০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

বাঙালি জাতিকে মেধাহীন করতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা: মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি

১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এইদিনে সমগ্র বাঙালি জাতি গভীর কৃতজ্ঞতায় ও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন বাংলার সেই সকল সূর্য সন্তানদের যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে ঘৃণ্যতম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। একটি নতুন দেশকে এগিয়ে নেবার মূল চালিকা শক্তিকে ধ্বংস করবার গভীর এই নীলনকশার অংশ নিয়ে ছিল আমারদেরই দেশের গুটিকয়েক নরপিশাচের যারা কখনোই চায়নি বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে পরিচিত হোক। বাঙালি জাতির জাগরণে এই সকল বুদ্ধিজীবীদের অগ্রণী ভূমিকা সবসময়ই তাদের চক্ষুশূলের কারণ ছিল। আর তাই ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে তাদের নিধনে ব্যাস্ত ছিল পাকিস্তানী শাসকেরা।

একটু পেছন থেকে যদি দেখি, তবে এই ক্ষোভের আসল কারণ আরো বিস্তারিত বুঝা যাবে। ১৯৪৭ পাকিস্তান নামক একটি অগণতান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই লক্ষণীয় যে, বাঙালি বা পূর্ব-পাকিস্তানীদের সাথে পশ্চিম-পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণ। ৪৮শে তারা প্রথম আঘাত হানে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় উর্দুকে আমাদের মুখে। বাঙালি প্রতিবাদ করে। ৫২-তে রক্তের বিনিময় বাংলা ভাষা পেলেও, বাঙালির মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালিরা ধীরে ধীরে এই শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের সম্মুখ নেতৃত্বে থাকতেন রাজনীতিবিদরা পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীরা। তারাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-ভাবে বাঙালিদের বাঙালি জাতীয়তা-বোধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন নানাভাবে। বুদ্ধিজীবীরা তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে তাদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। ৬৬-তে যখন বঙ্গবন্ধু ৬ দফার ডাক দিলেন, ততদিনে এদেশের মানুষ এই সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলে ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে গিয়েছিলো যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এজন্যও পরবর্তীতে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।

২৫ মার্চের কালোরাত্রে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ পরিকল্পনার সাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ওই রাতেই অতর্কিতভাবে বেপরোয়া পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে-খুঁজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বসবাসরত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ওই রাতেই হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী, আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারের দল তালিকা তৈরি করে, যেখানেই এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে পেয়েছে, তাদেরকে হত্যা করেছে। তবে দুঃখের বিষয়, এখানেই শেষ না।

তাদের আসল পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ঘটে স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের শাসকেরা নিশ্চিত পরাজয় অনিবার্য জেনে ১০ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে চালায় পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। এদেশের কিছু মানুষরূপী পশুরা নিজেরা, বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিল বাংলার সূর্য সন্তানদের।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বুদ্ধিজীবী দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শনশাস্ত্র)। ড. মুনির চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)। ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)। ড. আনোয়ার পাশা (বাংলা সাহিত্য)। ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস)। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি সাহিত্য)। ড. সিরাজুল হক খান (শিক্ষা)। ড. এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিক্ষা)। হুমায়ূন কবীর (ইংরেজি সাহিত্য)। রাশিদুল হাসান (ইংরেজি সাহিত্য)। সাজিদুল হাসান (পদার্থবিদ্যা)। ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান)। এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান)। এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা)। শরাফত আলী (গণিত)। এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা)। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা)। এম এ সাদেক (শিক্ষা)। এম সাদত আলী (শিক্ষা)। সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস)। গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস)। রাশীদুল হাসান (ইংরেজি)। এম মর্তুজা (চিকিৎসক)।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ ড. হবিবুর রহমান (গণিত বিভাগ)। ড. শ্রী সুখারঞ্জন সমাদ্দার (সংস্কৃত)। মীর আবদুল কাইউম (মনোবিজ্ঞান)। চিকিৎসকঃ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)। অধ্যাপক ডা. আলিম চৌধুরী (চক্ষু বিশেষজ্ঞ)। অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ। অধ্যাপক ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরী। ডা. হুমায়ুন কবীর। ডা. আজহারুল হক। ডা. সোলায়মান খান। ডা. আয়েশা বদেরা চৌধুরী। ডা. কসির উদ্দিন তালুকদার। ডা. মনসুর আলী। ডাঃ মোহাম্মদ মোর্তজা। ডা. মফিজউদ্দীন খান। ডা. জাহাঙ্গীর। ডা. নুরুল ইমাম। ডা. এস কে লালা। ডা. হেমচন্দ্র বসাক। ডা. ওবায়দুল হক। ডা. আসাদুল হক। ডা. মোসাব্বের আহমেদ। ডা. আজহারুল হক (সহকারী সার্জন), ডা. মোহাম্মদ শফী (দন্ত চিকিৎসক)।

অন্যান্যঃ শহীদুল্লাহ কায়সার (সাংবাদিক)। নিজামুদ্দীন আহমেদ (সাংবাদিক)। সেলিনা পারভীন (সাংবাদিক) সিরাজুদ্দীন হোসেন (সাংবাদিক)। আ ন ম গোলাম মুস্তফা (সাংবাদিক)। আলতাফ মাহমুদ (গীতিকার ও সুরকার)। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (রাজনীতিবিদ)। রণদাপ্রসাদ সাহা (সমাজসেবক এবং দানবীর)। যোগেশ চন্দ্র ঘোষ (শিক্ষাবিদ, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)। জহির রায়হান (লেখক, চলচ্চিত্রকার)। মেহেরুন্নেসা (কবি)। ড. আবুল কালাম আজাদ (শিক্ষাবিদ, গণিতজ্ঞ)। নজমুল হক সরকার (আইনজীবী)। নূতন চন্দ্র সিংহ (সমাজসেবক, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)। সহ নাম জানা-অজানা অনেকে।

বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নিম্নরূপঃ- শিক্ষাবিদ – ৯৯১ জন। সাংবাদিক – ১৩। চিকিৎসক – ৪৯। আইনজীবী – ৪২। অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) – ১৬।

স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় নিশ্চিত। তারা আরো মনে করেছিল যে, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বেঁচে থাকলে এ দেশ উন্নতির চরম শিখরে উঠবে। তাই পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গুত্ব করতে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের বাসা এবং কর্মস্থল থেকে রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকান্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়। বর্বর পাক বাহিনী ও রাজাকাররা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।
স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস ধরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা নিরীহ লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তার পরও যখন তাদের শেষরক্ষা হলো না, বাংলার দামাল ছেলেদের অব্যাহত পাল্টা আক্রমণে দিশাহারা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় যখন আসন্ন, তখনই পাকিস্তানি বাহিনী মরণকামড় হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে।

আজকের এই দিনে দাড়িয়ে, আমরা আবারো অনুধাবন করি আমরা কি হারিয়েছি। এই আলোকিত মানুষগুলো বেঁচে থাকলে আজ বাংলাদেশকে আরো বহু এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো, নিয়ে যেত এক অনন্য উচ্চতায়। দূর্ভাগ্য আমাদের। কিন্তু আমরা ভুলিনি সেই সকল সূর্য সন্তানদের। তাই বুদ্ধিজীবী দিবস পালন সবচেয়ে সার্থক হবে তখনই, যদি আমরা সেই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করি এবং সেই চেতনার যথাযথ বাস্তবায়নে কাজ করে যাই। আজও স্বাধীনতা বিরোধীরা আবারো নানা কৌশলে সেই চেতনার স্তম্ভকে আঘাত করতে চাইছে কিন্তু চেতনা রক্ষায় আমাদের, আমাদের তরুন প্রজন্মকে সদা সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একাত্তরের ঘাতকদের যেমন ঘৃণা করতে হবে, তেমনি তাদের প্রগতিবিরোধী চিন্তাচেতনাকেও সচেতনভাবে বর্জন করতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা পৃথিবীর বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক: সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: প্রধান উপদেষ্টা

বাঙালি জাতিকে মেধাহীন করতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা: মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি

প্রকাশিত : ০৫:৫৯:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০

১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এইদিনে সমগ্র বাঙালি জাতি গভীর কৃতজ্ঞতায় ও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন বাংলার সেই সকল সূর্য সন্তানদের যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে ঘৃণ্যতম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। একটি নতুন দেশকে এগিয়ে নেবার মূল চালিকা শক্তিকে ধ্বংস করবার গভীর এই নীলনকশার অংশ নিয়ে ছিল আমারদেরই দেশের গুটিকয়েক নরপিশাচের যারা কখনোই চায়নি বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে পরিচিত হোক। বাঙালি জাতির জাগরণে এই সকল বুদ্ধিজীবীদের অগ্রণী ভূমিকা সবসময়ই তাদের চক্ষুশূলের কারণ ছিল। আর তাই ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে তাদের নিধনে ব্যাস্ত ছিল পাকিস্তানী শাসকেরা।

একটু পেছন থেকে যদি দেখি, তবে এই ক্ষোভের আসল কারণ আরো বিস্তারিত বুঝা যাবে। ১৯৪৭ পাকিস্তান নামক একটি অগণতান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই লক্ষণীয় যে, বাঙালি বা পূর্ব-পাকিস্তানীদের সাথে পশ্চিম-পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণ। ৪৮শে তারা প্রথম আঘাত হানে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় উর্দুকে আমাদের মুখে। বাঙালি প্রতিবাদ করে। ৫২-তে রক্তের বিনিময় বাংলা ভাষা পেলেও, বাঙালির মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালিরা ধীরে ধীরে এই শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের সম্মুখ নেতৃত্বে থাকতেন রাজনীতিবিদরা পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীরা। তারাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-ভাবে বাঙালিদের বাঙালি জাতীয়তা-বোধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন নানাভাবে। বুদ্ধিজীবীরা তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে তাদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। ৬৬-তে যখন বঙ্গবন্ধু ৬ দফার ডাক দিলেন, ততদিনে এদেশের মানুষ এই সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলে ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে গিয়েছিলো যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এজন্যও পরবর্তীতে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।

২৫ মার্চের কালোরাত্রে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ পরিকল্পনার সাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ওই রাতেই অতর্কিতভাবে বেপরোয়া পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে-খুঁজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বসবাসরত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ওই রাতেই হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী, আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারের দল তালিকা তৈরি করে, যেখানেই এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে পেয়েছে, তাদেরকে হত্যা করেছে। তবে দুঃখের বিষয়, এখানেই শেষ না।

তাদের আসল পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ঘটে স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের শাসকেরা নিশ্চিত পরাজয় অনিবার্য জেনে ১০ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে চালায় পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। এদেশের কিছু মানুষরূপী পশুরা নিজেরা, বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিল বাংলার সূর্য সন্তানদের।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বুদ্ধিজীবী দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শনশাস্ত্র)। ড. মুনির চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)। ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)। ড. আনোয়ার পাশা (বাংলা সাহিত্য)। ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস)। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি সাহিত্য)। ড. সিরাজুল হক খান (শিক্ষা)। ড. এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিক্ষা)। হুমায়ূন কবীর (ইংরেজি সাহিত্য)। রাশিদুল হাসান (ইংরেজি সাহিত্য)। সাজিদুল হাসান (পদার্থবিদ্যা)। ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান)। এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান)। এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা)। শরাফত আলী (গণিত)। এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা)। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা)। এম এ সাদেক (শিক্ষা)। এম সাদত আলী (শিক্ষা)। সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস)। গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস)। রাশীদুল হাসান (ইংরেজি)। এম মর্তুজা (চিকিৎসক)।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ ড. হবিবুর রহমান (গণিত বিভাগ)। ড. শ্রী সুখারঞ্জন সমাদ্দার (সংস্কৃত)। মীর আবদুল কাইউম (মনোবিজ্ঞান)। চিকিৎসকঃ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)। অধ্যাপক ডা. আলিম চৌধুরী (চক্ষু বিশেষজ্ঞ)। অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ। অধ্যাপক ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরী। ডা. হুমায়ুন কবীর। ডা. আজহারুল হক। ডা. সোলায়মান খান। ডা. আয়েশা বদেরা চৌধুরী। ডা. কসির উদ্দিন তালুকদার। ডা. মনসুর আলী। ডাঃ মোহাম্মদ মোর্তজা। ডা. মফিজউদ্দীন খান। ডা. জাহাঙ্গীর। ডা. নুরুল ইমাম। ডা. এস কে লালা। ডা. হেমচন্দ্র বসাক। ডা. ওবায়দুল হক। ডা. আসাদুল হক। ডা. মোসাব্বের আহমেদ। ডা. আজহারুল হক (সহকারী সার্জন), ডা. মোহাম্মদ শফী (দন্ত চিকিৎসক)।

অন্যান্যঃ শহীদুল্লাহ কায়সার (সাংবাদিক)। নিজামুদ্দীন আহমেদ (সাংবাদিক)। সেলিনা পারভীন (সাংবাদিক) সিরাজুদ্দীন হোসেন (সাংবাদিক)। আ ন ম গোলাম মুস্তফা (সাংবাদিক)। আলতাফ মাহমুদ (গীতিকার ও সুরকার)। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (রাজনীতিবিদ)। রণদাপ্রসাদ সাহা (সমাজসেবক এবং দানবীর)। যোগেশ চন্দ্র ঘোষ (শিক্ষাবিদ, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)। জহির রায়হান (লেখক, চলচ্চিত্রকার)। মেহেরুন্নেসা (কবি)। ড. আবুল কালাম আজাদ (শিক্ষাবিদ, গণিতজ্ঞ)। নজমুল হক সরকার (আইনজীবী)। নূতন চন্দ্র সিংহ (সমাজসেবক, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)। সহ নাম জানা-অজানা অনেকে।

বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নিম্নরূপঃ- শিক্ষাবিদ – ৯৯১ জন। সাংবাদিক – ১৩। চিকিৎসক – ৪৯। আইনজীবী – ৪২। অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) – ১৬।

স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় নিশ্চিত। তারা আরো মনে করেছিল যে, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বেঁচে থাকলে এ দেশ উন্নতির চরম শিখরে উঠবে। তাই পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গুত্ব করতে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের বাসা এবং কর্মস্থল থেকে রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকান্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়। বর্বর পাক বাহিনী ও রাজাকাররা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।
স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস ধরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা নিরীহ লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তার পরও যখন তাদের শেষরক্ষা হলো না, বাংলার দামাল ছেলেদের অব্যাহত পাল্টা আক্রমণে দিশাহারা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় যখন আসন্ন, তখনই পাকিস্তানি বাহিনী মরণকামড় হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে।

আজকের এই দিনে দাড়িয়ে, আমরা আবারো অনুধাবন করি আমরা কি হারিয়েছি। এই আলোকিত মানুষগুলো বেঁচে থাকলে আজ বাংলাদেশকে আরো বহু এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো, নিয়ে যেত এক অনন্য উচ্চতায়। দূর্ভাগ্য আমাদের। কিন্তু আমরা ভুলিনি সেই সকল সূর্য সন্তানদের। তাই বুদ্ধিজীবী দিবস পালন সবচেয়ে সার্থক হবে তখনই, যদি আমরা সেই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করি এবং সেই চেতনার যথাযথ বাস্তবায়নে কাজ করে যাই। আজও স্বাধীনতা বিরোধীরা আবারো নানা কৌশলে সেই চেতনার স্তম্ভকে আঘাত করতে চাইছে কিন্তু চেতনা রক্ষায় আমাদের, আমাদের তরুন প্রজন্মকে সদা সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একাত্তরের ঘাতকদের যেমন ঘৃণা করতে হবে, তেমনি তাদের প্রগতিবিরোধী চিন্তাচেতনাকেও সচেতনভাবে বর্জন করতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা পৃথিবীর বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক: সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।