বরিশাল কৃষি অঞ্চলে মালটা চাষে কৃষিজীবী থেকে গৃহস্থ পর্যায়ে আগ্রহ বাড়লেও উন্নতমানের বীজ ও চারার অভাবের সাথে মাঠ পর্যায়ে আবাদ প্রযুক্তি হস্তান্তর না হবার পাশাপাশি ভাল দাম না পাওয়ায় কাক্সিক্ষত সম্প্রসারণ ঘটছেনা। তবে এর পরেও সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে এ অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ১০ হাজার টনের মত মালটা উৎপাদন হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-ডিএই সহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ফলে আমদানীকৃত মালটার চেয়ে উন্নত খাদ্যমানের রসালো সুমিষ্ট টাটকা ফল অনেকটাই সুলভে কিনতে পারছেন সাধারণ মানুষ। তবে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দামের ব্যবধান বিস্তর। ৩-৪ হাত ঘৃুরে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদনকারীরা ৪০টাকা কেজিতে যে মালটা বিক্রী করেন ভোক্তারা তা ৩গুন দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এবারের ডেঙ্গু মহামারীতে বরিশাল অঞ্চলে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এ রসালো ফল আক্রান্তদের দ্রুত আরোগ্যে সহায়ক হয়েছে। মালটার আবাদ সম্প্রসারণ করতে পারলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানী অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কৃষি বিজ্ঞানী সহ সাধারণ ভোক্তারা।সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে দেশে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে মালটার আবাদ ও উৎপাদনে হয়েছে বলে ডিএই’র ‘লেবু ফসল আবাদ ও উৎপাদন সম্প্রসারণ প্রকল্প’র পরিচালক জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বছর দেশে সাড়ে ৭ হাজার হেক্টরে প্রায় ৭৫ হাজার টন মালটা উৎপাদন হয়েছে। আগামি বছরের মধ্যে এ রসালো ফলের উৎপাদন লাখ টনের কাছে পৌঁছবে। বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ১১টি উপজেলাতে মালটা সহ লেবু জাতীয় ফল উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় সম্প্রসারণ কাজ চলছে।ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-বারি’ ‘বারি মালটা-১’,‘বারি মালটা-২’ ও ‘বারি মালটা-৩’ নামের তিনটি উন্নতমানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টরে মালটার বাগান সৃজন সম্পন্ন হয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে ডিএই’র দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছে। আগামি দু বছরের মধ্যে এসব বাগান থেকে মালটার উৎপাদন শুরু হলে বরিশাল কৃষি অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক এলাকায় পরিণত হতে পারে। যার মধ্যে থেকে চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির বাগান থেকে ১০ হাজার টনের মত ফলন মিলেছে বলে ডিএইর দায়িত্বশীল সূত্র মনে করছে।বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ‘বারি মলটা-১’এর আবাদ শুরু হয়েছে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিগত দুটি মৌসুমেই বাণিজ্যিকভাবে এর বিপণনও শুরু হয়েছে। বরিশালের মালটা রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হচ্ছে গত দুই বছর ধরে। ইতোমধ্যে নেছারাবাদ নার্সারী থেকে বিপুল সংখ্যক ‘ভিয়েতনামী মালটা’ কলম সংগ্রহ করে আবাদ শুরু হয়েছে ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক চাষি পর্যায়ে। তবে ডিএই’র হর্টিকালচার নার্সারীতে উন্নতমানের বার মাসি ভিয়েতনামী মালটার কোন কলম ও চারা মিলছে না।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল রহমতপুর হর্টিকালচার নার্সারী ভালো জাত ও মানের বারি-১ ও বারি-২ মালটার চারা উত্তোলন ও বিক্রি করলেও প্রচারণার অভাবে তা বেশীরভাগ উদ্যোক্তাদের অজানা। আবার সেখানে চারার দুষ্প্রাপ্যতাও রয়েছে। এবারো বর্ষা মৌসুম শেষ হবার আগেই ওই নার্সারীতে মালটার চারা শেষ হয়ে যায়।
ভালমানের চারা রোপন সহ সঠিক বালাই ও সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে দু বছরের মাথায়ই প্রতিটি গাছে বছরে ২শ’র ওপরে মালটা ধরে থাকে। তবে ভিয়েতনামী মালটায় বছরে দু,বার ফলন আসায় এর আবাদ আরো বেশী লাভজনক বলে জানা গেছে। বরিশালের বাজারে খুচরা পর্যায়ে মৌসুমের শুরুতে এবার দেশী মালটা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও শেষে তা ১৪০ থেকে দেড়শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে কৃষক পর্যায়ে পাইকাররা মৌসুমের শুরুতে ৪০ টাকায় এবং শেষ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯০ টাকা দরে মালটা কিনছেন।কৃষিবিদদের মতে সঠিক পরিচর্যা করলে প্রতিটি গাছ থেকে মৌসুমে ৪০ কেজি পর্যন্ত মালটা উৎপাদন সম্ভব। এতে করে প্রথম বছরেই জমি তৈরী, চারা সংগ্রহ এবং সার ও বালাই ব্যবস্থাপনা সহ পরিচর্র্যার ব্যয় তুলে আনা সম্ভব। তবে আরো কিছুটা ভাল দাম পেলে উৎপাদকদের জন্য তা যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক হতে পারে বলেও মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদরা।চারা ও কলম সহজলভ্য করা সহ আবাদ প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে না পৌঁছায় এখনো দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক পর্যায়ে মালটার আবাদ সম্পর্কে যথাযথ বার্তা পৌঁছছে না বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। তবে এ ফল আবাদ যতটা সম্প্রসারণ হবার কথা, ততটা না হলেও গত ২-৩ বছরে পরিস্থিতির আশাব্যঞ্জক উন্নতি হয়েছে বলে ডিএই’র বরিশাল কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক জানিয়েছেন।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ




















