়।

১৯৬৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। ঐ মামলায় তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

ঐতিহাসিক ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তিনি গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ঐ বছর তিনি প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেফতার হন। ৮ মে নারায়ণগঞ্জ পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।

download

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারি তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়।

১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য আসামীদের মুক্তি প্রদান করতে বাধ্য হয়।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসন লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গড়িমসি করে।

এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরী বৈঠকে ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে সাড়া দেয়। টুঙ্গিপাড়ার সেই অজপাড়া গাঁয়ে জন্ম নেয়া এই শেখ মুজিবই একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেন। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে তিনি বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। যার বহি:প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। ৭১ এর ৭ মার্চ তিনি ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।

images (1)

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তি সংগ্রাম, তোমাদের যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়েই প্রস্তুত থাক, আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো’ -বঙ্গবন্ধুর এই চূড়ান্ত আহ্বানই জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে শক্তি ও সাহস জোগায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ আমলে শৈশব থেকেই শেখ মুজিব জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতন দেখেছেন। মানুষের দুঃখ, কষ্ট দেখে তাদের মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের তৃতীয় সন্তান। ৭ বছর বয়সে তিনি পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন।

১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই সময়ে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।এই সময়ে তিনি হোসেন সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শান্তি স্থাপনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসম সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

ভ্রান্ত দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরে এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তথা বাঙালি জাতি প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। তার উপর নেমে আসে জেল-জুলুম নির্যাতন। রাজনৈতিক জীবনে এক যুগেরও বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। দুইবার তিনি ফাঁসির কাষ্ঠে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, ১৮ বার কারাবরণ করেছেন। পাকিস্তানি শাসক চক্রের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে সব আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি করেছেন। ১৯৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬ আর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ৭০-এর নির্বাচনে বিজয় সবই জাতির সংগ্রামী ইতিহাসের একেকটি মাইলফলক। আর এই সংগ্রামের নেতৃত্ব ও প্রেরণার উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম আজ

প্রকাশিত : ০৭:০৬:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ মার্চ ২০১৮

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর হমানের ৯৯তম জন্মদিন শনিবার (১৭ মার্চ)। ইতিহাসের এ মহানায়ক ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার মহানায়কের এ জন্ম দিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বার বার কারাবরণ করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এই বয়সী অনেক রাজনীতিক এবং বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব এবং স্ব-স্ব কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকার নজির থাকলেও আমাদের জাতির পিতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ৫৫ বছর বয়সে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

জাতি যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে। দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়াতেও প্রতিবারের মত বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণসহ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সে শেখ রাসেল স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্তকরণ, ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ শিশু গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, সেলাই মেশিন বিতরণ, ‘উঠব জেগে, ছুটব বেগে’ শীর্ষক ভিডিও প্রদর্শন, শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান, বইমেলা উদ্বোধন ও শিশুদের আঁকা আমার ভাবনায় ৭ই মার্চ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করবেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী দূতাবাসসমূহে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

শনিবার সারাদিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ড বাজানো হবে। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে সারাদেশে বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম গ্রেফতার হন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তিনি কারারুদ্ধ হন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে ঢাকায় সেক্রেটারিয়েট ভবনের সামনে পিকেটিং করতে গিয়েই তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত এভাবে তিনি বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হন।

পাকিস্তানি শাসনের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছরই বঙ্গবন্ধুকে কারাজীবন কাটাতে হয়েছিল। কখনো একই বছরে তিনবার, কখনো এক সাথে তিন বছর (১৯৬৬-১৯৬৯খ্রি.) কারাভোগ করেছেন। আবার কখনো ১৭-১৮ মাস বন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়ে জেলগেটে পুনরায় গ্রেফতার হন। ১৯৪৮-১৯৫৪ সালের মধ্যে এক নাগাড়ে ২৭ মাস পর্যন্ত তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।

3

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিলের পর তিনিই ঐ মন্ত্রিসভার একমাত্র সদস্য ছিলেন যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করে সকল প্রকার রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৯৫৮ সালের ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় থাকার পর তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেটে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে তিনি মুক্তি লাভ করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালের ১৮ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় গ্রেফফতার করা হয়।

১৯৬৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। ঐ মামলায় তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

ঐতিহাসিক ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তিনি গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ঐ বছর তিনি প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেফতার হন। ৮ মে নারায়ণগঞ্জ পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।

download

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারি তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়।

১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য আসামীদের মুক্তি প্রদান করতে বাধ্য হয়।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসন লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গড়িমসি করে।

এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরী বৈঠকে ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে সাড়া দেয়। টুঙ্গিপাড়ার সেই অজপাড়া গাঁয়ে জন্ম নেয়া এই শেখ মুজিবই একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেন। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে তিনি বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। যার বহি:প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। ৭১ এর ৭ মার্চ তিনি ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।

images (1)

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তি সংগ্রাম, তোমাদের যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়েই প্রস্তুত থাক, আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো’ -বঙ্গবন্ধুর এই চূড়ান্ত আহ্বানই জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে শক্তি ও সাহস জোগায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ আমলে শৈশব থেকেই শেখ মুজিব জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতন দেখেছেন। মানুষের দুঃখ, কষ্ট দেখে তাদের মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের তৃতীয় সন্তান। ৭ বছর বয়সে তিনি পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন।

১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই সময়ে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।এই সময়ে তিনি হোসেন সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শান্তি স্থাপনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসম সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

ভ্রান্ত দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরে এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তথা বাঙালি জাতি প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। তার উপর নেমে আসে জেল-জুলুম নির্যাতন। রাজনৈতিক জীবনে এক যুগেরও বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। দুইবার তিনি ফাঁসির কাষ্ঠে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, ১৮ বার কারাবরণ করেছেন। পাকিস্তানি শাসক চক্রের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে সব আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি করেছেন। ১৯৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬ আর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ৭০-এর নির্বাচনে বিজয় সবই জাতির সংগ্রামী ইতিহাসের একেকটি মাইলফলক। আর এই সংগ্রামের নেতৃত্ব ও প্রেরণার উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।