মাদারীপুরের রাজৈরে ২৩ নং মহেন্দ্রদী মৌজায় অবস্থিত প্রায় দু‘শ বছরের পুরনো কালী মন্দিরসহ জমি দখলের পায়তারা করছে এক বিএনপি নেতা। ২০১৩ সালে ঘটেছে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা। চলতি বছর মন্দির উন্নয়নের জন্য মন্দির কমিটি দোকান ঘর নির্মাণ করতে গেলেও বাধা দেয়া হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষের দাবী। এ অবস্থায় এলাকার শান্তিপ্রিয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও মন্দির কমিটি মন্দির রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
কালীবাড়ি সার্বজনীন মন্দির কমিটির সভাপতির লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, রাজৈর উপজেলার হরিদাসদী-মহেন্দ্রদী ইউনিয়নের ২৩ নং মহেন্দ্রদী মৌজায় অবস্থিত কালীবাড়ি হাট এলাকার সার্বজনীন কালী মন্দিরটি ইংরেজ আমলে প্রতিষ্ঠিত। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি মন্দিরের আঙিনায় সনাতন ধর্মীয় সমাবেশ, সপ্তাহ ব্যাপী নামকীর্তন ও মেলা বসে। কখনো এ সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ হয়নি এবং কেউ বাধাও দেয়নি। ২৩ নং মহেন্দ্রদী মৌজায় বিভিন্ন দাগে মন্দির, মঠ, হোলিখোলা ও দোলখোলা উল্লেখ রয়েছে। পূর্বে আরএস এবং সিএস খতিয়ানে কালী মন্দির, হোলীখোলা ও দোলখোলা উল্লেখ থাকলেও বিএরএস খতিয়ানে হয়েছে নাল জমি। মন্দির কমিটির লোকজন ভূমি অফিসে গিয়ে জানতে পারেন ভুলবশত বিএরএস খতিয়ানে নাল উল্লেখ হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে মন্দির কমিটির পক্ষে সভাপতি বাদী হয়ে রাজৈর সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানী মামলা (মামলা নং ৩৫৫/১৯) দায়ের করেন। এ অবস্থায় এলাকার বিএনপি নেতা আবু কালাম সিকদার স্থানীয় তহশিলদার শাহাদাত হোসেনের যোগসাজসে ওই সম্পত্তি দখলের পায়তারা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। চলতি বছর মন্দির উন্নয়নের জন্য খালি জায়গায় দোকান নির্মাণ করতে গেলে বাধা দেয় স্থানীয় তহশিলদার শাহাদাত হোসেন। শুধু তাই নয় সেখানে পূজা করতে নিষেধ করে মন্দির অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানান মন্দিরের সেবাইত উত্তম ব্যানার্জী। এ নিয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রায়ের মধ্যে শঙ্কা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য সেলিম বেপারী বলেন, ‘আবু কালম সিকদার একজন গ্রাম্য ডাক্তার। তিনি বিভিন্ন সরকারী খাস জমি জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করে নেয়। তার বর্তমান বাড়ির জায়গা জমিও হিন্দুদের ছিল। স্বাধীনতার পর তারা ভারতে চলে গেলে কালাম সিকদার গং জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ওই বাড়ির জায়গা দখল করে ভোগ দখল করছে। তিনি বর্তমানে কালী মন্দিরের জায়গা কৌশলে দখল করার পায়তারা করছে।’
একই এলাকার আলী কান্তা, আতিয়ার সিকদার, যুবলীগ নেতা হান্নান মুন্সী বলেন, ‘কালাম সিকদার সাধারণ মানুষদের নামে বিভিন্ন ভাবে মামলা-হামলা ও বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া অভিযোগ দিয়ে হয়রানী করছে। তিনি ভুমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজসে এলাকার খাস জমি দখলের ধান্ধা করে আসছে। এবার তার নজর পড়েছে ব্রিটিশ আমলের পুরনো কালি মন্দিরের জায়গার দিকে। সে মন্দির কমিটিকে বিভিন্ন ভয় ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করছে। তহশীলদারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে মন্দিরের জায়গায় দোকান ঘর তুলতে বাঁধা দিচ্ছে।’
একাধিক সূত্র এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, ‘কালাম সিকদার স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি। আগে সর্বহারা পার্টি করতো। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে তিনি বিএনপিতে যোগ দেয়। তখন পর পল্লী রেশনের ডিলার হিসেবে নিযুক্ত হয়। রেশন চুরির দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তার ৬ মাসের সাজা হয়। তার ছেলে পাভেল সিকদার রুবেল স্থানীয় যুবলীগ নেতা সাহেদ বেগ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত। এখন সে কালিবাড়ি মন্দিররের জায়গা দখল করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করছে।’
মন্দির কমিটির সভাপতি উত্তম ব্যানার্জী বলেন, “মন্দিরটি প্রশাসনের ১২ নম্বর তালিকাভূক্ত এবং বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টে নিবন্ধনকৃত। বহুকালে আগে থেকে এই কালী মন্দিরের কারণে এলাকার নাম কালীবাড়ি হাট-বাজার নামকরণ হয়েছে। প্রতি বছর পূজার সময় সরকারী সাহায্য পেয়ে পূজা-অর্চনা করে আসছি। কিন্তু হঠাৎ করে ওই জমির প্রতি নজর পড়ে আবু কালাম সিকদার নামে বিএনপি‘র ওই নেতার। তিনি মন্দিরের জমি দখলের পায়তারা করছেন। ২০১৩ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে মন্দিরে আগুন দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল একটি জিআর মামলা করি। (মামলা নং ১১০/১৯ তারিখ ১৯.০৪.২০১৩)। তখন প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন প্রমাণ সাপেক্ষে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এখন স্থানীয় তহশিলদার শাহাদাত হোসেনের যোগসাজসে মন্দিরের সম্পত্তি দখলের পায়তারা করছেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে দুইবার কালী প্রতিমাসহ একাধিক প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। আমরা হিন্দু সম্প্রদায় কালী মন্দির রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তহশিলদার শাহাদাত হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কালিবাড়ি এলাকার বিভিন্ন দাগে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত জায়গাগুলি ১নং খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত। তারা মামলা করেছে। মামলা নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের পক্ষে ঐ জায়গা সুরক্ষার দায়িত¦ আমার।’
অভিযোগ অস্বীকার করে আবু কালাম সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, “আমি সাধারণ মানুষ। জানামতে জায়গাগুলি ১নং খাস খতিয়ান ভুক্ত। একটি মহল মন্দিরের নাম ভাঙ্গিয়ে ওই জমিগুলি দখলের চেষ্টা করছে।”
হরিদাসদী-মহেন্দ্রদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম মাতুব্বর বলেন, ‘কালিবাড়ি মন্দিরটি প্রায় দু‘শত বছরের পুরনো। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা ব্রিটিশ আমল থেকে এখানে পুজা অর্চনাসহ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন। কালাম সিকদার কালি মন্দিরের জায়গা দখলের পায়তার করছে। আমি দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
মাদারীপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক প্রাণোতোষ মন্ডল বলেন, “ওই জমি আগে যেহেতু সিএস-আরএস খতিয়ানে মন্দিরের নামে ছিলো, সেহেতু, সরকারের কাছে আমাদের জোর আবেদন কোনো ভূমিদস্যু যাতে ওই সম্পত্তি গ্রাস করতে না পারে। ভুলের কারণে যদি খাস হয়ে থাকে তবুও ওই সম্পত্তি যাতে মন্দিরের নামেই হয়; সে ব্যাপারে সরকারের কাছে বিশেষভাবে আবেদন করছি।’
রাজৈর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রাজৈর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ





















