সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ও গোলাগুলিতে সাত জেলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে।
পুলিশ বলেছে, রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ছয় জেলায় বন্দুকযুদ্ধ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের গুলিতে রাজধানী ঢাকায় একজন, পিরোজপুরে দুইজন, কুমিল্লায় দুইজন, চাঁদপুরে একজন নিহত হয়েছে। এছাড়া মুন্সীগঞ্জ ও ঝিনাইদহে মাদক ব্যবসায়ী দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে দুইজন নিহত হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে গুলিবিদ্ধ দুটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ আরো বলেছে, নিহতরা সবাই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল এবং তাদের মধ্যে প্রায় সবার বিরুদ্ধেই থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলাও রয়েছে।
ঢাকা:
রাজধানীর মিরপুরের একটি বস্তিতে পুলিশের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাতে মিরপুর রূপনগরে একটি বস্তিতে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার সকাল পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
তবে পুলিশের দাবি, নিহত ব্যক্তি তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। তার আনুমানিক বয়স ৪৫ বছর।
রূপনগর থানার এসআই মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রবিবার রাত আড়াইটার দিকে রূপনগর এলাকায় একটি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামে পুলিশ। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছুড়ে। এতে এক মাদক ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সোমবার ভোর ৪টার দিকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
পিরোজপুর:
পিরোজপুরে পুলিশের সঙ্গে আলাদা বন্দুকযুদ্ধে মোঃ ওহিদুজ্জামান (৩৭) ও মিজানুর রহমান সরদার (৩৫) নামের দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাতে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এ সময় মঠবাড়িয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাজহারুল আমিনসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।
পিরোজপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক এ কে এম মিজানুল হক বলেন, রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ পিরোজপুর পৌরসভার কৃষ্ণপুর এলাকা থেকে ওহিদুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। এ সময় ওহিদুজ্জামান পুলিশকে জানান, তার কাছে অস্ত্র ও মাদক রয়েছে। এরপর রাতে পুলিশ ওহিদুজ্জামানকে নিয়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে বের হয়। রাত পৌনে ১টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার টোনা বেইলি সেতু এলাকায় ওহিদুজ্জামানের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে এবং ওহিদুজ্জামানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। জবাবে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে।
এ সময় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে ওহিদুজ্জামান গুলিবিদ্ধ হন। তখন পিরোজপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এ বি আল আমিন ও কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ওহিদুজ্জামানকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, পাঁচটি বন্দুকের গুলি, তিনটি কার্তুজ, ধারালো দা ও ১৭৫ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। ওহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আটটি মাদক মামলা রয়েছে। রবিবার পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত একটি মাদক মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়।
অন্যদিকে রাত ২টার দিকে জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বড় মছুয়া এলাকার খায়ের গনিপাড়া গ্রামে গেলে স্থানীয় ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান (৩৬) ও তার সঙ্গীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তখন পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই মিজানুর রহমান মারা যায়। এ সময় মঠবাড়িয়া থানা পুলিশের ছয় সদস্য গুরুতর আহত হন।
মিজানুর মঠবাড়িয়া আঞ্চলিক ডাকাতদের নেতা ও স্থানীয় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে মাদক ও ডাকাতিসহ ছয়টি মামলা রয়েছে।
কুমিল্লা:
চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে কুমিল্লায় পৃথক দুই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ২৩ রাউন্ড শর্ট গানের গুলি ছোঁড়ে। এই ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। রবিবার দিবাগত রাতে এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে।
দেবিদ্বার থানার ওসি মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দেবিদ্বার উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এনামুল হক দোলন (৩৫) নামে এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। সে তালিকাভুক্ত পুলিশের আসামি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সময় পুলিশ ১০ কেজি গাঁজা, ১০০পিস ইয়াবা, একটি পাইপগান, এক রাউন্ড কার্তুজ ও একটি কার্তুজের খোসা উদ্ধার করে।
অপরদিকে সদর দক্ষিণ থানা পুলিশ ও মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নুরু মিয়া নামে শীর্ষ এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।
জেলা সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ- বরুড়া সার্কেল) গোলাম আম্মিয়া মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মাদকের বড় চালান যাচ্ছে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সদর দক্ষিণ থানা পুলিশের একটি টিম গলিয়ারা এলাকার সীমান্তে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশের উপর হামলা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলিবর্ষণ করলে নুরু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুন্সীগঞ্জ :
মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার মুরমা কাতলাপাড়া এলাকায় সুমন বিশ্বাস ওরফে কানা সুমন নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।
সদর থানার তদন্ত ওসি গাজী সালাউদ্দীন জানান, রবিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে তাদের কাছে খবর আসে কানা সুমনের লাশ মুরমা কাতলাপাড়া ব্রিজের সামনে পড়ে আছে। পরে তারা সেখান থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করেন। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। মাদক ও বিভিন্ন মামলাসহ সুমনের বিরুদ্ধে ২৫টি মামলা রয়েছে।
চাঁদপুর:
চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আবু সাঈদ বাদশা ওরফে লাল বাদশা নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ থানায় ১০টি মাদক মামলা রয়েছে।
ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম জানান, রবিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পুলিশের একটি দল অভিযানে বের হয়। সে সময় ফরিদগঞ্জের গুপ্টি ব্রিজ এলাকায় গেলে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। জবাবে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ বাদশা। আহত অবস্থায় তাকে ফরিদগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থল থেকে ১১১ পিচ ইয়াবা বড়ি, একটি একনলা বন্দুক, চারটি গুলি ও একটি ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় দু’দল মাদক ব্যবসায়ীর গোলাগুলিতে ফরিদ (২৭) নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাত ২টার কিছু পরে ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের পাশে জাড়গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক শেখ জানান, রাত ২টার দিকে ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের পাশে জাড়গ্রাম এলাকায় দুদল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সেখান থেকে ফরিদের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, প্রায় এক কেজি গাঁজা, ২০ বোতল ফেনসিডিল ও ছয় জোড়া স্যান্ডেল উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে এ ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের আগুনপুর থেকে গুলিবিদ্ধ দুটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে এই লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়।
লাশের পাশে একটি পিস্তল, রাইফেলের গুলির একটি খোসা ও ১০৫ বোতল ফেনসিডিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মদের খালি বোতলও পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, তারা মাদক ব্যবসায়ী। মাদক ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে তারা নিহত হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ মাদক ব্যবসায়ীরা হলো, সাতক্ষীরা শহরের মধুমোল্লারডাঙ্গির ইমদাদুল হক ও সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের লক্ষিদাড়ি গ্রামের খলিলুর রহমান পুটে।
আলীপুর ইউনিয়ন গ্রাম পুলিশের সদস্য পরিতোষ সরকার জানান, তিনি সকালে শুনতে পান, আগুনপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়কের ওপর দুটি লাশ পড়ে রয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দুটি লাশ দেখতে পান। পরে সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশকে এই তথ্য জানিয়ে দেন।
থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার রায় বলেন, নিহত দুজনের গলায় গুলির চিহ্ন রয়েছে। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি ও শার্ট রয়েছে। অন্যজনের পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি। মাত্র ১০ গজের ব্যবধানে লাশ দুটি পড়ে ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে তারা মাদকের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। নিজেদের মধ্যে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ওই দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়।




















