দুর্বল ব্যাংক সবলের সঙ্গে একীভূতকরণ বা মার্জার নিয়ে আলোচনায় থাকার মধ্যে কোন কোন ব্যাংক দুর্বল তার একটি ধারণা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেছেন, ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর দেখলেই বুঝা যায় কারা খারাপ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার বিকেলে এ নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘‘খারাপ ব্যাংক কারা, তা তাদের ব্যালেন্সশিটে(আর্থিক প্রতিবেদন) তো ইতোমধ্যে হিট করেছে(জানান দেওয়া)। শেয়ারবাজারে তা মূল্যায়ণ করে রেখেছে। শেয়ারের দাম যা, সেখানে কিন্তু আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটে গেছে। মার্কেট অলরেডি ডিটারমাইন্ড(বাজার ধারণা) করে ফেলেছে আপনার ভ্যালু(সম্পদ মূল্য) কতো। তারপরও আমরা নতুন করে নীরিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়ণ করবো।’’
পুঁজিবজারে দেশিয় ৩৬টি তালিকাভূক্ত ব্যাংকের মধ্যে ১৮টির শেয়ার দর ১২ টাকার নিচে। আর ১০টির দর অভিহিত মূল্য(দশ টাকা) এর নিচে। সেই তালিকায় প্রথম প্রজন্ম থেকে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকও রয়েছে।
কিন্তু শেয়ার দর কতো হলে ব্যাংকটি খারাপ হিসেবে ধরছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেননি মেজবাউল হক।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে সময় দেওয়া হবে স্বেচ্ছায় কে কার সঙেগ একীভূত হবে। ব্যাংকগুলো তা না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিদের্শনা দিবে মন্তব্য করে মুখপাত্র বলেন, ‘‘স্বতন্ত্র নীরিক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া মূল্যায়ণ প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মার্চ মাসে মার্জার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম মূল্যায়ণ করা হবে। তখন আমরা(বাংলাদেশ ব্যাংক) ঠিক করে দিবো কে কার সঙ্গে একীভূত হবে।’’
গত কয়েক বছর ধরেই ডজন খানেকের বেশি ব্যাংক মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন ধনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সমস্যাগ্রস্ত এসব ব্যাংকে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জার) করতে চাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এজন্য একটি রোডম্যাপ ঠিক করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে এক বছর সময় দিয়ে ‘প্রম্পট কারেক্টিভ একশন, পিসিএ’ নামের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়েছে।
সেখানে ব্যাংকগুলোর খেলাপী ঋণের হার, মূলধন পর্যাপ্ততা, নগদ অর্থের প্রবাহ ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের তথ্য ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিয়ে আথিক স্বাস্থ্যর বিভিন্ন সূচকের মানদণ্ড দেয়া হয়।
কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ডের নিচে থাকা ব্যাংকগুলোকে দুর্বল হিসেবে শ্রেণিবিভাগ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। র্দুবল ব্যাংক টেনে তুলতে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার।
আর ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সীমাতিরিক্ত, বেনামি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে পৃথক একটি ‘রোডম্যাপ(কর্মকৌশল)’ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে ‘রোডম্যাপে’ ১৭ দফার রোডম্যাপটি দেওয়া হয় গত ফেব্রুয়ারি প্রথম সপ্তাহে।
এই ‘পিসিএ’ ও ‘রোডম্যাপ’ ব্যাংক একীভূত করার ভিত্তি হবে মন্তব্য করে মেজাবাউল হক বলেন, ‘‘আগামী মার্চে তা মূল্যায়ণ করা দেখা হবে কোন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্ কেমন। পিসিএ ও রোডম্যাপ বলে দিবে কে কার সঙ্গে মার্জার হতে পারে।’’
খারাপ ব্যাংকের জন্য দায়ি কে?
সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও নানা কারণেই ব্যাংক খারাপ হতে পারে মন্তব্য করে মেজবাউল হক বলেন, ‘‘যাদের কারণে ব্যাংক খারাপ হয়েছে, তাদের দায়ও দেখা হবে। পরিচালকদের শাস্তির বিষয়েও সময়ে সময়ে বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হবে।’’
ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানের ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক একীভূত হওয়া নিয়ে নানা ধরনের স্পেকুল্যেশন(অনুমানভিত্তিক কথা বা বার্তা) হচ্ছে। যে প্রক্রিয়ায় ব্যাংক একীভূত হোক না কেন, এতে আমানতকারীদের স্বার্থের কোনো হানি হবে না, সেখানে আমানতকারীদের স্বার্থ শতভাগ রক্ষা করা হবে।’’
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোকে ‘রেড(লাল)’, ‘ইয়েলো(হলুদ)’ ও ‘গ্রিন(সবুজ)’ জোনে শ্রেণি বিভাগ করা হয়। সেই তালিকায় কোন ব্যাংক কোন জোনে রয়েছে তা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায় সম্প্রতি।
মোট ৫৪টি ব্যাংকের গত চার বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে, ৯টিকে রেড জোনে, ইয়েলো জোনে ২৯টি ও ১৬টি ব্যাংকে ব্যাংক গ্রিন জোনে রাখা হয়।
ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদ মান, ব্যবস্থাপনা, আয়, তারল্য ও বাজার ঝুঁকির মতো ছয়টি আর্থিক সূচকের ভর করে ‘ব্যাংক হেলথ ইনডেক্স এন্ড হিট ম্যাপ’’ র্শীষক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এসব সূচক ব্যাংকের সার্বিক মান র্নিধারণী অবস্থান ক্যামেলস রেটিং তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষায় লাল তালিকাকে খুবই খারাপ, হলুদ তালিকায় থাকলে মধ্যম মানের ও সবুজ তালিকায় থাকল নিরাপদ বা সবল ব্যাংক হিসেবে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মেজবাউল হক বলেন, ‘‘প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য করা হয়। এটি ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থান ও মান প্রকাশ করে না। একটি বিভাগের তৈরি এ প্রতিবেদন কোনো ব্যাংকের পুরো অবস্থান বলে দেয় না।’’
ব্যাংকের মান যাচাইয়ের একটি মাত্র ঘোষিত মানদণ্ড হচ্ছে তার নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘ব্যালেন্সশিট বলে দিবে ব্যাংকের মান কেমন। ক্যামেলস রেটিংই বলে দেয় কোন ব্যাংক কেমন।’’
প্রতিবেদনটি প্রকাশযোগ্য নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোর নানা সূচক থাকে। দেশিয় ও আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু তৈরি হলে কোন ব্যাংকের উপর কেমন প্রভাব পড়তে পারে, তার একটি আগাম ধারনা পেতে এটি করা হয়।’’
ব্যাংকিং খাতে সুদহার পরিবর্তন হচেছ। এটি করতেও গবেষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব কেমন ব্যাংকিং খাতে হতে পারে তাও আগাম ধারনা নেওয়া হয়। কিন্তু এটি চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়।’’
০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
মার্জার প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে আমানতকারীরা
-
নাজমুল ইসলাম - প্রকাশিত : ০৮:৩৩:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মার্চ ২০২৪
- 133
ট্যাগ :
জনপ্রিয়
























