প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলমান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের কাজ মাঝপথে রেখে প্রকল্প সমাপ্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি রাজউকের কাঁধে ঝুলে থাকায় প্রতিনিয়ত বদনাম হচ্ছে। তাই এ প্রকল্পটি আর টেনে না নিয়ে অনেক কাজ অসমাপ্ত থাকতেই এর ইতি টানা হচ্ছে। তবে বাকি থাকা কাজগুলো পরবর্তী সময়ে সরকার চাইলে ছোট ছোট প্রকল্পে হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. আনোয়ার হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা আর পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পটি বাড়াতে চাইছি না। যে কাজ বাকি আছে তা অসমাপ্ত অবস্থায় আগামী বছরের শুরুতেই প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে।
এ প্রকল্পটি চলমান থাকায় রাজউকের অনেক বদনাম হচ্ছে। বাস্তবতা হলো- সেখানে আমরা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ ভূমি দিয়েছি। কিন্তু তারা সেখানে যাচ্ছে না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যে সব সেক্টরে আমরা প্লট মালিকদের জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছি, তারাও সেখানে যাচ্ছে না। ফলে আমরা সেখানে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যে সব ড্রেন করা হয়েছে সেখানে লোকজন বাঁধ দিয়ে পানি সেচের ব্যবস্থা করে। আবার প্লট মালিকদের অভিযোগ সব সেবা না পৌঁছায় সেখানে এখনই বসতবাড়ি করে বসবাসের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে এ অবস্থায় রাজউক কিছুটা বিপাকে রয়েছে। তাই প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, আমরা তো প্লট মালিকদের বিপদে রাখব না। এখন যেসব কাজ বাকি আছে তা ধীরে ধীরে করব। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্রকল্প হাতে নেয়া হবে।
রাউজক সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জের ছয় হাজার ১৫০ একর জমিতে বাস্তবায়ন শুরু হয় পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প। এরই মধ্যে ২০ হাজারের মতো প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কয়েক হাজার গ্রাহক প্লট বুঝে পেয়েছেন। সেগুলোতেও ঘরবাড়ি তৈরির মতো সেবা সুবিধা নেই। তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০১০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল।
এরপর আরো দুদফা সময় বাড়িয়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তাও সম্ভব হয়নি। কবে যে শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না রাজউকও। কিছু এলাকায় রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি হলেও ফুটপাত, লেক খনন, বনায়ন কাজ হয়নি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও স্যুয়ারেজের কোনোটারই ব্যবস্থা নেই। মোট ৩৩টি সেক্টরের মধ্যে ১৫-১৬টি সেক্টর বাড়ি করার মতো হয়েছে বলে রাজউক দাবি করলেও বাস্তব চিত্র হতাশাজনক।
রাজউকের প্রকৌশল দপ্তর জানায়, ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ নতুন শহর করাই ছিল পূর্বাচল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ২৭৭ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অংশে রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৩৬ একর এবং গাজীপুর অংশে ১ হাজার ৫০০ একর জমি; যা ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে।
বাকি ১৫০ একর জমি ঢাকা জেলার খিলক্ষেত থানায় কুড়িল ফ্লাইওভার এবং লিংক রোড নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিভিন্ন আকারের মোট ২৭ হাজার ১৭১টি প্লট এবং ৬২ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটির সর্বশেষ সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৭৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণ রাজউকের নিজস্ব অর্থ।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিল। যা পরে সংশোধন করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও তারা কাজ সমাপ্ত করতে পারবে না। তাই কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই এখন প্রকল্প সমাপ্ত করতে চাইছে সংস্থাটি। এতে প্লট গ্রহীতাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকে তার প্লটের পুরো কিস্তি পরিশোধ করেও নিজের নামে বরাদ্দ পাওয়া প্লটে যেতে পারেননি।
এরই মধ্যে ২১ জুলাই পূর্বাচলে খাল খননের কাজ উদ্বোধনের সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে পূর্বাচলে বাড়ি করা যাবে। এ প্রকল্প আর ধীর গতি থাকবে না। এখানে নকশা অনুমোদনের মাধ্যমে এ বছরের শেষের দিকে বাড়ি করা যাবে।
























