০৬:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

আলোকিত লালমনিরহাটের তিস্তা সড়ক সেতু অন্ধকারে ঢাকা-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে চলাচলকারীরা

উত্তরবঙ্গের দুই সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ‘তিস্তা সড়ক সেতু’। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটিতে রাতের বেলায় নেমে আসে বাতির নিচে ঘন অন্ধকার। পর্যাপ্ত আলোর অভাব, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো ল্যাম্প পোস্ট এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে সেতুটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে চলাচলকারীরা।

লালমনিরহাট রেলওয়ে অফিস সূত্র জানায়, সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর ওপর ১৯০১ সালে রেল সেতুটি নির্মাণ করা হয়। যার ১০০ বছরের মেয়াদকাল শেষ হয় ২০০১ সালে। ১ হাজার ৯৫০ ফুট দীর্ঘ মেয়াদোত্তীর্ণ এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ১৪ টি ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ১৯৭৮ সালে রেলসেতুর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে বাস-ট্রাক চলাচলের উপযোগী করা হয়।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রবেশদ্বার তিস্তা রেলসেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে ২০১২ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ তিস্তা রেলসেতুর পাশে ৮৫০ মিটার দীর্ঘ তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণ করে। সেতু জুড়ে ৩০টি ল্যাম্পপোস্ট লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। সেতুটি উদ্বোধনের পর থেকে সরকার ইজারারের মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও রক্ষাণাবেক্ষনের অভাবে এই সেতুর অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্ট দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

অথচ প্রতিদিন দিন-রাত মিলে এ সেতু দিয়ে হাজার হাজার দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ভারী ট্রাক, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস, পিকআপ, থ্রি-হুইলার, রিকশা, অটোরিকশা-ভ্যান, গরু বোঝাই ভটভটি, নসিমন-করিমন, মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল যানবাহন চলাচল করে। লাইট কোনো কোনোটি জ্বললেও তা অপ্রতুল। সন্ধ্যা নামলেই পুরো সেতু ও এর সংযোগ সড়ক অন্ধকারে ঢেকে যায়।

এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সেতু ও এর আশপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় অবকাঠামো এভাবে আলোহীন ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখনো সেতুর ল্যাম্প পোস্টের নষ্ট বাতিগুলো মেরামত বা নতুন বাতি লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
স্থানীয় তিস্তার এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী জানান, সেতুর বাতিগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়। ঠিক মতো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বাতিগুলো বন্ধ হয়ে আছে। এগুলো দেখভালের জন্য কেউ আসেও না। আগে আমরা পরিবারের সদস্যরা সন্ধ্যা হলে হাঁটতে হাঁটতে সেতুতে যেতাম। কিন্তু এখন সন্ধ্যার পরই সেতুর ওপর অন্ধকার হয়ে যায়। এই অবস্থায় বখাটে ছেলেদের উৎপাতে সেতুতে চলাফেরা করাটা অনিরাপদ।

বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী পণ্যবাহী ট্রাকের চালক শফিকুল ইসলাম জানান, আলো না থাকায় রাতে সেতু অতিক্রম করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্ধকারে অনেক সময় ব্রিজের ওপর থেমে থাকা বিকল যানবাহন বা পথচারীদের দূর থেকে দেখা যায় না। ফলে প্রায়ই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী নৈশকোচ চালক সাইফুল আলম জানান, কয়েক মাস ধরে সেতুর ল্যাম্প পোস্টের নষ্ট বাতিগুলো মেরামত বা নতুন বাতি লাগানোর কোনো উদ্যোগ তাদের চোখে পড়েনি। অনতিবিলম্বে অকেজো ল্যাম্পপোস্টগুলো মেরামত করে পুরো সেতুতে আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তরবঙ্গের মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হলেও রাতে পারাপারে দুর্ঘটনা ও অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ছেন হাজার হাজার যাত্রী ও যানবাহন চালক।

লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ (সওজ) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোজামেল হক বলেন, তিস্তা সড়ক সেতুটি আলোয় আলোকিত করতে ৩০টি ল্যাম্পপোস্ট লাইট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ এর তার চুরির সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্ট লাইট নষ্ট হয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ এর তার চুরির ঘটনায় বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেন। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত রেল ও সড়ক সেতুতে সরাসরি কোনো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেই। তারপরেও সেতুর ওপর ৮/১০টি স্থানে আপতত সৌরবিদ্যুৎ লাইট স্থাপন করা হয়েছে।

​এ বিষয়ে লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী দেবাশীস সাহা বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের তার চুরি ও কিছু ল্যাম্পপোস্টের বাতি নষ্ট হয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। ইতিমধ্যে সেতুতে বিদ্যুৎ সংযোগ ও মেরামতের বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রনালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে।

ডিএস.

ট্যাগ :

আলোকিত লালমনিরহাটের তিস্তা সড়ক সেতু অন্ধকারে ঢাকা-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে চলাচলকারীরা

আলোকিত লালমনিরহাটের তিস্তা সড়ক সেতু অন্ধকারে ঢাকা-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে চলাচলকারীরা

প্রকাশিত : ০৬:২০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

উত্তরবঙ্গের দুই সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ‘তিস্তা সড়ক সেতু’। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটিতে রাতের বেলায় নেমে আসে বাতির নিচে ঘন অন্ধকার। পর্যাপ্ত আলোর অভাব, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো ল্যাম্প পোস্ট এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে সেতুটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে চলাচলকারীরা।

লালমনিরহাট রেলওয়ে অফিস সূত্র জানায়, সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর ওপর ১৯০১ সালে রেল সেতুটি নির্মাণ করা হয়। যার ১০০ বছরের মেয়াদকাল শেষ হয় ২০০১ সালে। ১ হাজার ৯৫০ ফুট দীর্ঘ মেয়াদোত্তীর্ণ এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ১৪ টি ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ১৯৭৮ সালে রেলসেতুর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে বাস-ট্রাক চলাচলের উপযোগী করা হয়।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রবেশদ্বার তিস্তা রেলসেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে ২০১২ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ তিস্তা রেলসেতুর পাশে ৮৫০ মিটার দীর্ঘ তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণ করে। সেতু জুড়ে ৩০টি ল্যাম্পপোস্ট লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। সেতুটি উদ্বোধনের পর থেকে সরকার ইজারারের মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও রক্ষাণাবেক্ষনের অভাবে এই সেতুর অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্ট দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

অথচ প্রতিদিন দিন-রাত মিলে এ সেতু দিয়ে হাজার হাজার দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ভারী ট্রাক, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস, পিকআপ, থ্রি-হুইলার, রিকশা, অটোরিকশা-ভ্যান, গরু বোঝাই ভটভটি, নসিমন-করিমন, মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল যানবাহন চলাচল করে। লাইট কোনো কোনোটি জ্বললেও তা অপ্রতুল। সন্ধ্যা নামলেই পুরো সেতু ও এর সংযোগ সড়ক অন্ধকারে ঢেকে যায়।

এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সেতু ও এর আশপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় অবকাঠামো এভাবে আলোহীন ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখনো সেতুর ল্যাম্প পোস্টের নষ্ট বাতিগুলো মেরামত বা নতুন বাতি লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
স্থানীয় তিস্তার এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী জানান, সেতুর বাতিগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়। ঠিক মতো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বাতিগুলো বন্ধ হয়ে আছে। এগুলো দেখভালের জন্য কেউ আসেও না। আগে আমরা পরিবারের সদস্যরা সন্ধ্যা হলে হাঁটতে হাঁটতে সেতুতে যেতাম। কিন্তু এখন সন্ধ্যার পরই সেতুর ওপর অন্ধকার হয়ে যায়। এই অবস্থায় বখাটে ছেলেদের উৎপাতে সেতুতে চলাফেরা করাটা অনিরাপদ।

বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী পণ্যবাহী ট্রাকের চালক শফিকুল ইসলাম জানান, আলো না থাকায় রাতে সেতু অতিক্রম করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্ধকারে অনেক সময় ব্রিজের ওপর থেমে থাকা বিকল যানবাহন বা পথচারীদের দূর থেকে দেখা যায় না। ফলে প্রায়ই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী নৈশকোচ চালক সাইফুল আলম জানান, কয়েক মাস ধরে সেতুর ল্যাম্প পোস্টের নষ্ট বাতিগুলো মেরামত বা নতুন বাতি লাগানোর কোনো উদ্যোগ তাদের চোখে পড়েনি। অনতিবিলম্বে অকেজো ল্যাম্পপোস্টগুলো মেরামত করে পুরো সেতুতে আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তরবঙ্গের মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হলেও রাতে পারাপারে দুর্ঘটনা ও অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ছেন হাজার হাজার যাত্রী ও যানবাহন চালক।

লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ (সওজ) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোজামেল হক বলেন, তিস্তা সড়ক সেতুটি আলোয় আলোকিত করতে ৩০টি ল্যাম্পপোস্ট লাইট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ এর তার চুরির সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্ট লাইট নষ্ট হয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ এর তার চুরির ঘটনায় বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেন। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত রেল ও সড়ক সেতুতে সরাসরি কোনো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেই। তারপরেও সেতুর ওপর ৮/১০টি স্থানে আপতত সৌরবিদ্যুৎ লাইট স্থাপন করা হয়েছে।

​এ বিষয়ে লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী দেবাশীস সাহা বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের তার চুরি ও কিছু ল্যাম্পপোস্টের বাতি নষ্ট হয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। ইতিমধ্যে সেতুতে বিদ্যুৎ সংযোগ ও মেরামতের বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রনালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে।

ডিএস.