চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আবাসিক হলের ডাইনিংয়ে খাবারের মান বাড়ছে না কোনোভাবে। খাবারের মানের দিকে শিক্ষার্থীদের নজর দেওয়ার আবেদন করে সবচাইতে বেশি কতৃপক্ষের কাছে। তবে কোন সুরাহা মিলছে না। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী খাবারের গুণগত মান বজায় রাখতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ডাইনিগুলো।
অনুসন্ধানের সময় হলের অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন, প্রয়োজনীয় খাবার খেতে তাদের দৈনিক খরচ হবে কমপক্ষে ২৪০ টাকা। এই খরচ বহন করা তাদের জন্য সহজ নয়। যতটুকু না খেলে নয়, ততটুকুতেই তারা সন্তুষ্ট থাকেন। দুর্মূল্যের এই বাজারে মাস শেষ করার জন্য খরচ কমানোর চেষ্টায় থাকেন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী।
গবেষকদের তথ্য বলছে, হলের একজন শিক্ষার্থী দৈনিক গড়ে পুষ্টি পান ১ হাজার ৮২১ কিলোক্যালরি। অথচ একজন সুস্থ মানুষের প্রয়োজন ২ হাজার ৮০০ কিলোক্যালরি। এর কম পেলে তাকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ধরা হয়। পুষ্টি গ্রহণের বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকেই উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
বিভিন্ন হলের ডাইনিং ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগেই নিম্নমানের চাল রান্না হয়। ডালের যে পাত্র থাকে, তাতে ডালের পরিমাণ সামান্যই। এই ডাল নিয়ে অশ্লীল, নোংরা স্ল্যাং চালু আছে। কয়েকটি ক্যান্টিনের মালিক ও বাবুর্চিরা জানিয়েছেন, দুপুরে ৫০০ আর রাতে ৪০০ থেকে ৪৫০ জনের রান্না হয়। ছাত্রীদের হলের ক্যান্টিনে রান্না কম হয়। তাদের অনেকেই নিজেরা রান্না করে খান।
এফ. রহমান হলের ডাইনিং ম্যানেজার জয়নাল আবেদিন খাবারের তালিকার বিষয়ে জানান, দুপুরের খাবারে মাছ, মুরগী, ডিমের পাশাপাশি যেকোনো একটি সবজির আইটেম থাকে। ত্রিশ টাকার টোকোনে মাছ, মুরগী, ডিমের যেকোনো একটি সাথে সবজি নেওয়া যায়। আর চল্লিশ টাকার টোকেন নিলে মাছ, মুরগী, ডিমের মধ্যে থেকে যেকোনো দুটি নেওয়া যায়।
রাত ও দুপুরের খাবারে একই আইটেম থাকে অধিকাংশ সময়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে খাবারের মান কমে গেছে কি-না আজকের বিজনেস বাংলাদেশ জানতে চাইলে বলেন, ‘খাবারের মান কমে যায় নি, আমরা স্টুডেন্টদের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করি আমাদের সাধ্যমত।’
শহীদ আব্দুর রব হলের ডাইনিং ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন বলেন, ‘ত্রিশ টাকায় ইলিশ, শুটকি, মুরগী অথবা ডিমের যেকোনো একটির সাথে ভর্তা বা সবজি নেওয়া যায়। মাঝে মাঝে থাকে গরুর মাংস। মুগডাল থাকলে সবজি বা আলুভর্তা নেওয়া যায় সাথে। দুপুর ও রাতের খাবারের আইটেম একই। জিনিসপাতির দাম বেড়ে যাওয়ায় এভাবে চলা মোটামুটি কষ্টকর হয়ে গেছে আমাদের। এরই মধ্যে ৪৫ হাজার টাকার মতো বাকি পড়ে আছে।’
শাহ্ আমানত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আলিমুল শামীম বলেন, ‘যে খাবার খাচ্ছি তাতে মনে হয়না সর্বনিম্ন পুষ্টি আছে, বেঁচে থাকার জন্য খেয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন। খাবারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আইটেম নিয়ে আসার প্রয়োজন মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ে যারা আছে, তাদের সুনজর দেওয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
দেশনেত্রী শেখ হাসিনা হলের আবাসিক ছাত্রী সাবিহা কায়সারের কাছে হলের খাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘হলের খাবারে কোনো বৈচিত্র্য নেই। সবসময় একই ধরনের খাবার পরিবেশন করে। তরকারি পানসে লাগে। ক্যান্টিনের পাশের ড্রেন থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় খাওয়ার সময় অরুচিকর অবস্থায় পড়তে হয়। খাবারের দামের তুলনায় মান খুবই কম।’
খাবারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভাত ১২ টাকা,
মাছ ২৬ টাকা, মুরগী ৩১ টাকা, আলু+লাউ ১৬ টাকা, আলু+শুটকি ১৬ টাকা, ডাল-ভর্তা ১৩ টাকা, ডিম ১৮ টাকা।
শামসুর নাহার হলের আবাসিক ছাত্রী তানজিনা সুলতানা খাবারের প্রসঙ্গে বলেন, ‘টোকেনের দাম ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা হলেও খাবারের মানের দিকে নজর দিতে পারেনি। খাবারের স্বাদ নেই, দাম বেড়েও পরিমাণে কম পাচ্ছি। খাবারের দাম ধাপে ধাপে বেড়ে গেছে, আগের থেকে বেশি খরচ হচ্ছে মাস শেষে। অনেক সময় বাড়তি ডাল পরেরদিন যোগ করা হয়। এভাবে খাবার খেয়ে পেটের সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে, গ্যাস্টিকের সমস্যা হয় আমাদের।
আলাওল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘খাবার মোটামুটি ভালো। তবে আরেকটু ভালো করা উচিত। যদিও বর্তমানে বাজারের অবস্থা চড়া, তারপরও নজর দেওয়ার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি দায়িত্বরত লোকদের।’
সোহরাওয়ার্দী হল প্রভোস্ট হল ড.শিপক কৃষ্ণ দেবনাথ বলেন, ‘বাংলাদেশ বা বিশ্বের কোথাও নাই যে ২৫/৩০ টাকায় ভালো মানের খাবার দিতে পারে। বর্তমান যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এটা সম্ভব না। তবুও আমরা চেষ্টা করি অল্প টাকা দিয়ে ছেলেদের ভালো কিছু খাওয়ানোর।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের হল সবসময় পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি, এর জন্য হলে গিয়ে দেখতে পারেন। এর আগে হলের খাবারে সিগারেটের অংশ পাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে বলেন, আগের কথা টেনে আনলে হবে না। এটা নিয়ে নিউজ হয়েছে আমরা সমাধান করেছি। ছাত্রদের জন্য আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’
এ এফ রহমান হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘পুষ্টিমান পাচ্ছে না এটা ঠিক, এটা অস্বীকার করার কিছু নাই। ছাত্ররা খাবারের যে মূল্য পরিশোধ করে, এখানে বিশ্ববিদ্যালয় তাদেরকে রান্না করে খাওয়ায়। ছাত্ররা ৩০ টাকা দেয়, এই টাকায় কোনোভাবেই ভালো মানের খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় যে ভর্তুকি দেয় তা অফিস, গ্যাস, কর্মচারীর পিছনে ব্যায় করে। বিশ্বিবদ্যালয় সরাসরি খাবারে কোনো ভর্তুকি দেয় না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা: মোহাম্মদ আবু তৈয়বের কাছে এমন অপুষ্টিকর খাবার খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে জানতে চাইলে বলেন, ‘ খাবারের মান ভালো না হলে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকলে ডায়রিয়া, গ্যায়াস্টিক, পেটে ব্যথা হতে পারে। চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পেটে ব্যথা বা গ্যায়াস্টিকের রোগী অনেক বেশি।’
খাবারের বিষয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি মির্জা খবির সাদাফ খান জানান, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা হল প্রশাসনকে বলছিলাম ডাইনিংয়ের খাবারের মান ভালো করার জন্য।




















