০৭:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

৮দশমিক ৬ ডিগ্রিতে নামল তাপমাত্রা: শৈত্যপ্রবাহে স্থবির জনজীবন, হাসপাতালে রোগীর চাপ

হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা আর মৃদু শৈত্যপ্রবাহে কাবু হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল।রংপুরসহ দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় দিন দিন বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না।ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের ও অতিদরিদ্র মানুষ।

শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোর ও রাতের প্রচণ্ড ঠান্ডায় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে, কমেছে দৈনিক আয়ও। অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখছেন। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়-মাত্র ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।একই দিন রংপুরে ১১ দশমিক ৯, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯, ডিমলায় ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৫, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১০ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৫ এবং গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না, এতে শীত আরও তীব্র হচ্ছে।

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ার মতো। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা এরশাদ হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতজুড়ে নতুন ও পুরোনো শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক কিনতে ভিড় করছেন পুরোনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায়ী স্টলগুলোতে। জাহাজ কোম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় অব্যাহত রয়েছে।

রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্ট। নতুন শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। পুরোনো একটা জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা।” একই কথা জানান দিনমজুর ও ভ্যানচালকরাও।তারা বলছেন, শীত বাড়লেও আয় বাড়েনি, বরং কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহেদ আলী ও গফুর উদ্দিন জানান, এ বছর পাইকাররা পুরোনো কাপড়ের দাম বেশি নিচ্ছেন। ফলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পুরোনো কাপড় আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।

শীতের তীব্রতায় অনেক মানুষ খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানো এখন সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায়।

এদিকে শৈত্যপ্রবাহের কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান,ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে ৮ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি এবং জানুয়ারি মাসেও ৫ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে আরও ২-৩টি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন,শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা বাড়ানো হবে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ,বিদ্যমান শীতের তীব্রতার তুলনায় সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। শীতে বিপর্যস্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখন প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

নীলফামারীতে আরডিআরএস’র উদ্যোগে ‎শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ

৮দশমিক ৬ ডিগ্রিতে নামল তাপমাত্রা: শৈত্যপ্রবাহে স্থবির জনজীবন, হাসপাতালে রোগীর চাপ

প্রকাশিত : ০৪:১৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা আর মৃদু শৈত্যপ্রবাহে কাবু হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল।রংপুরসহ দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় দিন দিন বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না।ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের ও অতিদরিদ্র মানুষ।

শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোর ও রাতের প্রচণ্ড ঠান্ডায় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে, কমেছে দৈনিক আয়ও। অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখছেন। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়-মাত্র ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।একই দিন রংপুরে ১১ দশমিক ৯, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯, ডিমলায় ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৫, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১০ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৫ এবং গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না, এতে শীত আরও তীব্র হচ্ছে।

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ার মতো। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা এরশাদ হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতজুড়ে নতুন ও পুরোনো শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক কিনতে ভিড় করছেন পুরোনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায়ী স্টলগুলোতে। জাহাজ কোম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় অব্যাহত রয়েছে।

রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্ট। নতুন শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। পুরোনো একটা জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা।” একই কথা জানান দিনমজুর ও ভ্যানচালকরাও।তারা বলছেন, শীত বাড়লেও আয় বাড়েনি, বরং কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহেদ আলী ও গফুর উদ্দিন জানান, এ বছর পাইকাররা পুরোনো কাপড়ের দাম বেশি নিচ্ছেন। ফলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পুরোনো কাপড় আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।

শীতের তীব্রতায় অনেক মানুষ খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানো এখন সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায়।

এদিকে শৈত্যপ্রবাহের কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান,ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে ৮ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি এবং জানুয়ারি মাসেও ৫ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে আরও ২-৩টি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন,শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা বাড়ানো হবে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ,বিদ্যমান শীতের তীব্রতার তুলনায় সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। শীতে বিপর্যস্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখন প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে।

ডিএস./