০৫:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে যেভাবে বেচেঁ ফিরেছেন কক্সবাজারের ৬ রোহিঙ্গা

সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে ট্রলারে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে দুর্ঘটনায় অন্তত রোহিঙ্গাসহ ৩০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ৬ বাংলাদেশী সহ মোট নয়জন রোহিঙ্গা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। আমাদের নিয়ে চৌঠা এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা রওনা দিছে। আটই এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়ার আগে দুই দিন পানিতে ভাসছি।” এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিক।

  • নয়জন রোহিঙ্গা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে দেশে ফেরত এসেছে
  • চৌঠা এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা রওনা হয়
  • ডুবে যাওয়ার আগেই ৩০ জনের মৃত্যু হশ ট্রলারে
  • ট্রলারটিতে পুরুষ, মহিলা,বাচ্চা,দালাল সহ মোট ৩০০ জন আরোহী ছিল
  • বেঁচে ফেরা ৯ জন উদ্ধারের আগে দুইদিন সাগরে ভাসছিল

ডুবে যাওয়ার আগেই ট্রলারটিতে থাকা অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলেও জানান তিনি। আরোহীদের মারধর করা হতো এবং মাছ রাখার কোল্ড স্টোরেজে পালাক্রমে লুকিয়ে রাখা হতো বলেও জানান রফিক।বোটের মাঝি বলেছিল যারা মারা গেছে তাদের লাশ পানিতে ফেলে দিতে। আর যারা জীবিত আছে তাদের রেখে দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বোটই ডুবে যায়,” বলেন বেচে ফেরা ওই ব্যক্তি। ট্রলারে কতজন ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা পুরুষ ছিলাম ২৪০ জন, মহিলা ছিল ২০ জন। বাচ্চা ছিল চারজন। আর বোটের স্টাফ ছিল ১৩ জন। অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারে নিজের ছোট ভাই ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছেন টেকনাফের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন, যদিও তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড’।উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নয়ই এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি কোস্টগার্ড বলছে, গভীর সমুদ্রে বেশ কিছু মানুষকে পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরো নিয়ে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায় তারা।

পরে মধ্যরাতে কোস্ট গার্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।তিনি আরও বলেন, “ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদেরকে দেশের নিয়ে আসি।”উদ্ধারকৃতদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “তারা প্রায় দুই দিন সমুদ্রে ড্রাম এবং কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ভেসেছিলেন।” কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।

এদিকে গভীর সমুদ্রে বিপুল সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির এই ঘটনায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থা দুটির মতে, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, তীব্র বাতাস এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়।গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা নয়জনের মধ্যে আট জন পুরুষ এবং এর জন নারী। তাদের মধ্যে ছয় জন বাংলাদেশি এবং তিনজন রোহিঙ্গা বলে জানা গেছে।উদ্ধার হওয়া ব্যাক্তিদের টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।এই ঘটনায় কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা এম শামসুল আলম মিয়া বাদী হয়ে একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। মামলায় ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। আর বাঙালি ছয়জনকে থানা হেফাজতে রেখে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া ছয়জনের মধ্যে চারজনই ডুবে যাওয়া ট্রলারটির সদস্য বলে জানতে পেরেছেন তারা। মানবপাচার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, “গভীর সমুদ্রে মানব পাচারকারীদের বড় বোট থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট বোটে করে গভীর সমুদ্রে থাকা বড় বোটে করে তারা রওনা দেয়। এক্ষেত্রে জেলে পরিচয়ও ব্যবহার করে তারা।পাচারকারীরা মূলত ভুক্তভোগীদের দারিদ্র্য এবং সামাজিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পাচারকারীরা ভালো চাকরি, মোটা অংকের বেতন এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এমনকি অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

দোহাজারী নাগরিক কমিটির অভিষেক ও সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত

ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে যেভাবে বেচেঁ ফিরেছেন কক্সবাজারের ৬ রোহিঙ্গা

প্রকাশিত : ০৪:২৪:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে ট্রলারে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে দুর্ঘটনায় অন্তত রোহিঙ্গাসহ ৩০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ৬ বাংলাদেশী সহ মোট নয়জন রোহিঙ্গা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। আমাদের নিয়ে চৌঠা এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা রওনা দিছে। আটই এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়ার আগে দুই দিন পানিতে ভাসছি।” এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিক।

  • নয়জন রোহিঙ্গা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে দেশে ফেরত এসেছে
  • চৌঠা এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা রওনা হয়
  • ডুবে যাওয়ার আগেই ৩০ জনের মৃত্যু হশ ট্রলারে
  • ট্রলারটিতে পুরুষ, মহিলা,বাচ্চা,দালাল সহ মোট ৩০০ জন আরোহী ছিল
  • বেঁচে ফেরা ৯ জন উদ্ধারের আগে দুইদিন সাগরে ভাসছিল

ডুবে যাওয়ার আগেই ট্রলারটিতে থাকা অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলেও জানান তিনি। আরোহীদের মারধর করা হতো এবং মাছ রাখার কোল্ড স্টোরেজে পালাক্রমে লুকিয়ে রাখা হতো বলেও জানান রফিক।বোটের মাঝি বলেছিল যারা মারা গেছে তাদের লাশ পানিতে ফেলে দিতে। আর যারা জীবিত আছে তাদের রেখে দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বোটই ডুবে যায়,” বলেন বেচে ফেরা ওই ব্যক্তি। ট্রলারে কতজন ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা পুরুষ ছিলাম ২৪০ জন, মহিলা ছিল ২০ জন। বাচ্চা ছিল চারজন। আর বোটের স্টাফ ছিল ১৩ জন। অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারে নিজের ছোট ভাই ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছেন টেকনাফের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন, যদিও তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড’।উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নয়ই এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি কোস্টগার্ড বলছে, গভীর সমুদ্রে বেশ কিছু মানুষকে পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরো নিয়ে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায় তারা।

পরে মধ্যরাতে কোস্ট গার্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।তিনি আরও বলেন, “ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদেরকে দেশের নিয়ে আসি।”উদ্ধারকৃতদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “তারা প্রায় দুই দিন সমুদ্রে ড্রাম এবং কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ভেসেছিলেন।” কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।

এদিকে গভীর সমুদ্রে বিপুল সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির এই ঘটনায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থা দুটির মতে, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, তীব্র বাতাস এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়।গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা নয়জনের মধ্যে আট জন পুরুষ এবং এর জন নারী। তাদের মধ্যে ছয় জন বাংলাদেশি এবং তিনজন রোহিঙ্গা বলে জানা গেছে।উদ্ধার হওয়া ব্যাক্তিদের টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।এই ঘটনায় কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা এম শামসুল আলম মিয়া বাদী হয়ে একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। মামলায় ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। আর বাঙালি ছয়জনকে থানা হেফাজতে রেখে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া ছয়জনের মধ্যে চারজনই ডুবে যাওয়া ট্রলারটির সদস্য বলে জানতে পেরেছেন তারা। মানবপাচার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, “গভীর সমুদ্রে মানব পাচারকারীদের বড় বোট থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট বোটে করে গভীর সমুদ্রে থাকা বড় বোটে করে তারা রওনা দেয়। এক্ষেত্রে জেলে পরিচয়ও ব্যবহার করে তারা।পাচারকারীরা মূলত ভুক্তভোগীদের দারিদ্র্য এবং সামাজিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পাচারকারীরা ভালো চাকরি, মোটা অংকের বেতন এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এমনকি অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।

ডিএস./