সুদের হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও চাহিদা মতো মেলে না ব্যাংক ঋণ। তাছাড়া ঋণ পেতে লবিং-তদবির থেকে শুরু করে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়; সম্পদ জামানত রাখতে হয়। উৎকোচ হিসেবেও গুনতে হয় বিশাল অঙ্কের অর্থ। উপরন্তু নির্বাচনী বছরে লাগাম টানা হচ্ছে ব্যাংক ঋণ বিতরণেও। সবদিক বিবেচনায় বর্তমানে ব্যাংক ঋণের তুলনায় পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করা সহজ। তাছাড়া পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ দেয়ারও বাধ্যবাধকতা নেই। তাই ব্যাংক থেকে বড় ঋণ পেতে ব্যর্থরা এখন ভিড় জমাচ্ছেন পুঁজিবাজারে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) ইস্যু ঘিরে এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এই সিন্ডিকেট শেয়ারদর অতি মূল্যায়নের মাধ্যমে কাঁচা টাকা কামানোর সুযোগ করে দেয়। নির্বাচনী বছরে এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না বিভিন্ন কোম্পানির মালিকরা। তারা এখন আইপিও অনুমোদনের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। যদিও এই প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জানা গেছে, আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এখন শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে। কেননা, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিডিং করে শেয়ারদর অতিমূল্যায়ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এভাবে অতি উচ্চমূল্য নির্ধারণের পর ১০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য কাট অব প্রাইস নির্ধারণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আইপিও উত্তোলন প্রক্রিয়ায় বড় বড় কোম্পানিগুলো স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে সমঝোতা করে কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এতে বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ মুনাফার সুযোগ পেয়ে যান উদ্যেক্তারা। রাতারাতি তাদের সম্পদ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে উৎপাদনের দিকে নজর না দিয়ে বরং মুনাফার তথ্য কারসাজির মাধ্যমে কত বেশি দামে পুঁজিবাজারে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করা যাবে সেই খেলায় মেতে ওঠেন অসাধু উদ্যোক্তারা। তারপর কোনোমতে লকইন পিরিয়ড (পুঁজিবাজারে আসার ৩ বছরের মধ্যে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা) পেরিয়ে চড়া দামে অধিকাংশ শেয়ার সাধারণ বিনোয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেন তারা।
এই কারণে গত ৫ বছরে আইপিও তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়লেও বাজারের তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না। অথচ দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আর পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব কাজের জন্য শতভাগ দায়ী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সাধারণ বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা দেয়ার কথা থাকলেও বিএসইসি বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সহজে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ২৭ লাখ বিনিয়োগকারী।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, এখন বিডিং হয় কতদামে শেয়ারবাজারে বিক্রি করা যাবে। কতটা মৌলভিত্তির কোম্পানি এসব বিবেচনায় নেয়া হয় না। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। নির্ধারিত সময় পরে শেয়ার বিক্রি করে মার্কেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এটা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। অবশ্য এর জন্য দায়ী বিএসইসি। যদি প্রতিষ্ঠানটির মনিটরিংসহ কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারত তাইলে শেয়ারদর অতিমূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতো না।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে ৮৩০ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালে ৮৪৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে বিভিন্ন কোম্পানি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বিএসইসি ২১৯.২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়। তবে নির্বাচনী বছরের এই অনুমোদনের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের গত ১০ মাসে ১৬ কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। এসব কোম্পানি বাজার থেকে ৮৫৩ কোটি টাকা উত্তোলন করবে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে ৫ কোম্পানি। এগুলো হলো এসকোয়ার নিট ১৫০ কোটি টাকা, এস এস স্টিল ১২৫ কোটি টাকা, জিনিক্স ইনফোয়েজ ২০ কোটি টাকা, রানার অটোমোবাইল ১০০ কোটি টাকা, এডিএন টেলিকম ৫৭ কোটি টাকা। এর বাইরে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল ৬০ কোটি টাকা, এসটিএস হোল্ডিং ৭৫ কোটি টাকা, বেঙ্গল পলি এন্ড পেপার ৫৫ কোটি টাকা, পপুলার ফার্মা ৭০ কোটি টাকা, ইনডেক্স এগ্রো ১০০ কোটি টাকা, ডেল্টা হসপিটাল ৫০ কোটি টাকা, শামছুল আল আমিন রিয়েল এস্টেট ৮০ কোটি টাকা এবং এমুলেট ফার্মা ১৫ কোটি টাকা তুলতে চায় পুঁজিবাজার থেকে।
বিবি/রেআ


























