চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গত ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে যশোরের সীমান্তবর্তী ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রামে জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে তার তিন থেকে চারজন সহযোগীসহ তাকে আটক করা হয় । ডেবিট ইমন গ্রেফতার হওয়ার পর ফের আলোচনায় আসে চট্টগ্রামের আলোচিত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন এসপি মো. মাসুদ আলম।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে পুলিশ সদস্যরা সরকারি হুকুম রক্ষায় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর চালিয়েছেন গুলি, লাঠিপেটা আর নিপীড়ন। শহীদ হয়েছেন বহু তরুণ, আহত হয়েছেন হাজারো। অনেক পুলিশ সদস্য শিক্ষার্থীদের মুখ চেপে ধরে রাখার চেষ্টাও করেছেন। যখন সারা দেশে পুলিশি দমন-পীড়ন চলছিল, তখন কিছু ব্যতিক্রমী পুলিশ সদস্য ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাদের মধ্যে মো. মাসুদ আলম অন্যতম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও ক্লিপে ডিসি মাসুদকে বলতে শোনা যায়, “আগে আমাকে মারতে হবে, তারপর যাইতে হবে। তার এই সাহসী বক্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং নেটিজেনরা তার সাহসিকতার জন্য তাকে সাধুবাদ জানান।
বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর রমনা বিভাগে ডিসি হিসেবে যোগদানের পরবর্তী সময়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যমুনা, সচিবালয়, হাইকোর্ট ও টিএসসি এলাকায় বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে হওয়া আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়।
এছাড়া গত ১৫ এপ্রিল সায়েন্সল্যাব মোড়ে সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময়ও তিনি আলোচনায় আসেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, “এই সংঘর্ষের কারণ আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।
রমনা বিভাগের থাকাকালীন সময়ে শত শত যৌক্তিক অযৌক্তিক দাবী দাওয়া ও আন্দোলন সামনে থেকে তিনি মোকাবিলা করেছিলেন । একের পর এক আন্দোলন মোকাবেলা করতে গিয়ে অসংখ্যবার আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন হসপিটালে ও যেতে হয়েছে বেশ কয়েকবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আওতাধীন দীর্ঘদিন ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিলো মাদকসহ ছিনতাইকারি ও অপরাধীদের দখলে। সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়মিত মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মাদকমুক্ত করতে তিনি জোরালো ভুমিকা রেখেছেন পরবর্তীতে তিনি সফল ও হয়েছেন । গত ১৫ এপ্রিল সায়েন্সল্যাব মোড়ে সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তিনি বলেছিলেন, ‘এই সংঘর্ষের কারণ আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।সেই আন্দোলন ও তিনি থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন ।
সচিবালয় এক কর্মকর্তার ছেলেকে তুলে নিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।দাবিকৃত টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।তিনি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে বিষয়টি অবগত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’কে। তারেক রহমান সরাসরি ডিসি মাসুদ আলম কে ফোন দিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে বলেন।প্রধানমন্ত্রী ফোন দেওয়ার এক ঘন্টার মধ্য অপহৃত সেই স্কুলছাত্রকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরে দিয়েছেন তৎকালীন ডিসি মাসুদ আলম। যার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ও প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার কোচকুড়ি গ্রামের আলহাজ মোজাম্মেল হক ও মৃত মেহেরুন নেছা দম্পতির সন্তান মাসুদ আলম। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে চতুর্থ তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ও দুই ছেলে সন্তান ও এক মেয়ের জনক।
২৮ তম বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন মাসুদ আলম। রাজশাহীর সারদায় প্রশিক্ষণ শেষে ২০১২ সালের শুরুতে দিনাজপুর জেলা পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন। ২০২০ সালের ২৩ জুলাই তিনি পাবনা জেলা পুলিশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন।
পাবনায় যোগদানের পর থেকেই তিনি সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দেন। কাজ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার নাম হয়ে উঠেছেন মাসুদ আলম।র্যাব-৬ এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প এবং পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এরপর বদলি করে তাকে পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ সুপার করা হয়।
গত ৫ মে ২০২৬ ইং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের পর উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমকে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে বদলি করা হয়। গত ৭ মে চট্টগ্রাম জেলার নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে মো. মাসুদ আলম। দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইন্সে তাঁকে সম্মানসূচক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এ সময় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
পুলিশ সুপার হিসেবে চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে জেলা পুলিশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জেলার সদ্য যোগদানকৃত পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে আর ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ হিসেবে থাকতে দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে মানুষের বসবাস যোগ্য নিরাপদ করে গড়ে তুলেছেন যাতে করে বর্তমানে সেখানে ছুরি ছিনতাই মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য কমে গেছে ।
জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এসপি বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জায়গাটি নিয়ে নানা গল্প শুনেছি। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও আলোচিত ছিল। অবশ্য যৌথবাহিনীর অভিযান ও সাম্প্রতিক কার্যক্রমে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। জঙ্গল সলিমপুরকে কেউ যেন দেশের ভেতরে আরেকটা দেশ মনে না করে, আমরা সেটা নিশ্চিত করতে চাই। সেখানে স্থায়ীভাবে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আপাতত দুটি স্কুলে অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে এবং স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার ও পুলিশ একাডেমি স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। এর ফলে ওই এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হবে।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আরো বলেন, “যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; আর যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবেই বাংলাদেশ।কোনো একটি অপরাধীচক্রকে গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অপরাধের মূল কারণ ও উৎস খুঁজে বের করে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে কেউ অপরাধের পথে না যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে নতুন করে যেন আর কোনো ‘ইরান’ তৈরি না হয়।” একজন তরুণ কী কারণে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, কোন পরিস্থিতি তাকে বিপথে ঠেলে দেয় এবং কোথায় সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল এসব বিষয় চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাই অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়।
ডিএস./





















