‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়/ তটিনী হিল্লোল তুলে কল্লোলে চলিয়া যায়’– কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানের মতো চট্টগ্রামের এক বাগানে উঠেছে ফুলের এমন হিল্লোল। দেশি-বিদেশি ১৪০ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুলগাছ নিয়ে ‘বাসর’ সেজেছে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটস্থ চট্টগ্রাম ডিসি পার্ক। দুবাইয়ের মিরাক্কল গার্ডেনের আদলে চর্তুথবারের মতো এবারের ফুল উৎসব শুরু হবে আগামী ৯ জানুয়ারি এবং চলবে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
জানা যায়, ফৌজদারহাট এলাকায় প্রায় ১৯৪ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা ডিসি পার্ক এখন প্রকৃতি ও নান্দনিকতার এক অনন্য নিদর্শন। একসময় যেখানে রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা ও মাদকের স্বর্গরাজ্য ছিল, সেখানে ২০২৩ সালের শুরুতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সব অপসারণ করে গড়ে তোলা হয় এই আধুনিক ও নান্দনিক পার্ক। ‘জলাশয় আর ফুলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই ডিসি পার্কই এখন চট্টগ্রামের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে লাগোয়া সংযোগ সড়ক বন্দর-ফৌজদারহাট টোল রোড। ঝাউগাছ ও জলাশয়কে সাক্ষী রেখে এই সড়কটি যুক্ত হয়েছে মেরিন ড্রাইভ হয়ে আউটার রিং রোডের সঙ্গে। এ সড়ক ধরে একটু এগোলে চোখে পড়ে ডিসি পার্ক। দূর থেকে যেখানে চোখে পড়ে বিশালাকার এক সাদা পাখির পিঠ। লাল-সাদা-বেগুনি ও গোলাপি ফুলে সাজিয়েছে সে তার দেহখানি। ফুলে আবৃত তার দেহ, পাখা আর লেজ বেয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। এই ‘বক’ দেখে একটু এগোলে চোখে পড়ে এক সবুজ ‘প্রজাপতি’। আকৃতি প্রজাপতির হলেও সে সেজে আছে বাহারি নানা ফুলে। ডিসি পার্কের মাঠজুড়ে ফুলের এমন দোল নজর কাড়বে দর্শনার্থীদের।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করতে ফুলের প্রদর্শনীর পাশাপাশি থাকবে একাধিক সেলফি জোন, চিত্রশিল্পীদের ২০০টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী, দর্শনার্থীদের জন্য ক্যারিকেচার আঁকার ব্যবস্থা। বিনোদনপ্রেমীদের জন্য থাকবে সানসেট ভিউ পয়েন্ট, পিজিওন কর্নার, স্যুভেনির শপ, কায়াকিং, পানির ঝর্ণা। শিশু-কিশোরদের জন্য থাকবে নাগরদোলা, দোলনা, স্প্রিং টয়, মেরিগো রাউন্ড, প্লে পেন ও ফুট ট্রাম্পোলাইনের মতো বিভিন্ন বিনোদন ব্যবস্থা। এ ছাড়া ট্যুরিস্ট শেড, নামাজের ব্যবস্থা এবং নানা ধরনের খাবারের স্টলও থাকছে। ১৯৪ একর আয়তনের ডিসি পার্কে রয়েছে তিনটি বড় পুকুর, ফুডকোর্ট, বসার স্থান, সেলফি কর্নার, ভাসমান ফুল বাগান, হাঁটার উন্মুক্ত পথ, শিশুদের খেলার মাঠ, ভিআইপি জোন, কন্ট্রোল রুম, রেস্টুরেন্ট, টিউলিপ গার্ডেন, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান কর্নার ও আধুনিক পাবলিক টয়লেট।
এছাড়াও মাসব্যাপী আয়োজিত এ উৎসবে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল, গ্রামীণ মেলা, বই উৎসব, ঘুড়ি উৎসব, ফুলের সাজে একদিন, পিঠা উৎসব, লেজার লাইট শো, ভিআর গেম, মুভি শো, ভায়োলিন শো, পুতুল নাচসহ নানা রকমের আয়োজন। দর্শনার্থীদের জন্য বোর্ট ও জিপ লাইনার চড়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যালে বিশ্বের ১৬ দেশের শিল্পীরা তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করবেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবার অন্তত দেশি-বিদেশি কয়েক লাখ মানুষ মাসব্যাপী এই মেলার সৌন্দর্য উপভোগ করবে। গতবার এই মেলাতে দর্শনার্থী ছিল প্রায় ৫ লাখ। পার্কের কাউন্টার ছাড়াও দর্শনার্থীরা অনলাইনে টিকিট কেটে ফুল উৎসবে যোগ দিতে পারবেন। এবার টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্ক দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই ফুল উৎসব পালিত হবে। ডিসি পার্কের ১৯৪ একর জায়গাজুড়ে নানা নান্দনিকতায় সাজানো হয়েছে। প্রদর্শনীতে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ-গাঁদাসহ দেশি-বিদেশি ১৪০ প্রজাতির ফুল থাকবে। তিনি আরও বলেন, এটি বাংলাদেশের সব থেকে বড় ফুল উৎসব।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম জানান, প্রকৃতির বর্ণ, গন্ধ ও ছন্দের অনুপ্রেরণায় জেলা প্রশাসন মাসব্যাপী এই আয়োজন করেছে। ডিসি পার্কে ১৪০ প্রজাতির ফুলের সমারোহের পাশাপাশি থাকবে নানা আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। ‘পুষ্প কাননে জুড়িয়ে ভুবন প্রাণ, ছড়াও সাম্যের গান’ এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত ফুল উৎসবে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ম্যাগনোলিয়া, শিউলি, হাসনাহেনা, অপরাজিতা, চেরি, জাকারান্ডা, উইলো, উইস্টেরিয়াসহ নানা জাতের ফুল প্রদর্শিত হবে।
ডিএস./
























