০২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান নেই সরকারী কোন দপ্তরে

নাটোরের খাল-বিল, নদী ও পুকুর বা ডোবার পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর মত ঘটনা অহরহ ঘটলেও সরকারি বা বেসরকারি কোন দপ্তরেই এর কোন পরিসংখ্যান নেই।

গত তিনদিন ধরে জেলার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজখবর নিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কোন তথ্যই দিতে পারেননি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই , তাই এই ব্যাপারে তথ্য রাখার প্রয়োজন হয়নি ।

তবে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, গত ১১ মাসে জেলার সাতটি উপজেলায় অন্তত ২৩ জন বিভিন্ন বয়সের শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। বিশেষ করে চলনবিল ও হালতিবিল অধ্যুষিত এলাকায় এই মৃত্যুর হার বেশি। এতে ১০ বছর বয়সের চেয়ে কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে জানা গেছে।

আর অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাড়ির পাশে পুকুর কিংবা ডোবা, নদী ও বিলের পানিতে পড়ে। অথচ থানা, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, পরিসংখ্যান বিভাগ, জেলা প্রশাসন সহ কোথাও এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে কোনো কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কোন দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু এবং এ বিষয়ে কোন তথ্য না রাখা নিয়ে নানা রকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনরা। কেউ কেউ বলছেন, মা ও অভিভাবকদের গাফিলতি এবং অসাবধানতাই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ। আবার অনেকেই বলেছেন, দারিদ্রতা, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে।

আর খেলতে খেলতেই বাড়ির পাশে ডোবা, খাল, পুকুর ও বিলের পানিতে পড়ে মারা যায় এসব শিশুরা। শিশুর মা ও অভিভাবকগণ সচেতন থাকলে বা নজরে রাখলে এসব দুর্ঘটনা ঘটতো না। কাজেই শিশুমৃত্যুর হার কমাতে চাইলে প্রথমে পরিবার এবং তার পাশের লোকজনকে সচেতন হতে হবে ।

অন্যদিকে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান না থাকা বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনাটা অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। যা নিকটস্থ থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করার কথা। কিন্তু অভিভাবকরা শিশুদের মৃতদেহ কাটা ছেড়ার ভয়ে থানা পুলিশকে এড়িয়ে চলেন।

এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অবহিত করা হয় না। ঘটনা ঘটার পর পরই মরদেহ দাফন করা হয়। ফলে ঘটনাটি আড়ালেই রয়ে যায়। এজন্য থানা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ সহ কোন দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি নথিযুক্ত হয় না।

বজ্রপাত বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সরকারি ভাবে তথ্য রাখা হলেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোন তথ্য রাখা হয় না। তবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু সংখ্যা নির্ধারণে প্রশাসনের ভূমিকা রাখা জরুরি বলে অনেকে মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, তার ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় কোনো শিশু মারা গেলে অভিভাবকরা মৃত্যু সনদ নিতে পরিষদে আসেন। এ সময় তাদের মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়। তবে কি কারণে মারা গেছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয় না। আর পানিতে পড়ে মারা যাওয়া শিশু মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান তাদের অফিসে রাখা হয় না।

কারন এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে নেই। অন্যান্য বিষয়ে তথ্য রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ব্যাপারে নেই। তাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান রাখা হয় না। তবে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি বলে দাবী করেন তিনি ।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে নাটোরের এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা “আলোর ” নির্বাহী পরিচালক শামীমা লাইজু নীলা বলেন, তারা প্রতিনিয়ত মা-ও-শিশু নিয়ে কাজ করেন এবং শিশুদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করেন। কিন্তু পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে কোন তথ্য উপাত্ত তাদের কাছে নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া জরুরী।

এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর তথ্য ও পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে অথবা সামাজিকভাবে এবং পারিবারিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ করতে পারে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানো যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নাটোর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মোঃ আক্তার হোসেন জানান, দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটলে সেগুলোর তথ্য তাদেরকে রাখতে হয়। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর তথ্য বা পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র ডুবুরিরা যে সমস্ত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন সেগুলোর তথ্য রাখা হয়। বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও তাদের কাছে কোন খবর আসে না । তাই তারা এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকাও রাখতে পারেন না।

তবে এই বিষয়ে রাজশাহী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি দলের কাছে এসব তথ্য থাকতে পারে। তার জানামতে, গত ১১ মাসে নাটোরের দুটি স্থানে পানিতে ডুবে শিশু নিখোঁজের পর রাজশাহী থেকে ডুবুরিদল এসেছিলেন এবং মরদেহ উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা না থাকলেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ করা দরকার।

তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, কেবলমাত্র পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে সচেতনতাই পারে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে । পারিবারিক অসাবধানতা ও অসচেতনতার কারণে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও দাবি করেন।
শিশুরা পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় এবং অল্প পানিতে পড়ে গেলেও শিশুরা বাঁচতে পারেন না।

নাটোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার কাজী মিজানুর রহমান জানান, হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক শিশুকে নিয়ে আসা হয়। সেগুলো রেজিস্টার্ড খাতায় নথিভূক্ত করা হলেও সেগুলো কি করে মৃত্যু হয়েছে তা উল্লেখ করা হয় না। বজ্রপাত বা অন্য কোন দুর্ঘটনাজনিত কারণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে তথ্য রাখা হয় । কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে কোন তথ্য হাসপাতালে রাখা হয় না। তিনি বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। তবে এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মশালা অথবা সরকারী বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও প্রচার প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

নাটোর জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপ পরিচালক মোঃ শাহ আলম বলেন, এ সংক্রান্ত তথ্য তার দপ্তরে নেই। সরকারিভাবে নির্দেশনা পেলে এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনিও পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন।

নাটোরের স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) মোঃ গোলাম রাব্বী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে শিশু সহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মৃত্যু সনদ দেয়া হয়। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি আলাদা করে কোন নথিতে রাখা হয় না। এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোন নির্দেশনা নেই । পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনরা দাফন সম্পন্ন করেন। এটি একটি অপমৃত্যু জেনেও থানা পুলিশকে অবহিত থেকে বিরত থাকেন। ফলে এই শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান নির্ণয় করা যায় না ।

নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেন, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে কোন কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে থানাগুলোতেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। এছাড়া পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু মৃত্যুর পর অভিভাবকরা থানায় কোন অভিযোগ বা তথ্য প্রদান করেন না। ফলে বিষয়টি আড়ালেই রয়ে যায়। এসব কারণে থানাগুলোতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা দরকার।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ জানান, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে সরকারি কোন দপ্তরে তথ্য নেই। কারণ এ সংক্রান্ত সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। তাই কোন অফিস এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। তবে শিশু মৃত্যু রোধে করনীয় প্রসঙ্গে বলেন, পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও সহযোগীতা মূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) পরিচালক ডঃ আমিনুর রহমানের এক গবেষনা মতে জানা যায়, দারিদ্র, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবের কারনে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ শিশুরা ডুকছে বাড়ির ২০ গজের মধ্যে এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে মূলত সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১ টার মধ্যে। কারণ এই সময়ে মা-বাবাসহ পরিবারের লোকজন এবং শিশুদের পরিচর্যা কারীরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও উদ্বেগের বিষয় হলো বাড়ির আশেপাশের ডোবা, নালা, খাল, বিল সবকিছু উন্মুক্ত। কাজেই শিশুরা অন্যদের অলক্ষ্যে অবাধে জলাশয় চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। দিনের প্রথম ভাগে শিশুদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হলে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব হবে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, প্রতিবছর ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান । এদের ২০ শতাংশের বয়স ৫ বছরের কম। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম । বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী মোট শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী পানিতে ডুবে যাওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় । বছরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার। এছাড়া পানিতে ডোবার কারণে আরো ১৩ হাজার শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। আর ১ লাখ শিশু পানিতে ডোবা কারণে বিভিন্ন ভাবে আহত হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ট্রেনে ঈদ যাত্রার শেষ দিনের টিকিট বিক্রি আজ

পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান নেই সরকারী কোন দপ্তরে

প্রকাশিত : ১০:০২:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২০

নাটোরের খাল-বিল, নদী ও পুকুর বা ডোবার পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর মত ঘটনা অহরহ ঘটলেও সরকারি বা বেসরকারি কোন দপ্তরেই এর কোন পরিসংখ্যান নেই।

গত তিনদিন ধরে জেলার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজখবর নিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কোন তথ্যই দিতে পারেননি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই , তাই এই ব্যাপারে তথ্য রাখার প্রয়োজন হয়নি ।

তবে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, গত ১১ মাসে জেলার সাতটি উপজেলায় অন্তত ২৩ জন বিভিন্ন বয়সের শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। বিশেষ করে চলনবিল ও হালতিবিল অধ্যুষিত এলাকায় এই মৃত্যুর হার বেশি। এতে ১০ বছর বয়সের চেয়ে কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে জানা গেছে।

আর অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাড়ির পাশে পুকুর কিংবা ডোবা, নদী ও বিলের পানিতে পড়ে। অথচ থানা, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, পরিসংখ্যান বিভাগ, জেলা প্রশাসন সহ কোথাও এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে কোনো কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কোন দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু এবং এ বিষয়ে কোন তথ্য না রাখা নিয়ে নানা রকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনরা। কেউ কেউ বলছেন, মা ও অভিভাবকদের গাফিলতি এবং অসাবধানতাই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ। আবার অনেকেই বলেছেন, দারিদ্রতা, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে।

আর খেলতে খেলতেই বাড়ির পাশে ডোবা, খাল, পুকুর ও বিলের পানিতে পড়ে মারা যায় এসব শিশুরা। শিশুর মা ও অভিভাবকগণ সচেতন থাকলে বা নজরে রাখলে এসব দুর্ঘটনা ঘটতো না। কাজেই শিশুমৃত্যুর হার কমাতে চাইলে প্রথমে পরিবার এবং তার পাশের লোকজনকে সচেতন হতে হবে ।

অন্যদিকে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান না থাকা বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনাটা অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। যা নিকটস্থ থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করার কথা। কিন্তু অভিভাবকরা শিশুদের মৃতদেহ কাটা ছেড়ার ভয়ে থানা পুলিশকে এড়িয়ে চলেন।

এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অবহিত করা হয় না। ঘটনা ঘটার পর পরই মরদেহ দাফন করা হয়। ফলে ঘটনাটি আড়ালেই রয়ে যায়। এজন্য থানা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ সহ কোন দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি নথিযুক্ত হয় না।

বজ্রপাত বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সরকারি ভাবে তথ্য রাখা হলেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোন তথ্য রাখা হয় না। তবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু সংখ্যা নির্ধারণে প্রশাসনের ভূমিকা রাখা জরুরি বলে অনেকে মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, তার ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় কোনো শিশু মারা গেলে অভিভাবকরা মৃত্যু সনদ নিতে পরিষদে আসেন। এ সময় তাদের মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়। তবে কি কারণে মারা গেছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয় না। আর পানিতে পড়ে মারা যাওয়া শিশু মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান তাদের অফিসে রাখা হয় না।

কারন এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে নেই। অন্যান্য বিষয়ে তথ্য রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ব্যাপারে নেই। তাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান রাখা হয় না। তবে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি বলে দাবী করেন তিনি ।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে নাটোরের এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা “আলোর ” নির্বাহী পরিচালক শামীমা লাইজু নীলা বলেন, তারা প্রতিনিয়ত মা-ও-শিশু নিয়ে কাজ করেন এবং শিশুদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করেন। কিন্তু পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে কোন তথ্য উপাত্ত তাদের কাছে নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া জরুরী।

এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর তথ্য ও পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে অথবা সামাজিকভাবে এবং পারিবারিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ করতে পারে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানো যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নাটোর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মোঃ আক্তার হোসেন জানান, দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটলে সেগুলোর তথ্য তাদেরকে রাখতে হয়। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর তথ্য বা পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র ডুবুরিরা যে সমস্ত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন সেগুলোর তথ্য রাখা হয়। বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও তাদের কাছে কোন খবর আসে না । তাই তারা এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকাও রাখতে পারেন না।

তবে এই বিষয়ে রাজশাহী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি দলের কাছে এসব তথ্য থাকতে পারে। তার জানামতে, গত ১১ মাসে নাটোরের দুটি স্থানে পানিতে ডুবে শিশু নিখোঁজের পর রাজশাহী থেকে ডুবুরিদল এসেছিলেন এবং মরদেহ উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা না থাকলেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ করা দরকার।

তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, কেবলমাত্র পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে সচেতনতাই পারে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে । পারিবারিক অসাবধানতা ও অসচেতনতার কারণে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও দাবি করেন।
শিশুরা পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় এবং অল্প পানিতে পড়ে গেলেও শিশুরা বাঁচতে পারেন না।

নাটোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার কাজী মিজানুর রহমান জানান, হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক শিশুকে নিয়ে আসা হয়। সেগুলো রেজিস্টার্ড খাতায় নথিভূক্ত করা হলেও সেগুলো কি করে মৃত্যু হয়েছে তা উল্লেখ করা হয় না। বজ্রপাত বা অন্য কোন দুর্ঘটনাজনিত কারণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে তথ্য রাখা হয় । কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে কোন তথ্য হাসপাতালে রাখা হয় না। তিনি বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। তবে এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মশালা অথবা সরকারী বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও প্রচার প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

নাটোর জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপ পরিচালক মোঃ শাহ আলম বলেন, এ সংক্রান্ত তথ্য তার দপ্তরে নেই। সরকারিভাবে নির্দেশনা পেলে এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনিও পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন।

নাটোরের স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) মোঃ গোলাম রাব্বী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে শিশু সহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মৃত্যু সনদ দেয়া হয়। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি আলাদা করে কোন নথিতে রাখা হয় না। এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোন নির্দেশনা নেই । পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনরা দাফন সম্পন্ন করেন। এটি একটি অপমৃত্যু জেনেও থানা পুলিশকে অবহিত থেকে বিরত থাকেন। ফলে এই শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান নির্ণয় করা যায় না ।

নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেন, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে কোন কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে থানাগুলোতেও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। এছাড়া পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু মৃত্যুর পর অভিভাবকরা থানায় কোন অভিযোগ বা তথ্য প্রদান করেন না। ফলে বিষয়টি আড়ালেই রয়ে যায়। এসব কারণে থানাগুলোতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা দরকার।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ জানান, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে সরকারি কোন দপ্তরে তথ্য নেই। কারণ এ সংক্রান্ত সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। তাই কোন অফিস এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। তবে শিশু মৃত্যু রোধে করনীয় প্রসঙ্গে বলেন, পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও সহযোগীতা মূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) পরিচালক ডঃ আমিনুর রহমানের এক গবেষনা মতে জানা যায়, দারিদ্র, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবের কারনে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ শিশুরা ডুকছে বাড়ির ২০ গজের মধ্যে এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে মূলত সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১ টার মধ্যে। কারণ এই সময়ে মা-বাবাসহ পরিবারের লোকজন এবং শিশুদের পরিচর্যা কারীরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও উদ্বেগের বিষয় হলো বাড়ির আশেপাশের ডোবা, নালা, খাল, বিল সবকিছু উন্মুক্ত। কাজেই শিশুরা অন্যদের অলক্ষ্যে অবাধে জলাশয় চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। দিনের প্রথম ভাগে শিশুদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হলে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব হবে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, প্রতিবছর ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান । এদের ২০ শতাংশের বয়স ৫ বছরের কম। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম । বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী মোট শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী পানিতে ডুবে যাওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় । বছরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার। এছাড়া পানিতে ডোবার কারণে আরো ১৩ হাজার শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। আর ১ লাখ শিশু পানিতে ডোবা কারণে বিভিন্ন ভাবে আহত হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান