বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আজ ১০ মে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সময় বিকেল ৪টা ১২ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটের মধ্যে উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশে সময়টি হচ্ছে আজ রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট।
এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আগেরদিন বুধবার বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
উৎক্ষেপণের মুহূর্ত সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন। সব জেলা-উপজেলা প্রশাসন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সরাসরি সম্প্রচার করবে। প্রশাসন থেকে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় দেখানো হবে দৃশ্যটি।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মেজবাহউজ্জামান বলেন, উৎক্ষেপণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। গ্রাউন্ড স্টেশনের প্রয়োজনীয় কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফ্যালকন-৯ রকেট ৩.৫ মেট্রিক টন ওজনের বঙ্গবন্ধু-১ যোগাযোগ স্যাটেলাইটটি মহাকাশে নিয়ে যাবে। মহাকাশে নির্দিষ্ট স্লটে এটির পৌঁছতে ৮ দিন সময় লাগবে।
ফ্লোরিডা থেকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বাংলায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানটি লেখা রয়েছে। এই স্লোগান নিয়েই কক্ষপথের দিকে ছুটবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

এদিকে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ উপলক্ষে বাংলাদেশীদের পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অরল্যান্ডো।
নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে শত শত বাংলাদেশী এখন অরল্যান্ডোমুখী। তারা সাক্ষী হতে চান ইতিহাসের, আর যা তাদের কাছে এতদিন ছিল শুধুই স্বপ্নের মতো। এখন তারা শুধুই ক্ষণগণনায় ব্যস্ত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।
ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে ফ্লোরিডা গেছেন ৪২ সদস্যের দল। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তার সঙ্গে রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও ইমরান আহমেদ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদসহ অন্যরা। এছাড়াও সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।
উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানের পরের দিন কোকোয়া বিচ হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। সজীব ওয়াজেদ জয় ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
নাসার শিডিউল অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে নিউইয়র্ক ও ঢাকা থেকে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা নাসার গবেষণাস্থল কেনেডি স্পেস সেন্টারে প্রবেশ করতে পারবেন। নাসার কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৭টা থেকে।
নাসা সূত্রে জানা গেছে, শুধু সরকারের প্রতিনিধিদলের সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীরা খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইন উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবেন। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও কেনেডি স্পেস সেন্টারে আলাদা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা দলের নেতাকর্মীদের জন্য কেনেডি স্পেস সেন্টারের আশপাশে খোলা প্রান্তর থেকে উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অতিরিক্ত সচিব সাইফুল ইসলাম বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, সময়সূচির কোনো পরিবর্তনের কথা আমাদের জানানো হয়নি। আশা করছি বৃহস্পতিবার রাতেই আমাদের অপেক্ষা শেষ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কম্পানি ‘স্পেসএক্স’-এর ফ্যালকন-৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে উড়াল দেবে।
উৎক্ষেপণের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রায় সব ধরণের পরীক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে জানিয়ে ফ্লোরিডা বিটিআরসি প্রধান বলেন, সব পরীক্ষার ফলাফল ইতিবাচক। তবে এসব ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও কারিগরি বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। বহু ঘটনা আছে, যেখানে কাউন্ট ডাউনের একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়েও উৎক্ষেপণ স্থগিত করতে হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ব্র্যাক অন্বেষার প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ড. খলিলুর রহমান জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশনে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির চারজন কাজ করছেন। এর মধ্যে তিনজন ন্যানো স্যাটেলাইট ব্র্যাক অন্বেষা প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন।
তিনি বলেন, এটি আমাদের বড় ধরনের অর্জন। স্যাটেলাইটের প্রযুক্তি হচ্ছে বিশ্বের সর্বশেষ সেরা প্রযুক্তি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর এই প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হবে।
তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক আবু সাইদ খান মনে করেন, এ স্যাটেলাইটের সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্ভর করবে এটি পেশাদারদের দিয়ে পরিচালিত হবে কি হবে না তার ওপর। শুধু কারিগরি দিক থেকে নয়, এর বিপণনসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পেশাদারির সঙ্গে করতে হবে। আমলাদের দিয়ে এটি চালালে হবে না।

এ প্রসঙ্গে সাইফুল ইসলাম বলেন, এর মালিকানা সম্পূর্ণভাবে সরকারের কাছে থাকবে। তবে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে এর ট্রান্সপন্ডার বিক্রির জন্য একটি বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর লাইসেন্সের অন্যতম শর্ত রয়েছে যে দেশের নিজস্ব সম্প্রচার ও যোগাযোগ স্যাটেলাইট হলে সেই স্যাটেলাইটের সেবা নিতে হবে। তবে আমাদের ধারণা, এই বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, দেশের স্বার্থেই তারা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সেবা গ্রহণ করবে।
তিনি আরো বলেন, ছয় বছরের মধ্যে এর ব্যয় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হলেও তা সম্ভব না-ও হতে পারে। আমরা প্রাথমিকভাবে এটিকে মর্যাদা হিসেবে নিচ্ছি। আর্থিক দিকটি পরের বিষয়।
বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট সংস্থা বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ খাতে ব্যয় করছে বছরে ১৪ মিলিয়ন ডলার। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যাত্রা শুরু করলে এই বিপুল অর্থ দেশেই থেকে যাবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০ দেশে ব্যবহারের জন্য এবং ২০টি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। এছাড়া নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকায় বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতার অবসান হবে। টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-গবেষণা, ভিডিও কনফারেন্স, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।
স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে গত বছরের ৪ জুন বাংলাদেশের জন্য সাফল্যের একটি মাইলফলক। এদিন একটি কার্গো রকেট মহাকাশে রওনা হয় বাংলাদেশের বানানো প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’কে নিয়ে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দিনে চার থেকে ছয়বার উড়ে যাচ্ছে এটি, গবেষণার জন্য উচ্চমানের ছবি তুলে পাঠাচ্ছে।
তবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট। এর ওজন জ্বালানিসহ তিন হাজার ৭০০ কেজি। এটির কক্ষপথ ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে। এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। স্যাটেলাইটের মেয়াদ ১৫ বছর।
























