১১:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

গাজীপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র গণশুনানীতে প্রায় ১’শ অভিযোগ

গাজীপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র গণশুনানীতে প্রায় ১’শ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। দুদকের আওতাধীন ১১টি আমলযোগ্য বিষয়ের মধ্যে ৬টি প্রতিরোধযোগ্য এবং বাকিগুলো প্রতিকারযোগ্য। প্রতিরোধযোগ্য বিষয়গুলো আমরা শোনে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী বিভাগের জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা বা নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। প্রতিকারযোগ্য বিষয়গুলো দুদক অনুসন্ধানের জন্য নোট নিয়েছে। তবে প্রতিরোধযোগ্য বিষয়গুলোও আমরা ওয়াচে রাখব। নিষ্পত্তি না হলে দুদকের হস্তক্ষেপে তা নিষ্পত্তি করা হবে। গাজীপুরে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র সচিব মাহবুব হোসেন এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, এর আগে বিভিন্ন জেলায় দুদকের ১৪৮টি গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গাজীপুর নিয়ে দুদকের ১৪৯টি গণশুনী অনুষ্ঠিত হলো। বিকেল সাড়ে ৪টায় গণশুনানীর সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

গণশুনানীতে দুদক আয়োজিত ওই এসব কথা বলেন। সোমবার (৩০ জানুয়ারী) সকাল ১০টায় গাজীপুরের বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান সভাপতি ও সঞ্চালনার দায়িত্বপালন করেন।

গণশুনানীতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, দলিল নিবন্ধন, ভূমি, শিক্ষা, রেলওয়ে, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পাসপোর্ট, বন বিভাগসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরের সেবাগ্রহীতাগণ তাদের নানা ধরণের অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে অভিযোগগুলোর মধ্যে ভূমি সংক্রান্ত ২৪টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

মহানগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সামসুদ্দীন বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকগণ ব্যবস্থাপত্রে যেসব ওষুধের নাম লিখে দেন তার সবগুলো ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। হাসপাতাল থেকে বিনামুল্যে পাওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধারা হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা পান না।

একই বিষয় সমর্থন করে মজিবুর রহমান বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রচুর দালাল। যে কোনো সেবা নিতে গেলে দালালের মুখোমুখি হতে হয়। একটা সেবা নিতে গেলে আগেই দালালেরা টাকা দাবী করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী ক্লিনিকের ঠিকানায় ধরে নিয়ে যায়। রক্তের দুটি টেস্ট ও একটি বুকের টেস্টের জন্য ক্লিনিকে ১২’শ টাকা দিতে হয়।

এ প্রসঙ্গে ওই হাসপাতালের পরিচালক ডা. তপন কুমার সরকার বলেন, প্রতিদিন দেড় থেকে ২ হাজার বহিরাগত রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে আগে থেকেই রক্তের স্বাভাবিক পরীক্ষা নিরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। ৩০-৪০ ভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।

আবু সালেক স্বপন বলেন, পাসপোর্ট অফিসে আমার মায়ের ফিঙ্গারপ্রিন্ট না নেয়ায় মাসের পর মাস ঘুরছি, কিন্তু পাসপোর্ট করতে পারছি না। আবু বকর সিদ্দিক বলেন, আমার কাছে ওই অফিসের একজন লোক ২০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছেন একটি পাসপোর্ট করার জন্য। কিন্তু তিনি ওই লোকের নাম পরিচয় বলতে পারেননি।

বেলাল হোসেন বলেন, ভুতুরে বিল, প্রতি মাসে মিটারচার্জ বাবাদ ১০ টাকা ও ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬০ টাকা নেওয়া হয়। আমরা বেতন পাই আট তারিখের পর। অথচ বিল পরিশোধের শেষ তারিখ দেওয়া হয় ২৮ তারিখ। ডুয়েল লাইন সোর্স ও হুক ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য জরিমানা করা হয় ৫/৬ লাখ টাকা। অথচ প্রকাশ্যে হুক লাগিয়ে ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে জরিমানা করা হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা। একই এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহা ব্যবস্থাপক পি কে দাস বলেন, মিটারের দাম দুই হাজার টাকার বেশি। এটি সংযোগের সময় মিটার ও ডিমান্ড চার্জের কোনো ফি নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র ২ কিলোওয়াটের জন্য ৮’শ এবং পরবর্তী প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ৬’শ টাকা করে চার্জ নেওয়া হয়। বিদ্যুত ব্যবহারে অনিয়মের জন্য মোবাইল কোর্ট বা পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাগণ জরিমানা আদায় করে থাকেন। বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় না।

মনিরুল ইসলাম, রাকিব হোসেন ও ফুল মিয়া বলেন, নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম সংশোধনের জন্য অফিসের লোকদের আট’শ টাকা দিতে হয়। আমার আবেদন অন্যজন পূরণ করে সেখানে স্বাক্ষর নিয়ে সেরূপ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করা হয়। ভুল থাকলে তার জন্য আমরা কেন টাকা খরচ করব। তারা দাবী করেন ৯০ ভাগ লোকের এরকম হয়রানি শিকার হতে হয়। তবে অফিসের কার কাছে টাকা দিয়েছেন তা তারা চিহ্নিত করতে পারেনি। পরে জেলা নির্বাচন অফিসার ইস্তাফিজুল হক ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনে অফিসের লোক হিসেবে দালালদের ভূমিকা চিহ্নিত হয়। এ ক্ষেত্রে সকলকে সচেতন থাকার জন্য দুদক সচিব সরাসরি অফিসারের সাথে সাক্ষাতের পরামর্শ দেন।

প্রকৌশলী মোকাদ্দেস বিল্লাহ বলেন, জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনে খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। স্টেশনের আশপাশের ফাঁকা জায়গা অটোরিক্সার দখলে থাকায় যাত্রীরা স্বাভাবিক যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। ডাবল লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রী হয়রানির শিকার হয়।

এ ব্যাপারে জয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার রেজাউল করিম বলেন, আগামী সাতদিনের মধ্যে টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর ডাবল লাইন খোলে দেওয়া হবে। অন্যান্য সুবিধাগুলো একইসাথে উন্নয়ন করা হবে।

তসলিম, রফিক, হাসান ইউসুফ খান, ইয়াকুব আলীসহ ২৪ জন ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ করেন। তারা দাবী করেন, গাজীপুর পৌর ভূমি অফিস, টঙ্গী ভূমি অফিস, কাপাসিয়ার সনমানিয়া, সালনা ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন ভূমি অফিসে নামজারী-জমাভাগ, পর্চা উত্তোলন, একজনের জমি আরেকজনের নামে নামজারী ও জমাভাগ করে দেয়া, নির্ধারিত মৌজার নির্ধারিত পরিমানের জমি থাকার পরও একই দাগে অধিক পরিমাণ জমি নামজারীর জামাভাগ করে দেয়া হয়। এতে জমির মালিকদের মধ্যে দ্ব›দ্ব কলহ সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীরা সনমানিয়া ভূমি অফিসের কর্মচারী শচীন কুমার রাজবংশী, টঙ্গী ভূমি অফিসের ইকবাল, সাইফুল, গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসের রুমির নাম উল্লেখ করেন। ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্মে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি হতে হয় বলে জানান তারা।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নোট নেন। একইসময় বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর নাম নোট নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দ্রæততম সময় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত বড় অভিযোগের ব্যাপাারে অভিযোগকারীদের আগামী বুধবার তাঁর কার্যালয়ে নথিপত্রসহ উপস্থিত থাকার পরার্মশ দেন। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের অনেকেই ভূমি অফিসের কর্মচারী নয়। তারা দালাল হয়ে থাকতে পারে। দালালদের ব্যাপারে তিনি সহকারী কমিশনারদের নির্দেশনা দেন।

এছাড়াও ডিসি বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ভূমি অফিসে দালালদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দালালেরা রোগীদের মিসগাইড করে থাকে। শিডিউল করে ভ্রামম্যান আদালত পরিচালনা করা যাবে না। যে কোনো ভুক্তভোগী দুর্ভোগের শিকার হওয়ার সাথে সাথে ফোন দিলে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার আশ^াস দেন। এ ক্ষেত্রে সকলকে সচেতন হওয়ার আহবান জানান। ডিসি আরও বলেন, বিআরটি অফিসের দালালও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমার কাছে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তিনি কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রæতি দেন।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে গণশুনানী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে দুদকের মহাপরিচালক আকতার হোসেন, গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী শফিকুল ইসলাম, গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার আবু তোরাব মো. শামসুর রহমান, দুদকের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মোরশেদ আলম, গাজীপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এম এ বারী, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিকসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

সুইহারী আশ্রম এর দূর্গাপূজা পুর্নমিলনীতে এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম

গাজীপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র গণশুনানীতে প্রায় ১’শ অভিযোগ

প্রকাশিত : ০৭:১৪:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩

গাজীপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র গণশুনানীতে প্রায় ১’শ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। দুদকের আওতাধীন ১১টি আমলযোগ্য বিষয়ের মধ্যে ৬টি প্রতিরোধযোগ্য এবং বাকিগুলো প্রতিকারযোগ্য। প্রতিরোধযোগ্য বিষয়গুলো আমরা শোনে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী বিভাগের জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা বা নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। প্রতিকারযোগ্য বিষয়গুলো দুদক অনুসন্ধানের জন্য নোট নিয়েছে। তবে প্রতিরোধযোগ্য বিষয়গুলোও আমরা ওয়াচে রাখব। নিষ্পত্তি না হলে দুদকের হস্তক্ষেপে তা নিষ্পত্তি করা হবে। গাজীপুরে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র সচিব মাহবুব হোসেন এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, এর আগে বিভিন্ন জেলায় দুদকের ১৪৮টি গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গাজীপুর নিয়ে দুদকের ১৪৯টি গণশুনী অনুষ্ঠিত হলো। বিকেল সাড়ে ৪টায় গণশুনানীর সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

গণশুনানীতে দুদক আয়োজিত ওই এসব কথা বলেন। সোমবার (৩০ জানুয়ারী) সকাল ১০টায় গাজীপুরের বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান সভাপতি ও সঞ্চালনার দায়িত্বপালন করেন।

গণশুনানীতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, দলিল নিবন্ধন, ভূমি, শিক্ষা, রেলওয়ে, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পাসপোর্ট, বন বিভাগসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরের সেবাগ্রহীতাগণ তাদের নানা ধরণের অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে অভিযোগগুলোর মধ্যে ভূমি সংক্রান্ত ২৪টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

মহানগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সামসুদ্দীন বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকগণ ব্যবস্থাপত্রে যেসব ওষুধের নাম লিখে দেন তার সবগুলো ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। হাসপাতাল থেকে বিনামুল্যে পাওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধারা হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা পান না।

একই বিষয় সমর্থন করে মজিবুর রহমান বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রচুর দালাল। যে কোনো সেবা নিতে গেলে দালালের মুখোমুখি হতে হয়। একটা সেবা নিতে গেলে আগেই দালালেরা টাকা দাবী করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী ক্লিনিকের ঠিকানায় ধরে নিয়ে যায়। রক্তের দুটি টেস্ট ও একটি বুকের টেস্টের জন্য ক্লিনিকে ১২’শ টাকা দিতে হয়।

এ প্রসঙ্গে ওই হাসপাতালের পরিচালক ডা. তপন কুমার সরকার বলেন, প্রতিদিন দেড় থেকে ২ হাজার বহিরাগত রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে আগে থেকেই রক্তের স্বাভাবিক পরীক্ষা নিরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। ৩০-৪০ ভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।

আবু সালেক স্বপন বলেন, পাসপোর্ট অফিসে আমার মায়ের ফিঙ্গারপ্রিন্ট না নেয়ায় মাসের পর মাস ঘুরছি, কিন্তু পাসপোর্ট করতে পারছি না। আবু বকর সিদ্দিক বলেন, আমার কাছে ওই অফিসের একজন লোক ২০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছেন একটি পাসপোর্ট করার জন্য। কিন্তু তিনি ওই লোকের নাম পরিচয় বলতে পারেননি।

বেলাল হোসেন বলেন, ভুতুরে বিল, প্রতি মাসে মিটারচার্জ বাবাদ ১০ টাকা ও ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬০ টাকা নেওয়া হয়। আমরা বেতন পাই আট তারিখের পর। অথচ বিল পরিশোধের শেষ তারিখ দেওয়া হয় ২৮ তারিখ। ডুয়েল লাইন সোর্স ও হুক ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য জরিমানা করা হয় ৫/৬ লাখ টাকা। অথচ প্রকাশ্যে হুক লাগিয়ে ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে জরিমানা করা হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা। একই এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহা ব্যবস্থাপক পি কে দাস বলেন, মিটারের দাম দুই হাজার টাকার বেশি। এটি সংযোগের সময় মিটার ও ডিমান্ড চার্জের কোনো ফি নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র ২ কিলোওয়াটের জন্য ৮’শ এবং পরবর্তী প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ৬’শ টাকা করে চার্জ নেওয়া হয়। বিদ্যুত ব্যবহারে অনিয়মের জন্য মোবাইল কোর্ট বা পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাগণ জরিমানা আদায় করে থাকেন। বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় না।

মনিরুল ইসলাম, রাকিব হোসেন ও ফুল মিয়া বলেন, নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম সংশোধনের জন্য অফিসের লোকদের আট’শ টাকা দিতে হয়। আমার আবেদন অন্যজন পূরণ করে সেখানে স্বাক্ষর নিয়ে সেরূপ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করা হয়। ভুল থাকলে তার জন্য আমরা কেন টাকা খরচ করব। তারা দাবী করেন ৯০ ভাগ লোকের এরকম হয়রানি শিকার হতে হয়। তবে অফিসের কার কাছে টাকা দিয়েছেন তা তারা চিহ্নিত করতে পারেনি। পরে জেলা নির্বাচন অফিসার ইস্তাফিজুল হক ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনে অফিসের লোক হিসেবে দালালদের ভূমিকা চিহ্নিত হয়। এ ক্ষেত্রে সকলকে সচেতন থাকার জন্য দুদক সচিব সরাসরি অফিসারের সাথে সাক্ষাতের পরামর্শ দেন।

প্রকৌশলী মোকাদ্দেস বিল্লাহ বলেন, জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনে খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। স্টেশনের আশপাশের ফাঁকা জায়গা অটোরিক্সার দখলে থাকায় যাত্রীরা স্বাভাবিক যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। ডাবল লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রী হয়রানির শিকার হয়।

এ ব্যাপারে জয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার রেজাউল করিম বলেন, আগামী সাতদিনের মধ্যে টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর ডাবল লাইন খোলে দেওয়া হবে। অন্যান্য সুবিধাগুলো একইসাথে উন্নয়ন করা হবে।

তসলিম, রফিক, হাসান ইউসুফ খান, ইয়াকুব আলীসহ ২৪ জন ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ করেন। তারা দাবী করেন, গাজীপুর পৌর ভূমি অফিস, টঙ্গী ভূমি অফিস, কাপাসিয়ার সনমানিয়া, সালনা ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন ভূমি অফিসে নামজারী-জমাভাগ, পর্চা উত্তোলন, একজনের জমি আরেকজনের নামে নামজারী ও জমাভাগ করে দেয়া, নির্ধারিত মৌজার নির্ধারিত পরিমানের জমি থাকার পরও একই দাগে অধিক পরিমাণ জমি নামজারীর জামাভাগ করে দেয়া হয়। এতে জমির মালিকদের মধ্যে দ্ব›দ্ব কলহ সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীরা সনমানিয়া ভূমি অফিসের কর্মচারী শচীন কুমার রাজবংশী, টঙ্গী ভূমি অফিসের ইকবাল, সাইফুল, গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসের রুমির নাম উল্লেখ করেন। ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্মে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি হতে হয় বলে জানান তারা।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নোট নেন। একইসময় বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর নাম নোট নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দ্রæততম সময় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত বড় অভিযোগের ব্যাপাারে অভিযোগকারীদের আগামী বুধবার তাঁর কার্যালয়ে নথিপত্রসহ উপস্থিত থাকার পরার্মশ দেন। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের অনেকেই ভূমি অফিসের কর্মচারী নয়। তারা দালাল হয়ে থাকতে পারে। দালালদের ব্যাপারে তিনি সহকারী কমিশনারদের নির্দেশনা দেন।

এছাড়াও ডিসি বলেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ভূমি অফিসে দালালদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দালালেরা রোগীদের মিসগাইড করে থাকে। শিডিউল করে ভ্রামম্যান আদালত পরিচালনা করা যাবে না। যে কোনো ভুক্তভোগী দুর্ভোগের শিকার হওয়ার সাথে সাথে ফোন দিলে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার আশ^াস দেন। এ ক্ষেত্রে সকলকে সচেতন হওয়ার আহবান জানান। ডিসি আরও বলেন, বিআরটি অফিসের দালালও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমার কাছে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তিনি কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রæতি দেন।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে গণশুনানী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে দুদকের মহাপরিচালক আকতার হোসেন, গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী শফিকুল ইসলাম, গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার আবু তোরাব মো. শামসুর রহমান, দুদকের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মোরশেদ আলম, গাজীপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এম এ বারী, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিকসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh