বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। অর্জন বড়, কিন্তু সামনে বড় পরীক্ষা। কানাডার বাজারে শুল্কনীতি, প্রতিযোগিতা ও প্রবাসী অর্থনীতির সমীকরণই নির্ধারণ করবে—উত্তরণ চাপ হবে, না সুযোগ।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নির্ধারিত আছে ২৪ নভেম্বর ২০২৬। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এটিকে শুধু “সাফল্য” বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কারণ উত্তরণ মানে নতুন নিয়ম, নতুন শর্ত এবং নতুন প্রতিযোগিতা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান বদলাবে। শুল্ক-অগ্রাধিকার বদলাতে পারে। বাজারে প্রবেশাধিকারও সংকুচিত হতে পারে। উৎপাদন ও রপ্তানির খরচ নতুনভাবে হিসাব হবে। তাই এটি এক ধরনের নীতিগত সংক্রমণকাল। এই সময় ঠিকমতো সামলাতে না পারলে অর্জনই চাপ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিকমতো সামলাতে পারলে অর্জন সুযোগে বদলে যায়।
এই পরিবর্তন কানাডার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ সম্পর্কটি এখন আর শুধু সহায়তা বা উন্নয়ন সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভে—বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জনশক্তি।
উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতা এই তিন ক্ষেত্রেই নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ফলে আবেগের চেয়ে নীতির গুরুত্ব বেশি। প্রশ্নও সরল। কানাডার বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার কীভাবে বদলাবে? শুল্ক-অগ্রাধিকার কমলে কারা আগে চাপ অনুভব করবে? প্রবাসী ব্যবসায়ীরা কীভাবে ক্ষতি কমাবেন? তাঁরা কি কমিউনিটি-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সংগঠিত নীতিগত শক্তিতে রূপ নিতে পারবেন? এই সম্পাদকীয় সেই বাস্তবতাই সামনে আনতে চায়।
১) বাণিজ্যের বাস্তবতা: সম্পর্ক এখন কেবল সম্পর্ক নয়—একটি কাঠামো
বাণিজ্য বাড়ছে। ঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ নির্ভরতা বাড়ছে।
গত দুই দশকে দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে। Global Affairs Canada–এর ট্রেড তথ্যভিত্তি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্য ছিল প্রায় ৬০০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। একই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কানাডা থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আমদানি ছিল ২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।
এগুলো শুধু সংখ্যা নয়; এগুলো একটি কাঠামোর প্রতিফলন। সম্পর্ক এখন নিয়মিত, বড় পরিসরের এবং বাজার-নির্ভর।
এই কাঠামোর দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সম্পর্কটি খাতভিত্তিক। বাংলাদেশ প্রধানত পোশাক রপ্তানি করে। কানাডা সরবরাহ করে কৃষিপণ্য, কাঁচামাল ও খাদ্যশস্য। দ্বিতীয়ত, এই খাতগত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করে। পোশাকের বাজার অত্যন্ত দাম-সংবেদনশীল। সামান্য শুল্ক বা ব্যয় বাড়লেই অর্ডার সরতে পারে। কাঁচামালের দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
ফলে সম্পর্কটি মূল্যশৃঙ্খল-সংক্রান্ত ঝুঁকিতে আবদ্ধ। শুল্ক, পরিবহন ব্যয় বা কমপ্লায়েন্স ব্যয়—যে কোনো একটি বৃদ্ধি প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। খুচরা দামে চাপ পড়ে। সোর্সিং বদলের প্রবণতা তৈরি হয়। উত্তরণের পরে শুল্ক-অগ্রাধিকার কমলে প্রভাব দ্রুতই বাজারে দৃশ্যমান হবে।
২) শুল্ক-অগ্রাধিকার: সুবিধা কমলে চাপ যাবে কার ঘাড়ে
শুল্ক বদলালে কাগজে নয়, বাজারেই প্রথম প্রভাব পড়ে। কানাডার একতরফা শুল্ক-অগ্রাধিকার কাঠামো বহু উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের জন্য সহায়ক। এতে অনেক পণ্যে শুল্ক কম বা শূন্য থাকে। Department of Finance Canada–এর ব্যাখ্যায়ও বলা হয়েছে, এসব প্রোগ্রাম সাধারণ শুল্কহারের তুলনায় উদার সুবিধা প্রদান করে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন এই সুবিধা ভোগ করেছে। পাশাপাশি Canada Border Services Agency (CBSA)–এর Customs Notice 24-41 অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে হালনাগাদ কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ কাঠামো পরিবর্তনশীল। এখন প্রশ্ন—উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে সুবিধা কতটা থাকবে, এবং কোন পণ্যে থাকবে?
সুবিধা কমলে প্রথম ধাক্কা পড়ে আমদানিকারকের ওপর। কিন্তু ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভাগ হয়ে যায়।
প্রথমত, খুচরা দামে বৃদ্ধি ঘটে। ভোক্তার ওপর দাম-চাপ পড়ে।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প সোর্সিংয়ের চেষ্টা শুরু হয়। এতে বাংলাদেশের অর্ডার কমতে পারে।
তৃতীয়ত, মার্জিন কমে যায়। রিটেইলার থেকে সরবরাহকারী—সবাই চাপ অনুভব করে। এটি কেবল শুল্কবৃদ্ধি নয়; এটি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ। তাই প্রয়োজন পণ্যভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং কানাডার সঙ্গে নীতিগত সংলাপ। লক্ষ্য—পূর্বানুমেয় ট্রানজিশন ও নীতিগত স্থিতিশীলতা। ৩) প্রবাসী অর্থনীতি: ভোক্তা-কমিউনিটি থেকে নীতিগত শক্তি
প্রবাসী নেটওয়ার্ক বাজারের পাশাপাশি নীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটি বড় ও সক্রিয়। অনেকে আমদানি ও খুচরা ব্যবসায় যুক্ত। ফলে শুল্ক-সুবিধা কমলে প্রভাব তাঁদের ওপরও পড়বে।
এখন প্রয়োজন ভূমিকার পরিবর্তন।
প্রথমত, তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি,দ্বিতীয়ত, উচ্চমূল্য সংযোজন ও মাননির্ভর কৌশল।তৃতীয়ত, নীতিগত অ্যাডভোকেসি।প্রবাসী ব্যবসায়ীরা স্থানীয় নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে যুক্তি-ভিত্তিক সংলাপ বাড়াতে পারেন। স্থিতিশীল সরবরাহ-শৃঙ্খল দুই পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করে।
৪) খাতবৈচিত্র্য: পোশাকের বাইরে মান-ভিত্তিক অংশীদারত্ব টিকে থাকতে হলে বৈচিত্র্য ও মান—দুটিই জরুরি।খাতবৈচিত্র্য অপরিহার্য, তবে পরিকল্পিতভাবে।পোশাকে মানোন্নয়ন ও উচ্চমূল্য সংযোজন প্রয়োজন।কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবায় শুল্ক ঝুঁকি তুলনামূলক কম ৫) শিক্ষা ও জনশক্তি: সংখ্যায় নয়—গ্রহণযোগ্যতায় সাফল্য
দক্ষতা ও স্বচ্ছতাই হবে প্রধান মানদণ্ড।কানাডায় অধ্যয়ন ও অভিবাসন নীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত মান ও গ্রহণযোগ্যতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শ্রমবাজারমুখী প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা-ভিত্তিক অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও টেকসই করতে পারে।
উপসংহার: উত্তরণ শেষ নয়—নতুন দৌড়ের শুরু
এলডিসি উত্তরণ একটি অর্জন। কিন্তু কানাডার বাজারে অবস্থান ধরে রাখা নির্ভর করবে প্রস্তুতির ওপর। শুল্ক-অগ্রাধিকার কমলে চাপ আসতে পারে। মোকাবিলার পথ—খাতবৈচিত্র্য, মানোন্নয়ন এবং প্রবাসী নীতিগত সম্পৃক্ততা।বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তি—এই তিন স্তম্ভেই প্রস্তুতি নিতে হবে। উত্তরণ কোনো সমাপ্তি নয়। এটি নতুন প্রতিযোগিতার শুরু। পরিকল্পিত কৌশলই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ নতুন সমীকরণে কতটা লাভবান হবে।
মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। তিনি অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।

























