আজ ১৭ মে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৮তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন তিনি। প্রায় ৩৭ বছর আগের ওই দিনটি ছিল রবিবার।
ওই দিন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বহনকারী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লী থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকার তত্কালীন কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত এলাকাজুড়ে লাখো জনতার ঢল নামে। সারাদেশের গ্রাম-গঞ্জ-শহর-নগর-বন্দর থেকে অধিকার বঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা সেদিন ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়।
এ সময় সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী লাখো কণ্ঠের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা বিমানবন্দর এলাকা। সে দিনের গগণবিদারী মেঘ গর্জন, ঝাঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেয়ার লক্ষ্যে গর্জে উঠেছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার কারণে ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা পান। ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঐতিহাসিক হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ নির্বাসিত অবস্থায় পার করে ওই বছরটির এই দিনে দেশে ফিরে আসেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেদিন বিমানবন্দরে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বাংলার মানুষের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি দেশে এসেছি। আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর বঙ্গবন্ধু কন্যা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘…আমি সামান্য মেয়ে। সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থেকে আমি ঘর-সংসার করছিলাম। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। বাংলার দুখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবন দান করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতামাতা, ছোট ভাই রাসেলসহ সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই।’
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে শক্ত হাতে দলের হাল ও গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে রেখে সহস্র বাধা অতিক্রম করেন। তিনি জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দেশে ফেরার ১৫ বছরের মাথায় আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। পাঁচ বছর দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করে দেশকে নিয়ে যান উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে। এরপর আবারও ষড়যন্ত্র। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরের বিভীষিকাময় নির্যাতনে নেতাকর্মীরা যখন দিশেহারা, তাকেসহ পুরো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে মারণঘাতী গ্রেনেড হামলার মুখেও অবিচল থেকে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে বন্ধুর পথ পাড়ি দেন বঙ্গবন্ধুর এই কন্যা।
এরপর ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সামরিক নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দীর্ঘদিন কারাবাসে থেকেও কোনো অপশক্তির কাছে মাথানত করেননি শেখ হাসিনা। ওই সময় ভয়ভীতি ও ষড়যন্ত্রে অনেক নেতার পথভ্রষ্ট হওয়ার উপক্রম হলেও জেলে থেকে সফল দিকনির্দেশনা দিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের অটুট বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন তিনি। শেখ হাসিনার এই অবিচল ও সাহসী নেতৃত্ব আর জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণেই ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশের জনগণ তিন-চতুর্থাংশ আসনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে প্রধানমন্ত্রী করেন শেখ হাসিনাকে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা।
বিপুল সমর্থন নিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শেখ হাসিনা দেশকে আত্মনির্ভরশীল, সুখী-সমৃদ্ধ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

শেখ হাসিনার ৩৮তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এবার আওয়ামী লীগ ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, শেখ হাসিনার সুন্দর জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করে দেশব্যাপী দোয়া, মিলাদ মাহফিল, আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ইত্যাদি। দিনটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার আলোচনা সভার আয়োজন করেছে আওয়ামী লীগ। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
রাষ্ট্রপতির বাণী
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাণী প্রদান করেছেন। বাণীতে তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের অব্যাহত সাফল্যসহ তাঁর নিজের ও পরিবারের সকল সদস্যের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কমছে দারিদ্র্যের হার। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলেছে।
মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ একটি যুগান্তকারী ঘটনা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত করতে তিনি ‘ভিশন ২০২১’ ও ‘ভিশন ২০৪১’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে শেখ হাসিনার এসব যুগান্তকারী কর্মসূচি বাংলার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
























