ঢাকা দুপুর ১২:২৬, মঙ্গলবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে আইন না মানলে ব্যবস্থার ইঙ্গিত

করোনা মহামারীকালে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে ব্যাংকগুলো আইন না মানলে ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। সরকার অর্থ দেয়ার পরও ‘প্রণোদনার বড় একটা অংশ’ যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। কেন এমন হচ্ছে সেটা অর্থ সচিব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে খতিয়ে দেখতেও বলেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রী।

কোভিড-১৯ মোকাবিলা এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ সরকারের দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজের দ্বিতীয় সভা ‘কর্মসৃজন ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন’ শীর্ষক সিরিজ মতবিনিময় সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী একথা বলেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অর্থ সচিব আব্দুর রউফ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির উপস্থিত ছিলেন।

মহামারি করোনার জন্য ঘোষিত প্রণোদনার অর্থর বড় একটা অংশ যাচ্ছে না জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের চ্যানেলটা ব্যাংকিং। আমি কাউকে দোষ দেব না, এখানে অর্থ সচিব ও গভর্নর আছেন ব্যাংকগুলো থেকে অনেকেই সহায়তা পাননি। কেন এটা হলো? আমাদের অর্থ ছিল, অর্থ দিয়েছি।’

‘আজকে এখানে অর্থ খাতের দুই প্রধান ব্যক্তি এখানে আছেন। আইন মানতে তারা বাধ্য, আইন আইনই তা অসম্মান করা যাবে না। তাহলে কী করতে হবে? আমাদের তথ্য হলো কেউ কেউ আইন মানছেন না। যদি কোনো ব্যাংক আপনার কথা না মানে তাহলে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কারণ আমরা সবাই একই পথের যাত্রী।’

কথা শুনলে আইন না মানলে প্রয়োজনে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতে হবে উল্লেখ করে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ‘একইসঙ্গে প্রণোদনার পর প্রণোদনা এটাও সঠিক মাধ্যম নয়। এ জন্য প্রণোদনা ভর্তুকি কমিয়ে যদি পলিসি সার্পোট বেশি দেই ও সংস্কার করি তাহলে আমাদের রিটার্ন বেশি হবে। আমাদের উদারতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কৌশলের মূল বার্তা সাবলম্বী করা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অনেক অর্জন আছে। কিন্তু কাজ করতে হবে আমাদের। আমাদের সবাইকে সার্বিকভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো মিস টার্গেটিং। এর ফলে আমরা সার্বিকভাবে রিটার্ন কম পাচ্ছি।’

দেশের এসএমই খাতে টাকা যাচ্ছে না কিন্তু কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অধিকাংশ উদ্যোক্তার ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, তারা পারিবারিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে। তারা ব্যাংকে যায় না, আসেও না। তাদের ব্যাংকের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে প্রণোদনা কাজে আসবে না। কারণ মানুষ টাকা চায় বা লাগে। কিন্তু সেখানে আমরা প্রণোদনা যাই হোক দিচ্ছি। তার যদি শক্তি না থাকে প্রণোদনা-ভর্তুকি দিয়ে লাভ হবে না। এজন্য প্রণোদনা ভর্তুকি কমিয়ে যদি পলিসি সার্পোট বেশি দেই ও সংস্কার করি তাহলে আমাদের রিটার্ন বেশি হবে। কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রণোদনার পর প্রণোদনা এটা সঠিক মাধ্যম নয়। এজন্য আমাদের সংস্কার ও উদারতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও টেকনোলজিস নিয়ে ভাবতে হবে।

এম এ মান্নান বলেন, গত কয়েক বছর আমাদের অর্থনীতিতে সফল্য অর্জিত হয়েছে। আমরা যে কৌশলে সাফল্য অর্জন করেছি সেটা হলো প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনায়। আমরা আমাদের অর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ভালো কাজ করছি। ফলে করোনাকালেও আমাদের অর্থনীতি ও অর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক উপকার হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেকেই আশঙ্কা করেছিল যে কোভিডে আমাদের অবস্থা খারাপ হবে। কিন্তু আমরা ভালো লড়াই করেছি। ফলে অতি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েছি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। এতে তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় পরিকল্পনা করার সময় চিন্তা করতে হয় যেন, মৃত্যু কম হয়, ক্ষুধার্তের সংখ্যা না বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ অব্যাহত থাকে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল থাকে।

আব্দুর রউফ বলেন, মার্চ থেকে অক্টোবর, করোনা আক্রান্তের ৮ মাসের প্রথম ৪ মাস অর্থনীতি থমকে ছিল। এর পরবর্তী ৪ মাস আবার ধারাবাহিকভাবে উত্তরণ ঘটেছে। জুলাই থেকে অক্টোবর চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৯৪ শতাংশ, গত ৫ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের হিসাবে আমদানি ব্যয় কমেছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ড. মাসুদুর রহমান বলেন, করোনার কারণে পুঁজি হারিয়েছেন দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। কিন্তু এ খাতে দেয়া ২০ হাজার কোটি টাকার মাত্র অর্ধেক পরিমাণ অর্থ উদ্যোক্তাদের বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ পেতে বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে না পারায় ৮০ শতাংশ উদ্যোক্তাই ঋণ পাচ্ছে না।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা ভালো দিক যে এই মহামারিকালেও বাংলাদেশ খাদ্য সংকটে পড়েনি। তবে আমাদেরকে অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে অবশ্যই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, কর্মসংস্থানের ৪০ ভাগই এ খাতের। এছাড়া জিডিপির ১৩ শতাংশের যোগানও দিচ্ছে এই কৃষিখাত। তাই ঋণ সুবিধা, নীতিগত সুবিধা ও পণ্যের বাজারজাতকরণে এই খাতে বেশি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক- এডিবি’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ বলেন, করোনার তাণ্ডব শহরের তুলনায় গ্রামে বেশ কম। তাই এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ দেখা যায়, অনেকক্ষেত্রেই উৎপাদকরা (চাষি এবং কৃষক) বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে যথাযথ উপায়ে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছাতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বড় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম বলেন, গত জুলাই থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এতে আরো গতি আনতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সেজন্য অবশ্যই ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে আমলে নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ