করোনা সময় পৃথিবীর কাছে দুঃস্বপ্নের মত। চাকরিজীবীরা চাকরি বাদ দিয়ে ঘরে বসে আছে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছে না, এমনকি বিশেষ কাজ ছাড়া কেউই ঘরের বাহিরে যেতে পারছে না। সরকারি ত্রাণের পাশাপাশি ব্যাক্তি উদ্যোগে কিংবা সংঠনের মাধমে অনেকে এগিয়ে আসছে। এই দুঃসময়ে সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সাহায্য করে যাচ্ছে। অন্যান্য সবার মত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদেরও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। করোনার কারণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা সমাজের কল্যানে ত্রাণ বিতরণ, জীবাণুনাশক ছিটানো ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে সমাজের কল্যানে অবদান রাখছে। তারা এইসব কাজ করছে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে। অনেক ক্ষেত্রে সেই সকল সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কও তারা। পুরো বাংলাদেশে এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু সংগঠন। সেরকমই কিছু সংগঠন এবং তাদের কার্যক্রম তুলে ধরেছেন ইকবাল হাসান
সংশপ্তক
প্রথমে বলা যায় “সংশপ্তক” নামক সংগঠনের কথা। সংগঠনটি ইতিমধ্যে অনেক পরিবারের মাঝে হাঁসি ফুটিয়েছে। ‘সংশপ্তক’র সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জহিরুল ইসলাম এর কাছে সংঠনটির কার্যক্রম জানতে চাইলে তিনি বলেন,”সংশপ্তক’র মোট ৬৩৩ জন সাধারণ সদস্য এবং ১৩ জন ডাক্তার ও ৪১ মেডিকেল স্টুডেন্ট মিলে মোট ১৭ টি টিমে ভাগ হয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে নাঙ্গলকোট উপজেলার সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। নাঙ্গলকোটের সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসন আমাদের এই মহৎ কাজে সহযোগিতা করেছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে থাকার জন্য এগিয়ে এসেছে। আমরা ১৭০০ কর্মহীন পরিবারের মাঝে খাবার বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি এবং সামনেও আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবো।”
পোনসাই কমপ্লেক্স
দ্বিতীয় সংগঠনটি হচ্ছে, কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার সংগঠন “পোনসাই কমপ্লেক্স”। চান্দিনা উপজেলার বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে। আর আর্থিক যোগানটা “পোনসাই কমপ্লেক্স” এর প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দেশের ও দেশের বাইরের পরিচিত দাতাদের থেকে সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। “পোনসাই কমপ্লেক্স” এর প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, “সুনাগরিক হিসেবে সবারই দায়িত্ব দেশের কিংবা সমাজের সংকটে এগিয়ে আসা। যেহেতু এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ এবং শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছে তাই তাদের ত্রাণকাজে সহযোগীর ভূমিকা পালন করার বিশাল এক সুযোগ যা তাদের পরবর্তী জীবনে স্মৃতি হয়ে থাকবে। তাই যারা সময়ের প্রয়োজনে এই কাজে নিজেদের যুক্ত করেছে তারা সেই কাজটিই করেছে যা তাদের করা উচিত। আর যারা যুক্ত হতে পারেনি তাদের ও উচিত যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে সময়ের সঠিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়া।”
যুক্তবর্ণ
তৃতীয় সংগঠনটি হলো, রাণীশংকৈল উপজেলার “যুক্তবর্ণ”। সংগঠনটির পথচলা শুরু হয় ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট। সংগঠনটির সমন্বয়ক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাকিব হোসেন করোনা সময়ে তাদের নেয়া উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও সচেতনতা নিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এই ক্রান্তিকালে সকল নাগরিকের এগিয়ে আসা উচিত। এই মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা হওয়ার পরে আমি আমার গ্রামে বাড়ি চলে আসি। পরবর্তীতে আমাদের সকল বন্ধুদের একত্রিত করে। বর্তমানে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যায়নরত আছে। তাদের নিয়ে আমাদের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যুক্তবর্ণের মাধ্যমে জনগণকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও সচেতন করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেমন বাজার, চৌরাস্তা মোড়, হাসপাতাল, মসজিদ ইত্যাদি জায়গায় ব্যানার লাগাই। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের মাঝেও করোনাভাইরাস এর প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করি। আমরা আমাদের রাণীশংকৈল উপজেলার জনগণকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও সচেতন করতে এইসব উদ্যোগ গ্রহণ করি।
ঊষা
চতুর্থ সংগঠনটি হলো, ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ঊষা)। এটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার একটি স্বেচ্ছাসেবী ছাত্র সংগঠন। এই সংগঠনটির সমন্বয়ক হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদি আনজাম হাসিব। করোনা সময়ে ঊষার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের যেকোন দুর্যোগকালীন সময়ে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মানুষের পাশে ছিলো ঊষা পরিবার। এই করনাকালীন সময়েও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।দেশের এই ক্রান্তিলগ্নেও আমরা ঊষা পরিবারের পক্ষ থেকে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার ২৩০ টি কর্মহীন,নিম্মবিত্ত পরিবারকে উপহারস্বরুপ ৩ দিনের খাদ্যসামগ্রী দিয়েছি।উপজেলা ছাত্রসংগঠন হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যেটা সম্ভব হয়েছে আমাদের সম্মানিত সদস্য ও বর্তমান সদস্যদের সহযোগিতায়। আমাদের এই কাজ অব্যাহত থাকবে।যেখানেই খবর পাবো কেউ খাদ্য অভাবে আছে সেখানেই খাদ্য পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।”
সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে মানুষের আচার-আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ, খাদ্যাভ্যাস সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে। করোনা হয়তো পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে কিন্তু কিছু পরিবর্তন দিয়ে যাবে। সেই পরিবর্তনকে সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এই যে, শিক্ষার্থীরা এক হয়ে নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছে এটা স্বাধীনতার পর আর সেরকমভাবে দেখা না গেলেও দেশের ক্রান্তিলগ্নে আবার সেই পুরোনো উদ্বীপনা লক্ষ করা গিয়েছে।এভাবেই শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্ররা মানব সেবায় এগিয়ে আসুক। শুধু ছাত্র নয় একজন নাগরিক হিসেবে সকলে নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসলে একটি সুস্থ, সবুজ-শ্যামলা দেশে আবার আমাদের দেখা হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক





















