হাতপাখা আজ শুধু ঘাম আর গরম থেকে আত্মরক্ষার উপকরণই নয়, চিরায়ত গ্রামবাংলার কুটির শিল্পর অন্যতম অংশও বটে। গ্রীষ্মর ভ্যাপসা গরম হাতপাখা তরি ও বিক্রি করে রপগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। গরম শরীর শীতল হাওয়ার পরশ বুলিয়ে দেয় তালপাতার পাখার বাতাস। রপগঞ্জর সদর ইউনিয়নের ইছাপুরা, ভালান, পলহান, কুমারটেক, পরশী, বাগবের,গুতিয়াব এলাকার তালপাতার পাখা এখানকার নারীদর জীবন জীবিকার প্রোয়াজন পাখা তৈরির কাজ পেশা হিসেব নিয়েছেন। শীতের সময়টায় নিজ এলাকা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তালগাছের পাতাসহ ঢিঙ্গা সংগ্রহ করে সব পুকুরের পানিতে ভিজিয় রাখেন। ফালগুন মাস থেকে পাখা তৈরির কাজ শুরু করেন তারা। ভালানর সাপিয়া বেগম তালপাতার ঢিঙ্গা, পাতা দিয়ে পাখা তৈরি করছিলেন। সাপিয়ার মতো,পাখা তৈরির কাজ তাদের বাপ -দাদার পেশা নয়। স্বামীর সংসারে এসে পাখা তৈরির কাজ শিখেছেন এখনো করেছেন। এখন এটাই পেশা । তিনি জানান, চার রকমর পাখা তৈরি করেন। এসব পাখার মধ্যে রয়েছে ডাটা পাখা, ঘুরকি পাখা, হরতন পাখা ও পকট পাখাই বেশি তৈরি করেন। প্রতিটি পাখা ৮ টাকা থেকে শুরু করে ২০ টাকা পযন্ত বিক্রি হয়। তবে খুচরা বিক্রি করলে আরা বশি দাম পাওয়া যেতো। এখানে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করেন তারা বিভিন্ন আইটেম অনুযায়ী কাজ করেন। শ্রমিকদের মজুরী কাজের ধরন ভেদ বিভিন রকম হয়ে থাকে। ১০০ পাখা রঙ করলে ৬০ টাকা, ঘুরকি তৈরি করলে ৫০ টাকা, পাখা বাঁধলে ৪০ টাকা। তাদের মতে এখানকার প্রতিটি পরিবার ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকার পাখা তৈরি করেন। চত্র মাসে থেকেই শুরু হয় পাখা বিক্রির কাজ। আশিন মাস পর্যন্ত তা বিক্রি হয়। ষাট বছর আগে আমি বিয়ে করে শশুরবাড়ি আসি। এরপর থেকেই হাতপাখা তৈরির কাজ করছি। আমার স্বামী রিপন মিয়াও আমার সঙ্গে দিন-রাত কাজ করেন। ছেলেটি লেখা পড়া করলো না। মেয়ে সানজিদাকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছে আছে ও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ের লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমাদর পাখা তৈরির কাজে সহযোগিতা করে। এই পাখা বিক্রির আয় দিয়ে আমাদের সংসার চলে। এরপর যদি কখনো কিছু থাকে তা ভবিষ্যতের সঞ্চয়েরে জন্য রেখে দেই। বললেন, “পাখার গ্রাম” খ্যাত রপগঞ্জের ইছাপুরা এলাকার সাপিয়া খাতুন। দক্ষিনবাঘ এলাকার পাখা তৈরির কারিগর রওশনারা পাখা তৈরির কাজ তাদের বাপ দাদার আদি পেশা। এ প্রসঙ্গ রওশনারা বলেন, এ পেশার ওপর নির্ভর করেই এখানকার অধিকাংশ পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেন। ছনি এলাকার গৃহবধু সাহানারা বেগম বলেন অন্য কথা, তার মতে তারা পাখা তৈরির যা খরচ হয় তার দ্বিগুন টাকা বিক্রি হয়। অনেকের আবার শতকরা ৪০ ভাগ টাকা লাভ হয়। চত্র মাস থেকে পাখা বিক্রি শুরু হয়। বাইরের লোকজন এখানে ভাদ্র মাস পর্যন্ত পাখা কেনেন। স্থানীয় হাট বাজার গুলোতে ও পাড়া মহল্লায় আশিন মাস পর্যন্ত ফেরি করে পাখা বিক্রি করা হয়। আরেক গৃহবধু জাহানারা বেগম বলেন, বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসে পাখা তৈরির কাজটিকেই প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছি। ছেলে মেয়েরাও আমাদের পাখা তৈরির কাজে সহযোগিতা করে থাকে। তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে মাত্র এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পর আর লেখা পড়া চালিয়ে যেতে পারেনি। পাখার কাজ না থাকলে জমিতে কাজ করে। আরিদা গ্রামের আমেনা বেগমের দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ে বাধনকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ইমনকে মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়িয়েছেন। আমেনার মতে, তার স্বামী ও তিনি মিলে সকাল থেকে আছর নামাজের ওয়াক্ত পর্যন্ত ৮০-৯০ টি পাখা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি পাখা বিক্রি কর খরচ বাবদ ৫-৭ টাকা আয় হয়। একই গ্রামের রাহেলা বেগম বলেন, সংসারের বাড়তি খরচ না থাকায় তারা কিছু জমি কেনার জন্য সঞ্জয় করছেন।
এ ব্যাপারে রপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফাতেহা নুর বলেন, এখন আর আগের মতো নাই। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বসতি নির্মানের জন্য গাছ-গাছালি কেটে ফেলা হচ্ছে । পাখা তৈরির তাল গাছও কেটে ফেলা হচ্ছে। তবে একটা সময় ছিল উপজেলার ইছাপুরা, কুমারটেক, পলহান, ভালান, বাঘবেড় , দক্ষিণবাঘসহ বিভিন এলাকায় ব্যাপকহারে তালপাতার পাখা তৈরি হতো।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ






















