০১:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত দিবস

ঐতিহাসিক ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের কুষ্টিয়া জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সহযোগীতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে মরণ পণ যুদ্ধ করে কুষ্টিয়াকে সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত করেছিল। জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

যে কারনেই কুষ্টিয়া জেলাতে ছোট বড় ১২৭টি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর মধ্যে সর্ব বৃহৎ যুদ্ধ ৩টি, বৃহৎ যুদ্ধ ২টি বাকী গুলো ছোট ছোট যুদ্ধ । ১৯৭১ সালের ৩১মার্চ জেলার ইপিআর, পুলিশ, আনছার, ছাত্র-জনতা কুষ্টিয়ার পুলিশ লাইন, ওয়ারলেস অফিস, জেলা স্কুল, থানা প্রতিরোধ যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানীকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে। এ সময় জেলার সাধারণ মানুষ সড়কী, বল্লভ, রামদা, লাঠিশোঠা দিয়ে বেশ কিছু পাক হানাদার বাহিনীকে হত্যা করে। সে কারনেই পাকিস্থানী সেনা বাহিনী থেকে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্ট এর ডি কোম্পানীর বিলুপ্তি ঘটে। ৩১ মার্চ প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রথম কুষ্টিয়া শত্র“ মুক্ত হয়। কুষ্টিয়া জেলা শত্রু মুক্ত থাকার কারণে জাতীয় নেতৃবৃন্দ এ জেলাতে আসেন এবং তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বৈদ্যনাথ তলায় মুজিব নগর সরকার গঠন ও শপথ নিতে পারেন।

কুষ্টিয়া জেলা ১৬ দিন শত্রু মুক্ত থাকার পর পুনরায় পাক হানাদার বাহিনী ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহর দখল করে নেয় এবং ব্যাপক গুলি বর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, গনহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে। আগষ্ট- সেপ্টেম্বর মাসের দিকে পাক হানাদার বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধের কারনে বিপদাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অক্টোবর- নভেম্বর মাসে কুষ্টিয়া শহর ছাড়া সমস্ত এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে তারপরই বাংলাদেশে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরৃ হয়ে যায়। মুক্তিমিত্র যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী পর্যুদস্ত হতে থাকে।

৮ ও ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সম্পূর্ণরুপে শক্রমুক্ত হয়। যৌথ বাহিনী ঝিনাইদহ মহকুমা দখল করে একটি গ্রুপ কুষ্টিয়া অভিমুখে রওনা হয়। অন্য একটি গ্রুপ চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা পোড়াদহ হয়ে শহরের সন্নিকটে এসে উপস্থিত হয়। কুষ্টিয়াকে মুক্ত করতে যেখানেই শত্রু সেখানে যুদ্ধ করে চলে মুক্তিযোদ্ধারা। কুষ্টিয়া শহরকেও শত্রুমুক্ত করতে শহরকে অবরোধ করে রাখে। এমতাবস্থায় পাক হানাদার বাহিনীরা ভারী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতি গোপনে কুষ্টিয়া শহরের দক্ষিণে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সড়কের চৌড়হাসে বিটিসির নিকট জিকে ক্যানেলের ব্রীজ এর উত্তর পাশে ক্যামফ্লাশ করে এ্যামবুশ বা ফাঁদ পেতে রাখে।

মিত্র বাহিনী পাক হানাদার বাহিনীর সঠিক অবস্থানের তথ্য না নিয়ে কয়েক শত সৈন্য, ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, মেশিন গান, কামানসহ ভারতীয় ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্টে আটিলারী কেভারী গ্রুপ কুষ্টিয়া শহর অভিমুখে রওনা হলে পাক হানাদার বাহিনী ফায়ার ওপেন করে ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ২টি ব্রীজ উড়িয়ে দেয় । শুরু হয় তুমুল আকারে যুদ্ধ। নিহত হয় কয়েক শত সৈন্য। এ সময় যৌথ বাহিনীর কয়েকটি ট্যাংক, কামানসহ ভারী অস্ত্র ও একটি বিমান ধবংস হয়ে যায়। বাঙালীদের বীর দর্পে যুদ্ধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়া শহর ছেড়ে পালিয়ে ভেড়ামারা হয়ে হাডিঞ্জ ব্রিজ অভিমুখে রওনা হয়। সেখানে বাঙালীদের হাতে অনেক পাক বাহিনী নিহত হয়। বিমান থেকে বোম্বিং ও গুলি বর্ষণ করে কুষ্টিয়ার হাডিঞ্জ ব্রীজের ২টি স্প্যান ভেঙে ফেলে। কুষ্টিয়াবাসীর বীরদর্পেযুদ্ধের ফলে পাকহানাদার বাহিনী অনেকেই নিহত হয়, অনেকেই পালিয়ে যায়। বহু ত্যাগ তিতিক্ষা আর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে, বহু মা বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া শহরসহ সমগ্র কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত হয় ১১ ডিসেম্বর।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান মাসুদ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ট্রেনে ঈদ যাত্রার শেষ দিনের টিকিট বিক্রি আজ

১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত দিবস

প্রকাশিত : ০৯:২৬:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২০

ঐতিহাসিক ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের কুষ্টিয়া জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সহযোগীতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে মরণ পণ যুদ্ধ করে কুষ্টিয়াকে সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত করেছিল। জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

যে কারনেই কুষ্টিয়া জেলাতে ছোট বড় ১২৭টি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর মধ্যে সর্ব বৃহৎ যুদ্ধ ৩টি, বৃহৎ যুদ্ধ ২টি বাকী গুলো ছোট ছোট যুদ্ধ । ১৯৭১ সালের ৩১মার্চ জেলার ইপিআর, পুলিশ, আনছার, ছাত্র-জনতা কুষ্টিয়ার পুলিশ লাইন, ওয়ারলেস অফিস, জেলা স্কুল, থানা প্রতিরোধ যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানীকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে। এ সময় জেলার সাধারণ মানুষ সড়কী, বল্লভ, রামদা, লাঠিশোঠা দিয়ে বেশ কিছু পাক হানাদার বাহিনীকে হত্যা করে। সে কারনেই পাকিস্থানী সেনা বাহিনী থেকে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্ট এর ডি কোম্পানীর বিলুপ্তি ঘটে। ৩১ মার্চ প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রথম কুষ্টিয়া শত্র“ মুক্ত হয়। কুষ্টিয়া জেলা শত্রু মুক্ত থাকার কারণে জাতীয় নেতৃবৃন্দ এ জেলাতে আসেন এবং তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বৈদ্যনাথ তলায় মুজিব নগর সরকার গঠন ও শপথ নিতে পারেন।

কুষ্টিয়া জেলা ১৬ দিন শত্রু মুক্ত থাকার পর পুনরায় পাক হানাদার বাহিনী ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহর দখল করে নেয় এবং ব্যাপক গুলি বর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, গনহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে। আগষ্ট- সেপ্টেম্বর মাসের দিকে পাক হানাদার বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধের কারনে বিপদাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অক্টোবর- নভেম্বর মাসে কুষ্টিয়া শহর ছাড়া সমস্ত এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে তারপরই বাংলাদেশে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরৃ হয়ে যায়। মুক্তিমিত্র যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী পর্যুদস্ত হতে থাকে।

৮ ও ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সম্পূর্ণরুপে শক্রমুক্ত হয়। যৌথ বাহিনী ঝিনাইদহ মহকুমা দখল করে একটি গ্রুপ কুষ্টিয়া অভিমুখে রওনা হয়। অন্য একটি গ্রুপ চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা পোড়াদহ হয়ে শহরের সন্নিকটে এসে উপস্থিত হয়। কুষ্টিয়াকে মুক্ত করতে যেখানেই শত্রু সেখানে যুদ্ধ করে চলে মুক্তিযোদ্ধারা। কুষ্টিয়া শহরকেও শত্রুমুক্ত করতে শহরকে অবরোধ করে রাখে। এমতাবস্থায় পাক হানাদার বাহিনীরা ভারী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতি গোপনে কুষ্টিয়া শহরের দক্ষিণে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সড়কের চৌড়হাসে বিটিসির নিকট জিকে ক্যানেলের ব্রীজ এর উত্তর পাশে ক্যামফ্লাশ করে এ্যামবুশ বা ফাঁদ পেতে রাখে।

মিত্র বাহিনী পাক হানাদার বাহিনীর সঠিক অবস্থানের তথ্য না নিয়ে কয়েক শত সৈন্য, ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, মেশিন গান, কামানসহ ভারতীয় ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্টে আটিলারী কেভারী গ্রুপ কুষ্টিয়া শহর অভিমুখে রওনা হলে পাক হানাদার বাহিনী ফায়ার ওপেন করে ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ২টি ব্রীজ উড়িয়ে দেয় । শুরু হয় তুমুল আকারে যুদ্ধ। নিহত হয় কয়েক শত সৈন্য। এ সময় যৌথ বাহিনীর কয়েকটি ট্যাংক, কামানসহ ভারী অস্ত্র ও একটি বিমান ধবংস হয়ে যায়। বাঙালীদের বীর দর্পে যুদ্ধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়া শহর ছেড়ে পালিয়ে ভেড়ামারা হয়ে হাডিঞ্জ ব্রিজ অভিমুখে রওনা হয়। সেখানে বাঙালীদের হাতে অনেক পাক বাহিনী নিহত হয়। বিমান থেকে বোম্বিং ও গুলি বর্ষণ করে কুষ্টিয়ার হাডিঞ্জ ব্রীজের ২টি স্প্যান ভেঙে ফেলে। কুষ্টিয়াবাসীর বীরদর্পেযুদ্ধের ফলে পাকহানাদার বাহিনী অনেকেই নিহত হয়, অনেকেই পালিয়ে যায়। বহু ত্যাগ তিতিক্ষা আর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে, বহু মা বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া শহরসহ সমগ্র কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত হয় ১১ ডিসেম্বর।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান মাসুদ